* কাজ শেষ না হতেই উঠে যাচ্ছে কার্পেটিং;
* সড়কে বিটুমিনের প্রলেপ (প্রাইম কোট) ছাড়াই ধুলা-বালুর উপর ঢালা হচ্ছে পিচ
* স্থানীয়রা হাতে তুলে ফেলছেন কার্পেটিং
* অনিয়মে বাঁধা দেয়ায় স্থানীয়দের সাথে ঠিকাদারের হাতাহাতি; সংবাদ সংগ্রহে বাধা!
* অজ্ঞাত কারণে কঠোর হচ্ছে না প্রশাসন

কুমিল্লার
চান্দিনায় একটি সড়কের সংস্কার কাজ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনিয়ম ও নানা
সমস্যায় জর্জিরত। ওই সড়কটি সংস্কার কাজের অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে
একাধিক সংবাদ প্রকাশও হয়। এতে প্রশাসনের কার্যত কোন ভূমিকা না থাকায়
অনিয়মনের মধ্য দিয়েই সংস্কার কাজ চালিয়ে যায় ঠিকাদার!
শেষ
মুহুর্তে সড়কে প্রাইম কোট (বিটুমিনের প্রলেপ) ছাড়া ধুলাবালির মধ্যে এবং
পাথরের সাথে বিটুমিনের যথাযথ মিশ্রণ না করেই কার্পেটিংয়ের কাজ করছে
ঠিকাদার। সড়কটির একদিকে কাজ করছে অন্যদিকে উঠে যাচ্ছে কার্পেটিং। স্থানীয়রা
হাতের ইশারায় তুলে ফেলছে ৪০ এমএম কার্পেটিং। দীর্ঘদিন বেহাল সড়কটির
দুর্ভোগের শিকার স্থানীয় বাসিন্দারা এমন অনিয়মের প্রতিবাদ করায় স্থানীয়দের
সাথে ঠিকাদারের হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে! এমনকি অনিয়মের অভিযোগ ক্যামেরায় বলা
মুহুর্তে স্থানীয়দের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ভিডিও ধারণ ও সংবাদ সংগ্রহে বাধা
দেন ঠিকাদার।
জানা
যায়- ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনা উপজেলার কুটুম্বপুর বাস স্টেশন
থেকে উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের কালিয়ারচর সড়কটি দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে
যান চলাচলের অনুপযোগি হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে ওই সড়কটির কুটুম্বপুর স্টেশন
এলাকা থেকে কেশেরা গরু বাজার পর্যন্ত প্রায় সোয়া ৬ কিলোমিটার সংস্কার কাজের
জন্য ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় স্থানীয় সরকার।
মেসার্স ওমর টেডার্স
নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ওই কাজটি পেয়ে সড়কটির মেকাডামে নিম্নমানের
কংক্রিট, বালুর পরিবর্তে মাটি ব্যবহার থেকে শুরু করে নানা কাজে অনিয়ম ও
দুর্নীতি করতে শুরু করে। ওই ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদন বেশ কয়েকটি জাতীয় ও
স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তার কয়েক মাস পর সড়কটির কিছু অংশ কার্পেটিং
করার এক সপ্তাহের মধ্যেই বিভিন্ন স্থান ফেটে চৌচির হয়ে যায়। এমন ঘটনায়ও
বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। কিন্তু তাতেও
প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যত কোন ভূমিকা না থাকায় ঠিকাদার সবকিছুকে
বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে মনগড়া মতো কাজ চালিয়ে যায়।
বৃহস্পতিবার থেকে ওই
সড়কটির কুটুম্বপুর বাজার সংলগ্ন এলাকায় কার্পেটিং কাজ শুরু করে ঠিকাদার।
শনিবার (৯ মে) দুপুরে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি সড়কটির কার্পেটিং হাতে উঠিয়ে
সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়।
খবর পেয়ে স্থানীয়
সংবাদকর্মীরা সরেজমিনে গিয়ে দেখেন- সড়কটির ধুলা-বালি না সরিয়ে উপজেলা
প্রকৌশল অধিদপ্তরের লোকজনের অনুপস্থিতিতে সড়কে প্রাইম কোট ছাড়াই আপন মনে
কার্পেটিং কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ঠিকাদার। এসময় সংবাদকর্মীদের দেখে স্থানীয়রা
স্বাক্ষাৎকার দিতে এগিয়ে আসলেই ঠিকাদার জালাল উদ্দিন কালা স্থানীয়দের হাতে
উত্তেজিত হয়ে হাতাহাতি করতে দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা গাজী জালাল
জানান- ঠিকাদার দূরে কোন এক জায়গায় পাথরের সাথে বিটুমিন মিশিয়ে এনে সড়কে
ঢালছে। পাথরের সাথে বিটুমিন কম থাকায় এবং মিশ্রণ ভাল না হওয়ায় পিচগুলো কালো
হচ্ছে না। অপরদিকে নিয়মানুসারে সড়কে পিচ ঢালাই দেয়ার আগে বিটুমিনের প্রলেপ
দিতে হয়। কিন্তু ওই সড়কে ধুলা-বালির উপর বিটুমিনের প্রলেপ না দিয়েই
কার্পেটিং করে চলছেন ঠিকাদার। গত বৃহস্পতিবার যে স্থানে কার্পেটিং করেছে ওই
স্থানটির এজিনে আমরা প্রথমে পা দিয়ে ঘষা দেই তাতেই দেখি কার্পেটিং উঠে
যাচ্ছে। সাথে সাথে আমরা হাতে টান দিতেই অনায়াসে উঠে আসছে সড়কের কার্পেটিং।
আমরা এর প্রতিবাদ করায় ঠিকাদার আমাদের সাথে খারাপ আচরণ করে এবং আমাদের দেখে
নেয়ার হুমকি দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান জানান- এই সড়কের
দুর্ভোগে গত কয়েক বছরে অতিষ্ঠ জনগণ। সড়ক সংস্কার কাজে যদি এমন অবস্থা হয়
তাহলে চলতি বর্ষায়ই নষ্ট হয়ে যাবে নতুন সড়ক। আবারও দুর্ভোগে পড়বে কয়েক
ইউনিয়নের বাসিন্দারা।
তিনি আরও জানান- সড়ক কার্পেটিং করার তিনদিন পর
হাতের ইশারায় উঠে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে শনিবার
বিকেলে সড়কটি পরিদর্শনে আসেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আতিকুল আলম শাওন। তিনি
সরেজমিন পরিদর্শন করার পর কাজের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
মেসার্স
ওমর ট্রেডার্সের সত্বাধিকারী জালাল উদ্দিন কালা বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার
করে বলেন- আমি উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে সিডিউল মোতাবেক কাজ
করে যাচ্ছি। একটি মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
চান্দিনা উপজেলা
প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাকিবুল ইসলাম এর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান- অভিযোগ
শুনেছি। আমি ঘটনাস্থলে যাচ্ছি। বিষয়টি তদন্তের পর মন্তব্য করতে পারবো।
এতো
অভিযোগের পরও কেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এমন
প্রশ্নে কুমিল্লা জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন জানান- আমি নতুন
এসেছি। ওই সড়কের বিষয়ে কোন অভিযোগ আমার জানা নেই। এখন যেহেতু জেনেছি খোঁজ
নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
এদিকে সচেতন মহল বলছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ
আঞ্চলিক সড়কে বারবার অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায়
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা দ্রুত স্বাধীন তদন্ত
কমিটি গঠন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।