
মধ্যপ্রাচ্যসহ
বৈশ্বিক দক্ষিণের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রমেই এখন এক বহুমুখী ক্ষমতার বলয় গড়ে
তোলার প্রক্রিয়া চলছে। শুধু পশ্চিমা রাজনৈতিক আধিপত্য নয়, সামরিক ও
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী এ পরিবর্তনের ধারা শুরু হতে দেখা গেছে
নব্বইয়ের সূচনায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই। দ্বিকেন্দ্রিক
ক্ষমতার ভরকেন্দ্র ভেঙে বিভিন্ন অঞ্চলনির্বিশেষে বিভিন্ন শক্তির অভ্যুদয়
ক্রমে ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। তাতে বিশ্বব্যাপী কারও একচ্ছত্র আধিপত্যের
পরিবর্তে বরং গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের বিকাশ কিছুটা সহজসাধ্য হচ্ছে এবং
পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং সামরিক দিক থেকে নিরাপত্তার বিষয়গুলো জোরদার
হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সে কারণে ভারতের কাছে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি
রাজ্য রক্ষার প্রশ্নে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত মাত্র ২২
কিলোমিটার প্রশস্ত ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডর বা
সীমান্ত পথ রক্ষা করার তাগিদ দেখা দিয়েছে। কিন্তু তা করতে গিয়ে তাদের
সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত অতি উৎসাহী কিছু ব্যক্তি কখনো বাংলাদেশের
উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগ এবং পাশাপাশি ভারতের স্থলবেষ্টিত রাজ্যগুলোকে
রক্ষার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকল্পে এ বিভাগের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল
করে নেওয়ার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের অখণ্ডতা কিংবা সার্বভৌমত্ব
রক্ষাকল্পে তার লালমনিরহাটসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য
বিমান ঘাঁটিসহ অন্যান্য স্থাপনার কাজ অতি দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি বিভিন্ন
সামরিক অস্ত্রশস্ত্র উৎপাদনের কাজে হাত দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সীমান্ত সমস্যা ভারতের অরুণাচল রাজ্যের সঙ্গেও তার প্রতিবেশী চীনের রয়েছে।
কাশ্মীরে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সংঘর্ষের কোনো স্থায়ী সমাধান
বা অবসান আজও হয়নি। এ অবস্থায় রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশেষ করে গাজাসহ
ফিলিস্তিন-ভিত্তিক ইহুদিবাদী ইসরায়েল ও তার সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রের সংঘর্ষের
কারণে বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং সার্বিক উন্নয়ন চরম বিপর্যয়ের মুখে
পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের দুই অন্যতম প্রধান পরাশক্তি চীন ও
যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছে যে, অবিলম্বে এ অবস্থার পরিবর্তন
হতে হবে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরকালে
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় তাকে বলেছেন যে, চীনের উন্নয়নের
জন্য নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’
কর্মসূচির কোনো দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নেই। উন্নয়ন, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও
যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারিত করার ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার কোনো
বিকল্প নেই। এমন একটি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী
তারেক রহমান চলতি মাসের শেষের দিকে চীন সফরে যাচ্ছেন বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
চীনের সঙ্গে বহু কারণে এ দেশের পরলোকগত নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী
এবং বিশেষ করে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী খালেদা
জিয়ার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। উন্নয়ন, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও বিনির্মাণের ক্ষেত্রে
চীন আমাদের দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্র। সে কারণে বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতিতে
চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের
দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিপ্লব-উত্তর
বিগত প্রায় ৭৭ বছরে চীন তার পঞ্চশীলা নীতি অনুযায়ী ভিন্ন রাষ্ট্রের
অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কখনো হস্তক্ষেপ করেনি। অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ
ছিল তার পররাষ্ট্রনীতির বরখেলাপ। কিন্তু গত বছর চীনের প্রণীত ১৫তম
পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সূচিত হয়েছে বিরাট পরিবর্তন। গণচীনের সর্বশেষ
পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, যা ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে, তাতে
জাতীয় নিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পর্যায়ে তুলে আনা হয়েছে। সে হিসেবে
চীনের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি এখন অনেক গুরুত্ব লাভ করেছে। সে কারণে জাতীয়
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে সামরিক ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে
হচ্ছে। তাতে অভ্যন্তরীণ এবং এমনকি পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বিরাট পরিবর্তন
আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ চীনের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
নিশ্চিত করতে হলে এবং উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে হলে প্রথমে প্রয়োজন
যোগাযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন। এ ক্ষেত্রে চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড
রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) মাধ্যমে উন্নয়নকে স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং
আন্তর্জাতিকভাবে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতি। তাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে
উন্নয়নকে অগ্রসর কিংবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে
নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও
নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চীন তিনটি বিষয় নির্ধারণ করেছে। সেগুলো হচ্ছে: কৌশলগত
গঠনশীল স্থিতিশীলতা (ঈড়হংঃৎঁপঃরাব ঝঃৎধঃবমরপ ঝঃধনরষরঃু), বৈশ্বিক উন্নয়ন
উদ্যোগ (এড়নধষ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ওহরঃরধঃরাব) এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ
(এষড়নধষ ঝবপঁৎরঃু ওহরঃরধঃরাব)। এর মাধ্যমে তারা আগামী ১০ বছর অর্থাৎ ২০৩৫
সালের মধ্যে আধুনিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনার পক্ষপাতি। তাই
তারা এখন থেকেই প্রচার করছে যে, নিরাপত্তা হচ্ছে উন্নয়নের পূর্ব শর্ত। সে
শর্ত থেকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নিরাপত্তাবেষ্টনী বা বলয় গড়ে
উঠতে পারে। সে প্রস্তাবিত নিরাপত্তাবলয় শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা জগতের
নিরাপত্তাব্যবস্থা ন্যাটোর মতো হবে কি না তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে এটি ধরে
নেওয়া হচ্ছে যে, বিশাল পরিমাণ বিনিয়োগের মাধ্যমে যৌথভাবে গড়ে তোলা কোনো
উন্নয়ন প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বিভিন্ন অঞ্চলিক উদ্যোগ,
ব্যবস্থা কিংবা চুক্তির প্রয়োজন হতে পারে।
ওপরে উল্লিখিত প্রাতিষ্ঠানিক
ধ্যান-ধারণা থেকেই একদিন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন গঠন করা হয়েছিল। এ
সাংহাই সহযোগিতা সংস্থাটি গঠিত হয়েছিল ২০০১ সালের ১৫ জুন। চীন, রাশিয়া,
কাজাখস্তান, তাজিকস্তান, কিরঘিজস্তান ও উজবেকিস্তানকে নিয়ে এ সহযোগিতা
সংস্থা গঠন করা হয়েছিল। পরে ভারত পাকিস্তান ও বেলারুশ তাতে যোগ দেয়। তাদের
উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা এবং
সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ ঠেকানোও এর একটি বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। এ
প্রতিষ্ঠানটি ক্রমে ক্রমে চীনের উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোদার
করার পরিকল্পনা কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এর সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য হতে
পারে সাম্রাজ্যবাদ ও পশ্চিমা সামরিক আগ্রাসন ঠেকানো। চীন ক্রমে ক্রমে তার
প্রতিবেশীদের নিয়ে সে দিকেই অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাজার, বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্থা এবং
ডলারের আধিপত্যরোধ করার জন্য চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, ভারত ও দক্ষিণ
আফ্রিকাকে নিয়ে ২০০৯ সালে অর্থনৈতিক সংস্থা ব্রিকস গঠিত হয়েছিল। তাতে
দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেয় ২০১১ সালে। যুক্তরাষ্ট্র এ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটি
ভেঙে দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে অত্যন্ত তৎপর হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনের সঙ্গে
যুদ্ধের কারণে রাশিয়া এখনো এ প্রতিষ্ঠানে ততটা অবদান না রাখতে পারলেও বিশেষ
করে চীন, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার কারণে ব্রিকস এখনো শক্তিশালী অবস্থানে
রয়েছে। তবে ভারত ব্রিকস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়াতে
পারে। তখন তার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে ইরান। তা ছাড়া বাংলাদেশও বিশেষ একটি
ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে তা বিশেষভাবে নির্ভর করবে, বর্তমান বাংলাদেশ
সরকারের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর।
চীন বাংলাদেশের মানুষের
অকৃত্রিম বন্ধুরাষ্ট্র। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা
জিয়ার সাবেক বিএপি সরকার চীনের সঙ্গে অতীতে একযোগে কাজ করেছে অত্যন্ত
নির্ভরতার সঙ্গে। শহিদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান বর্তমান
বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী। এটি চীনের সরকার এবং জনগণের কাছে
নিঃসন্দেহে একটি গভীর আস্থা ও সম্মানের বিষয় হতে পারে। কিন্তু ক্ষমতা থেকে
বিদায় নেওয়ার আগে অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস তড়িঘড়ি করে
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করে গেছেন, যা আইনসঙ্গতভাবে
তিনি করতে পারেন না। সেসব চুক্তি পরে অকার্যকর হয়ে গেলেও তার কিছু কিছু
বিষয় চীনকে অখুশি করেছে বলে জানা যায়। অনেকে বলেন, সাম্রাজ্যবাদী
যুক্তরাষ্ট্র কারও বন্ধু হতে পারে না। এ কথা ঠিক যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে
আমাদের অনেক বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত। সে কারণে তার সঙ্গে সাবধানে বিভিন্ন
কার্যক্রম সম্পাদন করেতে হবে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)
বাস্তবায়ন, নতুন উন্নয়ন ও নিরাপত্তানীতি বাস্তবায়ন এবং বিশেষ করে বিনিয়োগের
ক্ষেত্রে চীন এখন অত্যন্ত ভেবেচিন্তে কাজ করে থাকে। বাংলাদেশের তিস্তা
নিয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনার পর্যায়ে কাজ করেছে। তা ছাড়া,
লালমনিরহাটে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের ব্যাপারেও অনেক গবেষণা ও চিন্তাভাবনা
রয়েছে চীনের। একমাত্র তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নেই প্রায় এক বিলিয়ন
ডলার ঋণ প্রয়োজন বাংলাদেশের। প্রতিরক্ষা ও অস্ত্রশস্ত্র উৎপাদনের ক্ষেত্রে
বাংলাদেশে রয়েছে বিশাল কর্মপরিধি, যাতে অর্থ ও কারিগরি জ্ঞান কিংবা দক্ষতা
সবকিছুই প্রয়োজন হবে ধাপে ধাপে। বর্তমান অবস্থায় চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ
সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করতে পারার মধ্যে অনেক কৃতিত্ব রয়েছে। কারণ চীনের
পরিকল্পিত নিরাপত্তা কিংবা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হবে অনেক ব্যাপক। সেগুলো
নিশ্চিত করবে বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
আফ্রো-এশিয়া ও লাতিন আমেরিকাকে (বিআরআই) এক সূত্রে গাঁথবে; আমরা যার
অংশীদার হতে চাই। আমরা উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির ভাগীদার হতে চাই, আর
শোষণ-শাসনের নিগৃহীত বিষয়বস্তুতে পরিণত হতে চাই না। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে
চীনের সংগ্রাম সফল হোক। এক নতুন যুগের সূচনা করুক তারেক রহমানের আসন্ন চীন
সফর।
লেখক: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক
