শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পুনর্বিন্যাস জরুরি
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ১:০৯ এএম আপডেট: ১৩.০৬.২০২৬ ২:১০ এএম |

 মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পুনর্বিন্যাস জরুরি
উন্নয়ন বলতে প্রবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের বাইরে মানুষের সব পার্থিব এবং অপার্থিব চাহিদা পূরণও বোঝায়। অতএব, এগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা হচ্ছে এবং তার দরকার আছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ১৯৭০ সালের শেষের দিকে মানুষের কতগুলো মৌলিক চাহিদা নির্ধারণ করেছে। খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য; সেটা আরও সম্প্রসারিত হয়ে এখন মৌলিক চাহিদা বলতে আমরা খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য; সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি, নির্মল বাতাস এবং সার্বিকভাবে সুস্থ পরিবেশ। সার্বিক উন্নয়নের জন্য শুধু ব্যক্তিগত প্রয়াসই যথেষ্ট নয়, সরকারের বিভিন্ন সহায়তা ও কার্যক্রম অত্যাবশ্যক।  এ যাবৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে যেভাবে শিক্ষাকে মূল্যায়ন করা হয়, জনগণের স্বাস্থ্য এবং সঠিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। উন্নয়নের সূচকে স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশক যা-ই থাকুক, কোভিড-১৯ এর পর আমরা উপলব্ধি করতে পেরেছি সার্বিক উন্নয়নের জন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন কতটা দরকার। এটি পরিষ্কার হয়ে গেছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা যদি ঠিক না থাকে, সামগ্রিক উন্নয়ন তখন ব্যাহত হয়ে যায়। এর আরেকটা প্রভাব রয়েছে, যা আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। সেটা হলো, স্বাস্থ্য খারাপ হলে মানুষের উৎপাদনশীলতা ও সৃজনশীলতা হারিয়ে যায়। সুতরাং দুই দিক দিয়েই স্বাস্থ্য মূল্যবান।
মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষার ভূমিকা নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়, গবেষণা হয়। প্রায়ই শিক্ষার গুণগত মান, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, শিক্ষার উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয় আলোচনা হয়। যখন মানবসম্পদের প্রসঙ্গ আসে, তখন মানবপুঁজি (হিউম্যান ক্যাপিটাল) বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থার যে সমস্যাটি চোখে পড়ার মতো, তা হলো স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রের ভূমিকা ধীরে ধীরে কমে যাওয়া। প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি সরকারের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়। অর্থাৎ এটা রাষ্ট্রের বিশেষ কর্তব্য। পৃথিবীর সব দেশেই এ বাধ্যবাধকতা থাকে; কিন্তু বাধ্যবাধকতা থাকার পরও এ বিষয়টিকে আমরা বাস্তবে বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারিনি।
এজন্য আমাদের প্রথম কাজ হলো পাবলিক হেলথ সিস্টেমটিকে উন্নত ও সহজলভ্য করা। অথচ আস্তে আস্তে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভূমিকা হ্রাস পাচ্ছে এবং বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। দেশে স্বাস্থ্য খাতের আরেকটা সমস্যা হলো আমাদের ভালো ওয়ার্ক ফোর্স নেই। ডাক্তার, নার্স, হেলথ টেকনিশিয়ান, প্যারামেডিকস অনেক কম। ফার্মাসিস্টদের ভূমিকাও দেখা যায় না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ডাক্তারদের মূল ভূমিকা হচ্ছে, প্রথমে রোগ ডায়াগনোসিস করা এবং প্রতিরোধ ও নিরাময়ের জন্য নির্দেশনা ব্যবস্থা নেওয়া। বাকি আনুষঙ্গিক কাজগুলো হলো সহযোগী বা পরিপূরক কাজ। সেসব দেশে অপারেশন করার পর সার্জনরা চলে যান। পরে প্যারামেডিকস ও নার্সরাই তার কেয়ার নেন। কিন্তু আমাদের এখানে, বিশেষ করে আমাদের চিকিৎসকের অনুপাত অনুযায়ী স্বাস্থ্য সহযোগীর সংখ্যা খুব কম। স্থানীয় পর্যায়ে আমরা স্বাস্থ্যব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন (রেভল্যুশন) করিনি। স্বাস্থ্য খাতটা একেবারেই কেন্দ্রীভূত। সবকিছু কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে সিভিল সার্জন দায়িত্ব পালন করেন। সিভিল সার্জনের তেমন কোনো ভূমিকা নেই, শুধু প্রশাসনিক ব্যাপার ছাড়া। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য খাত বিকেন্দ্রীকরণ না হলে, একেবারে ইউনিয়ন পর্যন্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত উন্নতি হবে না। শ্রমের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ এর গভীরে অনেকেই যায় না। মনে রাখা দরকার, মানবপুঁজির দুটি দিক রয়েছে- এক. শিক্ষাপুঁজি এবং দুই. স্বাস্থ্যপুঁজি। তাই মানুষের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, যা আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে নানা প্রভাব ফেলে; কিন্তু উন্নয়ন ইস্যুতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ভূমিকার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। দুটিই সমানভাবে ভূমিকা রাখে। পৃথিবীর যেসব দেশে উন্নয়ন হয়েছে এবং উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে এশিয়ার চীন, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এসব দেশে দেখা যায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দুটি খাতেই তারা অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
মূল সমস্যাটি হলো দুর্নীতি। এ খাতে দুর্নীতিটা বেশি হচ্ছে। যখন কোনো কিছুর কেন্দ্রীকরণ হয়; তখন নানা রকম কেনাকাটা হয়। অনেক সময় যে জিনিসটা যে জায়গায় দরকার সেটাও ঠিকমতো হয় না। বরগুনার একটি উপজেলায় যে জিনিসটার দরকার, দিনাজপুরের একটি উপজেলায় একই জিনিস না-ও লাগতে পারে; কিন্তু এখানে ঢালাওভাবে কেনাকাটা করা হয়। ফলে অনেক সময় কেনা জিনিস পড়ে থাকে। এ কেন্দ্রীকরণের সুযোগেই স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অপচয় বেশি হয়। দ্রুত কোভিড মহামারি থেকে উত্তরণের পথে অবশ্যই উপরোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি সবার নজর দিতে হবে। বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে অত্যাবশ্যকীয় হলো স্বাস্থ্য খাতের আর্থিক সম্পদ। 
আমাদের আরেকটা সমস্যা হলো দুর্বল স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা। এ সমস্যাটা আমরা এবার খুব বেশি টের পাচ্ছি। করোনা মহামারিতে দেখা গেল, সরকারি সংস্থা থেকে দেওয়া তথ্য অনেক সময় অসম্পূর্ণ। তথ্যগুলো আপডেটও থাকে না। যারা ব্রিফ করেন, তারাও ততটা আপডেট থাকেন না। এ ছাড়া এখানে তথ্য সংগ্রহ থেকে সরবরাহ পর্যন্ত সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকায় স্বাস্থ্য তথ্যের ওপর মানুষের আস্থাও কম। আমাদের দরকার যথাযথ ও সুষ্ঠু তথ্য ব্যবস্থা এবং ধারাবাহিকতা। মানে, আপনি ছয় মাস পর একটা তথ্য দিলেন, ওটাও অসম্পূর্ণ, অতএব সেটা দিয়ে তেমন কাজ হবে না।
সব সমস্যার কারণগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক অঙ্গীকার। আমরা কিন্তু মুখে মুখে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করি। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, পাবলিক-প্রাইভেট স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সুষ্ঠু মনিটরিং নেই। স্বাস্থ্য সমস্যা ও চিকিৎসার ব্যয়কে আমরা অর্থনীতিতে বলি ইনকাম ইরোডিং ফ্যাক্টর (আয়বিনাশী কারণ), যা দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নিয়ে যায়। বাংলাদেশে এটা মারাত্মক হয়ে উঠেছে। মধ্যবিত্ত, এমনকি উচ্চমধ্যবিত্ত যে কেউ যদি একটা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়, তাহলে অর্থকষ্টে ঘটিবাটি, বাড়িঘর বেচে দেওয়ার ফাঁদে পড়ে যায়।
আমরা যদি স্বাস্থ্য খাত ঠিক না করি, তাহলে অর্থনীতি ও সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে না। স্বাস্থ্য খাত ঠিক করতে হলে, বিশেষ করে সাতটা জিনিসের ওপর জোর দিতে হবে। একটা হলো স্বাস্থ্যসেবার ডেলিভারি সিস্টেম বা স্বাস্থ্যসেবা যথাযথভাবে উন্নত করা। দ্বিতীয়ত, সঠিক লোকবল বা জানাশোনা লোক নিয়োগ। এ ছাড়া তথ্য ব্যবস্থাপনাকে যথাযথভাবে ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, ইকুইটেবল অ্যাকসেস ধনী-গরিবনির্বিশেষে চিকিৎসার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দেশেও বড়লোকরা বেশি চিকিৎসা পায়, তাদের জন্য কেবিন রিজার্ভ রাখা, আইসিইউ রিজার্ভ রাখা, তাদের আলাদা হাসপাতালে নেওয়া এগুলো দুঃখজনক। আবার তারা বিদেশেও চলে যায়। এগুলো দূর করতে হবে। চতুর্থত, স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন তথা বাজেটে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, সুষ্ঠু স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং ষষ্ঠত, স্বাস্থ্য খাতে গুড লিডারশিপ নিয়ে আসতে হবে। 
মানবসম্পদ উন্নয়নের দুটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হচ্ছে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্য। একটি অপরটির পরিপূরক এবং দুটোই সত্যিকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অপরিহার্য। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দ্রুত আধুনিকীকরণ, উন্নত প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকতর পেশাদারত্ব, নৈতিকতা এবং বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে দুর্নীতি করলে অতি দ্রুত, দৃশ্যমান এবং শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া যায়। এ সাতটি বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে। এগুলো করতে পারলে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভালো হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশে সর্বজনীন আর্থ-সামাজিক উন্নতি হবে এবং আমাদের দেশ দ্রুত সামনে এগিয়ে যাবে।
লেখক: সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

















http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
প্রথমার্ধে কানাডার জালে বসনিয়ার এক গোল
কুমিল্লায় ১১ দলীয় ঐক্যের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ
দায়িত্ব বুঝে পাওয়ার পর কুমিল্লার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবো
কুমিল্লা সীমান্তে আঙুর চাষে নতুন সম্ভাবনা
বরুড়ায় রাকিব হত্যা প্রধান আসামি ছোটন ঢাকায় গ্রেপ্তার
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
পলাতক বাহারকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার দাবি
ঢাকা-কুমিল্লা রেল কর্ডলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে: অর্থমন্ত্রী
চৌদ্দগ্রামে পিতার ২০ বছর পর পুত্রকেও ছুরিকাঘাতে হত্যা
মালয়েশিয়া থেকে ফেরার রাতেই ব্রাহ্মণপাড়ায় প্রবাসীর বাড়িতে হামলা-লুটপাট, আহত ৩
চৌদ্দগ্রামে সাপের কামড়ে শিক্ষকের মৃত্যু
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২