
মজুরি
কিছুটা বাড়লেও পরিবারের ব্যয় তার চেয়েও দ্রুত বেড়েছে। চাল, ডাল, তেল,
সবজি, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়ালেখার খরচ মিলিয়ে মাস শেষে টিকে থাকা এখন আগের
চেয়ে কঠিন। আগে যে বেতন পেত, সেটা দিয়ে যেমন কোনভাবে চলত, এখন বেতন একটু
বাড়লেও বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের
জীবনের কোন পরিবর্তন হয়নি। অতিরিক্ত সময় কাজ করেও সঞ্চয় করা সম্ভব হচ্ছে
না। বরং অনেকে বাধ্য হচ্ছেন পরিবারের দৈনন্দিন খরচ কমাতে। কেউ কেউ
স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরী ব্যয়ের ক্ষেত্রে আপস করতে বাধ্য হচ্ছেন। নির্মাণ
শ্রমিকদের ব্যাপারে বলা যায় যেদিন কাজ থাকে সেদিন আয় হয়, না থাকলে আয় নেই।
পুরোই অনিশ্চিত জীবন। কাজ করলে টাকা পায়, না করলে খালি হাতে ঘরে ফিরতে হয়।
কিন্তু খরচ ত থামে না। অসুস্থ হলে বা কাজ না থাকলে ধার দেনা ছাড়া সংসার
চালানো অসম্ভব।
শ্রমচিন্তাবীদদের মতে, শুধু মজুরি বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়।
বাজার নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল রাখা জরুরী। জীবনযাত্রার ব্যয়ের
সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলে বাস্তবে কোন স্বস্তি পাওয়া যায় না। গত পাঁচ বছরে
দেশে মূল্যস্ফীতি দ্বিগুণের চেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ^ব্যাংক ও বিভিন্ন
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১ সালে ৫.৬৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, ২০২২
সালে ৭.৭০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, ২০২৩ সালে ৯.৮৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, ২০২৪ সালে
১০.৪৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ও ২০২৫ সালে মূল্যস্ফীতি ৮-১০ শতাংশ উঠানামা
করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন-রাশিয়া, ইরান-মার্কিন ও ইসরায়েল যুদ্ধের
কারণে খাদ্য ও জ¦ালানি খাতে মূল্যস্ফীতির মূল কারণ। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে
নিম্নআয়ের শ্রমিকদের জীবনে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীর
আশপাশের একটি শ্রমিক পরিবারের মাসিক ব্যয় ২৫ হাজার টাকার বেশি। বর্তমান
নূন্যতম মজুরি কাঠামো দিয়ে একজন শ্রমিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ অনেক ক্ষেত্রেই
অসম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে টেকসই সমাধানের জন্য শুধু মজুরি বৃদ্ধি নয়,
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার ও নায্য বাজার ব্যবস্থা
জরুরী। মজুরি বৃদ্ধি অনেকসময় নামমাত্র পরিবর্তন হিসাবে দেখা যায়। একই সময়ে
খাদ্য, বাসভাড়া ও পরিহন খরচ দ্রুত বাড়ে। ফলে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে না।
চলতি
অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্স বেড়েছে, এবং মার্চে তা প্রায় ৩.৭৬
বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে
শক্তিশালী রাখতে সহায়তা করছে। ফেব্রুয়ারীতে রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের উপরে
উঠলেও মার্চে সামান্য কমে যায় প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারে দাড়িয়েছে। যা এখনো
স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে রয়েছে। তৈরি পোশাক খাতসহ অন্যান্য খাতে আয়ের দুর্বলতা
লক্ষ্য করা যায়। বৈশি^ক চাহিদা হ্রাস, জ¦ালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদন খরচ
বাড়ার কারণ উদ্বেগজনক। মার্চ মাসে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৯
হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। মোট আদায় দাঁড়িয়েছে ৩৩ কোটি
৫২১ লক্ষ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬২.৯০ শতাংশ। ভ্যাট, আয়কর ও আমদানি
রপ্তানি শুল্ক সর্বক্ষেত্রেই ঘাটতি দেখা গেছে। এই পরিস্থিতি সরকারের বাজেট
সবক্ষেত্রেই ঘাটতি দেখা গেছে। এই পরিস্থিতি সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ
বাড়াচ্ছে এবং ঋণ নির্ভরতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এদিকে কর্মজীবী
নারীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় একজন নারী যখন ঘরে বাইরে উভয় জায়গায় কাজ করেন
তখন তাঁর কাজের চাপও বেশি থাকে। আর তাই চাপের ফলে তিনি যেমন শারীরিক ক্ষতির
শিকার হন তেমনি মানসিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্থ হন। অতিরিক্ত কর্মঘন্টার কারণে
উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনী রোগসহ পুষ্টি ঘাটতিজনিত রোগে আক্রান্ত হন।
অন্যদিকে কাজের চাপে মানসিকভাবে ক্লান্তি, অবসাদগ্রস্থ হওয়াসহ খিটখিটে
মেজাজ, হতাশায় ভোগেন। বিজ্ঞজনের ধারণা সর্বপ্রথম নারীর এই অদৃশ্য
কর্মঘন্টাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। এটাকে ছোটঘাট গৃহস্থালির কাজ বলা বন্ধ করতে
হবে। কাজের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিকভাবে পর্যাপ্ত বিনোদনের
ব্যবস্থা রাখতে হবে। শুধু তাই নয় অতিরিক্ত অবসাদ বা হতাশা গ্রাস করলে বিনা
দ্বিধায় ছুটি নিতে হবে। নারীর মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা না করে প্রয়োজনে
চিকিৎসা দিতে হবে। নারীর অদৃশ্য কর্মঘন্টা কমিয়ে আনতে হবে। ঘরের কাজ শুধু
নারী করবে এই বদ্ধমূল ধারণা থেকে আমাদের বের হতে হবে।
উন্নয়ন প্রকল্প
বাস্তবায়নেও ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে
উন্নয়ন ব্যয় কমেছে এবং বাস্তবায়ন হারও সামান্য হ্রাস পেয়েছে। মার্চ মাসে
ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য পতন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাঠামোগত দূর্বলতা। যেমন
প্রশাসনিক জটিলতা, প্রকল্প প্রস্তুতির ধীর গতি এবং অর্থায়ন সংকটকে সামনে
নিয়ে এসেছে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসাবে সামনে আসছে বৈশি^ক জ¦ালানি বাজারের
অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূÑরাজনৈতিক উত্তেজনা। জ¦ালানির দাম বাড়াতে
আমদানি ব্যয় বাড়বে, মূল্যস্ফীতি আবার উর্ধ্বমূখী হতে পারে এবং বিনিময় হারে
চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এরই মধ্যে টাকার প্রকৃত বিনিময় হার বেড়েছে যা মুদ্রার
অবমূল্যায়নের ইঙ্গিত দেয়। চালের দামে স্বস্তি, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও
রিজার্ভের শক্ত অবস্থান কিছুটা আশাবাদ তৈরি করলেও রপ্তানি হ্রাস, রাজস্ব
ঘাটতি, উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি এবং বৈশি^ক অনিশ্চয়তা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে
ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে কার্যকর নীতি, রাজস্ব
ব্যবস্থার সংস্কার, জ¦ালানি খাতে চাপ মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য জ¦ালানীর
ব্যবস্থার নিশ্চিতকরণ এবং বিনিয়োগ বাড়ানো সময়ের ও সমাজের প্রয়োজনীয়
প্রস্তাবনা।
দেশ আজ জাতীয় ইস্যুতে বিভক্ত ও বিপর্যস্ত। এই বিভক্তি রেখে
অর্থনৈতিক পুণরূদ্ধার সম্ভব নয়। দেশের ২০ কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেই
অর্থনীতি পুনরূদ্ধার এবং দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে হবে। বেকারত্বের
কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে আকর্ষণ এখন জাতীয় উদ্যোগে পরিণত করতে হবে। চামড়া
শিল্প ধ্বংস করা হয়েছে তাকে পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নিতে হবে। ইতিমধ্যে বন্ধ
কলকারখানা খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ হতে হবে পক্ষপাতহীন
এবং দেশের মানুষের স্বার্থে। বেকারত্ব কমাতে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে
হবে। হয়রানির শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে হবে বেসরকারি খাতকে। আইন শৃঙ্খলা
পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ব্যাহত হয়। তাই নতুন
অর্থবছরে সর্বত্র আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কোন নাগরিক
বৈষম্য গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের সব নাগরিক যেন নির্ভয়ে উন্মুক্ত পরিবেশে বসবাস
করতে পারে তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। সবাই যদি মনে করতে পারে যে দেশটা
আমাদের সকলের তাহলে এ দেশের অগ্রযাত্রা কেউ রুখতে পারবে না।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ
