
পরাশক্তিগুলো
কখনোই নিছক নৈতিকতা, আদর্শ বা আবেগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় না—বিশ্ব
রাজনীতির ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। যুদ্ধ হোক বা
সহযোগিতা, সবকিছুতেই তাদের অবস্থান নির্ধারিত হয় স্বার্থের আলোকে।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও
ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ, ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং বিশ্ব রাজনীতির
অন্যান্য প্রধান খেলোয়াড়দের কূটনৈতিক অবস্থান এই সত্যটিকে আরও নগ্নভাবে
সামনে এনেছে। বর্তমান পরিস্থিতি দেখায়, প্রতিটি শক্তিধর দেশ এমনভাবে
পদক্ষেপ নেয়, যাতে সংঘাতের সময় তাদের কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি স্বার্থ
সুরক্ষিত থাকে। তাই ইরানের অবস্থা হয়েছে পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের
রাজনীতিতে ক্যাকটাস বনে আটকাপড়া সিংহ ও সূর্যের গল্পের মতো।
মধ্যপ্রাচ্যে
যে কোনো বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা সরাসরি প্রভাব ফেলে বৈশ্বিক জ্বালানি
বাজারে। বিশ্বে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল
ব্যবহার হয়, যার প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। অর্থাৎ
প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই সংকীর্ণ জলপথ অতিক্রম
করে। শুধু তেলই নয়, বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রায়
এক-পঞ্চমাংশও এই পথ দিয়ে যায়। ফলে এই রুটে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক
বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৫ থেকে ১৫ ডলার পর্যন্ত ওঠানামা ঘটাতে
পারে, যা আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর জন্য বড় ধাক্কা।
এমন পরিস্থিতিতে
চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ বিভিন্ন শক্তিধর দেশের
ভূমিকা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই দেশগুলো কি সরাসরি যুদ্ধের
অংশ হবে, নাকি কেবল কূটনৈতিক সমর্থনে সীমাবদ্ধ থাকবে? এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত
তথ্য বলছে, এই সব পরাশক্তি সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি, বরং কূটনৈতিক পর্যায়ে
সমালোচনা ও শান্তির আহ্বান জানিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। এই
অবস্থানও তাদের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে
সম্পর্কিত।
চীন বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, যার মোট
জিডিপি প্রায় ১৯ থেকে ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের মধ্যে। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ১১
মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি করে, যা তাদের মোট ব্যবহারের প্রায় ৭০ শতাংশ। এর
বড় একটি অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সৌদি আরব, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত
চীনের প্রধান সরবরাহকারী। ফলে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা মানে চীনের
জ্বালানি নিরাপত্তায় সরাসরি চাপ। শুধু তাই নয়, চীনের রপ্তানিনির্ভর
অর্থনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত; জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি
পেলে উৎপাদন খরচ বাড়ে, যা তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে
পারে। এ কারণেই তারা সামরিক অংশগ্রহণের বদলে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে
আগ্রহী।
রাশিয়ার ক্ষেত্রেও চিত্রটি কৌশলনির্ভর। রাশিয়া প্রতিদিন প্রায় ৯
থেকে ১০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক
গ্যাস রপ্তানিকারক। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাদের অংশীদারত্ব প্রায় ১০
শতাংশের কাছাকাছি। তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে রাশিয়ার রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক
প্রভাব পড়ে, তবে একই সঙ্গে বৈশ্বিক মন্দা তৈরি হলে চাহিদা কমে যেতে পারে।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে রাশিয়া ইতিমধ্যেই বিকল্প বাজারের দিকে
ঝুঁকেছে, বিশেষ করে এশিয়ায়। এই অবস্থায় তারা এমন কোনো সরাসরি সামরিক সংঘাতে
জড়াতে চায় না, যা তাদের অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসকে বাধাগ্রস্ত করবে। ফলে
তাদের ভূমিকা এখন পর্যন্ত জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মঞ্চে কূটনৈতিক অবস্থান
গ্রহণেই সীমাবদ্ধ।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি, যার
জিডিপি প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি
প্রতিদিন ১২ থেকে ১৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে, যা তাকে শীর্ষ
উৎপাদনকারীদের কাতারে নিয়ে গেছে। তবে তারা এখনও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে
গভীরভাবে সংযুক্ত। তেলের দাম বৃদ্ধি দেশীয় উৎপাদকদের জন্য সুবিধাজনক হলেও,
একই সঙ্গে তা ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ঘটাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতির
হার একসময় ৮ শতাংশের ওপরে উঠেছিল, যার পেছনে জ্বালানি দামের প্রভাব ছিল
উল্লেখযোগ্য। ফলে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রভাবও তাদের
বিবেচনায় রাখতে হয়।
বিশ্ব জ্বালানি বাজার নিয়ন্ত্রণে ওপেক ও ওপেক প্লাস
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই জোটভুক্ত দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বিশ্বের প্রায়
৪০ শতাংশ তেল উৎপাদন করে এবং প্রমাণিত মজুদের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ
তাদের হাতে। সৌদি আরব একাই প্রতিদিন ১০ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল উৎপাদন
করতে সক্ষম। উৎপাদন কোটা সামান্য কমানো বা বাড়ানোই আন্তর্জাতিক বাজারে বড়
ধরনের মূল্য পরিবর্তন ঘটাতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা শুধু সামরিক
বা রাজনৈতিক বিষয় নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য সরাসরি ঝুঁকি।
এদিকে
ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকা মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব
পাচ্ছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিসহ ইউরোপের ৩০টিরও বেশি দেশ ন্যাটোর
সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। যদি যুক্তরাষ্ট্র জোটগত সমর্থন চায়, তবে তারা
সীমিত সামরিক বা নৌ সহযোগিতা দিতে পারে, বিশেষত বাণিজ্যিক জাহাজের
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের পর ইউরোপীয় দেশগুলো
রাশিয়ান গ্যাস আমদানি কমিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানি
বাড়িয়েছে। তাই হরমুজে অস্থিরতা মানে ইউরোপে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, শিল্প
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি। ২০২২ সালে ইউরোপে গ্যাসের দাম
প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় ৩০০ ইউরো ছুঁয়েছিল।
কূটনৈতিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন
ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার পক্ষে। ২০১৫ সালের
চুক্তিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ও জার্মানির জোট
পি-ফাইভ প্লাস ওয়ানের অংশ হিসেবে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ফলে ইউরোপ সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর বদলে
মধ্যস্থতা, যুদ্ধবিরতির আহ্বান এবং নিষেধাজ্ঞা বা কূটনৈতিক চাপের পথ বেছে
নিতে পারে। তবে ইউরোপ সরাসরি বড় আকারে সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়বে কি না, তা
অনিশ্চিত। কারণ তারা ইতিমধ্যে ইউক্রেইন যুদ্ধে ব্যাপক সামরিক ও আর্থিক
সহায়তা দিচ্ছে, যা তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটে চাপ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত তীব্র হলে নতুন শরণার্থী প্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে, যা ২০১৫
সালের মতো রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। তাই ইউরোপীয় দেশগুলোর সরাসরি
আক্রমণাত্মক ভূমিকা নেওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। তবে তারা নৌ
নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সহায়তা, কূটনৈতিক মধ্যস্থতা এবং মানবিক সহায়তায় সক্রিয়
থাকতে পারে।
অন্যদিকে, চীন ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রায় ২৫ বছর
মেয়াদি সহযোগিতা চুক্তির আওতায় কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের কথা
বলা হয়েছে, বিশেষ করে জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে। তবে এতে পারস্পরিক সামরিক
প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতা নেই। রাশিয়া ও ইরানের মধ্যেও সামরিক প্রযুক্তি ও
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে, কিন্তু তা পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট নয়। ফলে উভয়
দেশ রাজনৈতিক সমর্থন দিলেও সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি নিচ্ছে না।
পরাশক্তিগুলোর
আচরণে একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো তারা বহুমাত্রিক স্বার্থকে একসঙ্গে
বিবেচনায় নেয়। বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলারের
বেশি এবং জ্বালানি তার অন্যতম চালিকাশক্তি। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি
হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোও
বিপদে পড়ে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ তাদের আমদানি করা তেলের প্রায়
৮০ শতাংশের বেশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে পায়। ভারতও তার মোট তেলের প্রায় ৫৫ থেকে
৬০ শতাংশের বেশি এই অঞ্চল থেকে আমদানি করে। ফলে আঞ্চলিক সংঘাত দ্রুত
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে চীন ও রাশিয়ার
বর্তমান অবস্থানকে কৌশলগত দূরত্ব রক্ষা বলা যেতে পারে। তারা ইরানের ওপর
হামলার সমালোচনা করছে, কিন্তু সরাসরি সামরিক সহায়তা দিচ্ছে না। কারণ তারা
জানে, সরাসরি অংশগ্রহণ মানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উন্মুক্ত সংঘাতের ঝুঁকি,
যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শত শত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। একই
সঙ্গে তারা ভবিষ্যৎ আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও রাখতে চায়, যাতে
রাজনৈতিক প্রভাব বজায় থাকে।
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে দেখা গেছে,
পরাশক্তিগুলো কখনোই একরৈখিক সিদ্ধান্ত নেয় না। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের
পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণ এখনও বছরে প্রায় ৬৬০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি,
যদিও তারা কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী। এই দ্বৈত সম্পর্কই দেখায়, সংঘাত ও
সহযোগিতা একই সঙ্গে চলতে পারে। একইভাবে রাশিয়া পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে
বিরোধে জড়ালেও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে তাদের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।
মোটকথা,
বিশ্বের পরাশক্তিগুলো সব সময় যুদ্ধ-বিগ্রহ বা সহযোগিতা উভয় ক্ষেত্রেই
নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। আদর্শ ও নৈতিকতার ভাষ্য থাকলেও বাস্তব
সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয় অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান, জ্বালানি প্রবাহ, সামরিক
সক্ষমতা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবের হিসাব দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান
পরিস্থিতি সেই বাস্তবতার আরেকটি উদাহরণ। বন্ধুত্ব হোক বা শত্রুতা, প্রতিটি
পদক্ষেপের কেন্দ্রে থাকে জাতীয় স্বার্থের অঙ্ক, এবং সেই অঙ্কই নির্ধারণ করে
বিশ্ব রাজনীতির পরবর্তী চাল।
লেখক: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক।
