মো. হাবিবুর রহমান, মুরাদনগর ।।
কুমিল্লার
মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানাধীন পূর্বধইর পশ্চিম ইউনিয়নের মহেশপুর
গ্রামের পাঁচ সন্তানের জননী রাশিদা বেগমকে (৫০) পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দুই
আসামিকে শুক্রবার দুপুরে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃত দুই আসামি
হলেন- মহেশপুর গ্রামের ডালিম মিয়ার ছেলে ইমামুল এবং মতিন সরকারের ছেলে কলিম
উল্লাহ। বৃহস্পতিবার প্রকাশ্য দিবালোকে বর্বর হামলা চালিয়ে রাশিদা বেগমকে
হত্যা করা হয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী।
সরেজমিনে
জানা যায়, গত ৭ এপ্রিল গোলাম মাওলা সরকার হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই
পুরুষশূন্য মহেশপুর গ্রাম। গ্রেপ্তার আর মামলার ভয়ে পুরুষরা এলাকাছাড়া।
কিন্তু রেহাই মেলেনি নারীদেরও। স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুর রহিমের গ্রুপ
পুরো গ্রামে একচ্ছত্র আধিপত্য ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে বলে অভিযোগ
স্থানীয়দের। রহিম মেম্বারের বাহিনীর ভয়ে গত বৃহস্পতিবার সকালে সম্প্রতি
সংগঠিত মাওলা সরকার হত্যা মামলার আসামী দেলোয়ার মিয়ার স্ত্রী রাশিদা বেগম
খামারে থাকা কয়েকটি গরু ট্রাকে করে বাপের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন। ট্রাকটি
মহেশপুর বাজার নামক স্থানে পৌঁছালে ওৎ পেতে থাকা রহিম মেম্বারের বাহিনী
দেশীয় অস্ত্র ও লোহার রড নিয়ে হামলা চালায়। রাশিদা বেগমকে নির্মমভাবে
পিটিয়ে গুরুতর আহত করার পর সেখানেই প্রায় ৪ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। মায়ের এই
অবস্থা দেখে তাঁর কলেজে পড়ুয়া দুই মেয়ে সামিয়া আক্তার (১৮) ও আছিয়া আক্তার
(১৫) মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য হামলাকারীদের পায়ে ধরে আকুতি জানায়।
কিন্তু সন্ত্রাসীদের মন গলেনি, উল্টো তারা দুই বোনসহ আরও ৫ নারীকে পিটিয়ে
আহত করে। দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা পর পুলিশ রাশিদা বেগমকে উদ্ধার করে স্বজনদের কাছে
রেখে যায়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে প্রথমে মুরাদনগর স্বাস্থ্য
কমপ্লেক্স এবং পরে ঢাকায় নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্ত শেষে
শুক্রবার বিকেলে মহেশপুর কবরস্থানে রাশিদা বেগমের লাশ দাফন করা হয়েছে।
মাওলা
সরকার হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বিডিআর আলম সরকারের লোকজনকে গ্রামছাড়া করে
একের পর এক বর্বরতা চালাচ্ছে রহিম মেম্বারের বাহিনী। এরমধ্রে প্রতিপক্ষ
গ্রুপের প্রায় ৫০ কানি জমির ইরি ধান কেটে নেওয়া হয়েছে। আসামিপক্ষের ১২টি
গরু লুট এবং ইরি স্কিম দখল করা হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বাড়ির বিদ্যুৎ
সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। শিশুদের স্কুলে যাওয়া এবং বড়দের বাজারে যাওয়ার
ওপর জারি রয়েছে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা। এমনকি মামলার আসামির স্ত্রী, যিনি
মহেশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা, তাকেও জোরপূর্বক
স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
ইউপি চেয়ারম্যান আবদুর রহিম পারভেজ
বলেন,"একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ইউপি সদস্য আব্দুর রহিম পুরো
এলাকাটিকে জিম্মি করে রেখেছে। এটা কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।"
এ ঘটনায় অভিযুক্ত ইউপি সদস্য আব্দুর রহিমের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
বাঙ্গরা
বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিউল আলম জানান, নিহত রাশিদা
বেগমের মেয়ে সামিয়া আক্তার বাদী হয়ে মামলা করেছেন। বাকি আসামিদের
গ্রেপ্তারে জোর প্রচেষ্টা চলছে।
মুরাদনগর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ
সুপার একেএম কামরুজ্জামান দৈনিক কুমিল্লার কাগজকে জানান, আইনশৃঙ্খলা
বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ওইগ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ
মোতায়েন করা হয়েছে।
একটি হত্যাকাণ্ডের জেরে পুরো গ্রামকে জিম্মি করে এমন
মধ্যযুগীয় বর্বরতার অবসান এবং মূলহোতা রহিম মেম্বারসহ সকল দোষীদের দ্রুত
গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন আতঙ্কিত গ্রামবাসী।
