কুমিল্লায়
ক্লাবফুট বা ‘মুগুর পা’ আক্রান্ত শিশুদের শারীরিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ
কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে অভিভাবকদের নিয়ে এক বিশেষ
সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) দুপুরে নগরীর অর্ক
কেয়ার সেন্টার সভা কক্ষে ‘ওয়াক ফর লাইফ’ প্রকল্পের আওতায় এই ‘প্যারেন্টস
গ্রুপ মিটিং’ অনুষ্ঠিত হয়।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইউনাইটেড পারপাস-এর
বাস্তবায়নে এবং মিরাকেলফিট-এর আর্থিক সহযোগিতায় আয়োজিত এই সভায় প্রধান
ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউনাইটেড পারপাস-এর ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর
সুমিত বণিক। সভার কারিগরি সহযোগিতায় ছিলেন অর্ক কেয়ার সেন্টারের পনসেটি
প্র্যাকটিশনার ও ফিজিওথেরাপিস্ট মো. তৌহিদুল ইসলাম।
সভায় ১০ জন ক্লাবফুট
আক্রান্ত শিশুর মোট ২০ জন অভিভাবক অংশগ্রহণ করেন, যার মধ্যে ১২ জন নারী
এবং ৮ জন পুরুষ ছিলেন। সেশনে শিশুদের নিয়মিত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে
যাতায়াত সমস্যা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মতো
চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা করা হয়।
সভার ফ্যাসিলিটেটর সুমিত
বণিক অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “ক্লাবফুট চিকিৎসায় ‘পনসেটি মেথড’ পুরো
বিশ্বেই একটি স্বীকৃত, নিরাপদ ও কার্যকর পদ্ধতি। আমাদের
ফিজিওথেরাপিস্টবৃন্দদ এই পদ্ধতি অনুসরণ করেই সেবাদান করছেন। সঠিক সময়ে এই
চিকিৎসা শুরু করা গেলে ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশুরা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে।
তারা অন্য যেকোনো স্বাভাবিক শিশুর মতোই নিজের পায়ে দাঁড়াতে, দৌড়াতে এবং
স্কুলে যেতে পারে। তাই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই। তবে এই
চিকিৎসায় চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের চেয়েও সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি পালন করেন
পরিবারের মূল কারিগর-বাবা-মায়েরা।”
পনসেটি প্র্যাকটিশনার ও
ফিজিওথেরাপিস্ট মো. তৌহিদুল ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, “ক্লাবফুট চিকিৎসার
এই দীর্ঘ যাত্রায় শিশুর জন্য পরিবারের সবার ভালোবাসা আর যত্ন হচ্ছে সবচেয়ে
বড় ওষুধ। প্লাস্টার খোলার পর সঠিক নিয়মে ব্যায়াম করানো এবং ব্রেস বা বিশেষ
জুতা পরিয়ে রাখার কোনো বিকল্প নেই। অনেক সময় একটু সুস্থতা দেখলে বা শিশুর
কান্নাকাটিতে মায়া করে অনেকেই চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখে দেন। কিন্তু মনে
রাখবেন, আপনাদের সামান্য অবহেলা বা অসচেতনতা আদরের শিশুটির সুন্দর
ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।"
সভায় পনসেটি মেথড বা
ক্লাবফুট চিকিৎসার ধাপগুলো অভিভাবকদের সহজভাবে বুঝিয়ে বলা হয়। অনেক সময়
চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ করে দিলে শিশুর পায়ের পাতা পুনরায় বেঁকে যাওয়ার ঝুঁকি
থাকে-এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়। চিকিৎসা নিয়ে অভিভাবকদের মনে
থাকা বিভিন্ন ভুল ধারণা দূর করতে ও ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে প্রশ্নোত্তর ও
অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্ব পরিচালিত হয়।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে অভিভাবকরা
আক্ষেপ করে জানান, সমাজে ক্লাবফুট নিয়ে এখনো নানা ভুল ধারণা রয়েছে। বিশেষ
করে আক্রান্ত শিশুদের মায়েদের প্রায়ই অযথা দোষারোপ ও কটু কথার শিকার হতে
হয়। সমাজ থেকে এই নেতিবাচক মানসিকতা দূর করার পাশাপাশি, অভিভাবকগণ সব ধরনের
কুসংস্কার পেছনে ফেলে সন্তানের চিকিৎসায় অবিচল থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত
করেন।
পরিশেষে, শিশুদের সুন্দর আগামীর জন্য 'ইউনাইটেড পারপাস'-এর চলমান
সহায়তাগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরে সভার সমাপ্তি করা হয়। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে
ক্লাবফুট সমস্যার সমাধান, সঠিক চিকিৎসার প্রসার এবং মানুষের মাঝে সচেতনতা
তৈরিতে ‘ওয়াক ফর লাইফ’ প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করছে।
