
বাংলাদেশ ষড়ঋতুর
দেশ। কিন্তু তিনটি ঋতুই দৃশ্যমান- গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত। গ্রীষ্মকালের
ব্যাপ্তি বিগত চৈত্র মাস থেকে আশ্চিনমাস পর্যন্ত। এরই মধ্যে আষারে শুরু হয়ে
যায় বর্ষা, কার্তিক ছাড়িয়ে অগ্রহায়ণ পর্যন্ত। আবার কার্তিকে হিমেল হাওয়ায়
জানান দেয় শীত আসছে। এই শীত চলে ফাল্গুন পর্যন্ত। শরৎ-হেমন্ত-বসন্ত কেবলই
কাগজপত্রে। আবেগ-আমেজ-মনকে-শরীরকে-প্রকৃতিকে তেমন সাড়া জাগায় না। ধান ভানতে
শিবের গীত। লিখতে বসেছিলাম কুমিল্লা শহরের হালচাল নিয়ে। কাজেই আদার
ব্যাপারির জাহাজের খবর নেয়ার দরকার কি ?
কুমিল্লা শহর অর্থাৎ কুমিল্লা
সিটি কর্পোরেশন (কুসিক), যেখানে আমি, আমরা বসবাস করি। আবেগ উচ্ছ্বাসে অতীত
নিয়ে গর্ব করি, কখনও কখনও মালা গেঁথে গলায় পরি। কিন্তু সামনের দিকে তাকিয়ে
দেখি মালার ফুলগুলো এসেছে যশোর-পাবনা বা অন্যখান থেকে। অর্থাৎ কুমিল্লায়
কোনো ফুলের বাগান নেই। কেন নেই ? এখন তো ফুল শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের
লোকেরা পূজা-আর্চায়ই ব্যবহার করে না, শতগুণ বেড়ে গেছে নানা
উৎসবে-সংবর্ধনায়-বরণে। জাতীয় অনুষ্ঠান তো ফুলবিহীন মরুভূমি। সুতরাং ফুল এখন
নান্দনিক অভিযাত্রায় মান্য উপকরণ। যা শুধু সৌন্দর্যই শোভিত করে না,
প্রাণঢালা অভিব্যক্তিকে নিবেদনের প্রতিনিধিত্ব করে।
চোখবুঝে কুমিল্লা
শহরটি একবার বিচরণ করলাম, ফুলের বাগান দেখলাম না, বাগান করার জায়গাও দেখলাম
না। আশ্চর্য হলাম শিশুরা ২/৩টি ফুলের নাম জানে, গন্ধ আছে কীনা, কেন ফুল
আমাদের প্রিয়বস্তু তাও জানে না। অথচ ভালোবাসা দিবসে, জন্মদিনে, বিয়ে
অনুষ্ঠানে, সংবর্ধনায় ফুল হয়ে গেছে আবিশ্যিক। এতে সিটি কর্পোরেশনের কোনো
দায় আছে কীনা তাও জানি না। এ নিয়েও কিছু বলব না।
গ্রীষ্মকাল চলে এসেছে,
সামনে আষাঢ় মাস থেকে বর্ষা শুরু হবে। ভাবছি, কুমিল্লা শহরবাসী এই বর্ষণ
কেমন উদযাপন করবে। নির্বাচিত নগরপিতা নেই। সরকার প্রশাসনের কর্মকর্তা দিয়ে
প্রশাসক নিযুক্ত করেছিল। বড় মাপের আমলা। সৌভাগ্যক্রমে তিনি আমার কলেজে
ক্লাসে পড়ুয়া ছাত্র। বিনা কাজে দেখতে গিয়ে মনে হলো, কর্তাব্যক্তিটি সরকারি
আমলা-মানসিকতার উচ্চকিত। তাদের তো কোন দায় নেই। কারণ, তারা নিয়োগপ্রাপ্ত,
অঙ্গীকারবাহী দায়বদ্ধতায় জবাবদিহিতা তাদের মধ্যে নেই। স্বস্থানে তাদের
মানায়, ‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’ বলে কথা।
জনপ্রতিনিধিত্বমূলক পদে অত্যন্ত বেমানান। যাক এখন আমাদের পরিচিত
জনপ্রতিনিধি না হলেও জনগণের কাতারে সামিল একজন প্রশাসক পেয়ে গেলাম। আমরা
তাকে চিনি, আমাদেরই লোক। তবে যেহেতু তার একটি বলিষ্ঠ রাজনৈতিক পরিচয় আছে,
এটা আমরা আমলে নিতে চাই না। এটা তার ব্যক্তিগত আদর্শিক হিসাবপত্র। ভবিষ্যতে
প্রশাসক থেকে জনপ্রতিনিধির স্থান অর্থাৎ মেয়র হবার একটি সুবর্ণ সুযোগ তার
দল তাকে দিয়েছে। এ সুযোগটি তিনি নিবেন এই প্রত্যাশায় নগরবাসী হিসেবে
বর্তমান শহরের হাল অবস্থা থেকে জনগণকে কীভাবে স্বস্তি দেয়া যায় বা দেয়া
জরুরি এ নিয়ে দুটো কথা।
১. বর্ষাকাল আসছে। বিগত একবছর যাবত শহরের কোনো
নর্দমা পরিষ্কার করা হয়নি। সংস্কার তো দূরের কথা। ফলে মশক নামক ক্ষুদ্র
জানোয়ারগুলো এখন বাঘের শক্তিতে নগরবাসীকে ক্রমান্বয়ে ইরান-ইজরাইল যুদ্ধের
শক্তিতে আক্রমণ করে চলেছে। নিশ্চয়ই প্রশাসক মহাশয় তাদের সাথে যুদ্ধ করছেন।
সোজা কথা-মশক নিধনের ব্যবস্থা করেন, নালা-নর্দমা-কচুরিপানা ভর্তি জলাশয়গুলো
পরিষ্কারের ব্যবস্থা করুন, নগরবাসীকে এ অসহায় থেকে মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা
করলে ভবিষ্যতে আপনার পিছনে আমরা দাঁড়াতে বিবেচনা করব। কুমিল্লাবাসী অকৃতজ্ঞ
নয়।
২. যানজট নিসরনের জন্য ফুটপাতের দখলদারিত্বকে মুক্ত করুন।
অনুমতিহীন যানবাহন শহর থেকে বিতারিত করুন। যত্রতত্র যানবাহন শহরে কোথাও
অবস্থান করতে দিবেন না। যে সমস্ত যানবাহন চলাচল করবে, তা চলমান থাকবে,
থামার জন্য কোনো স্থান দেয়া যাবে না। উল্লেখ্য চাঁদাবাজির বিষয়টি যদি বন্ধ
করা না যায়, তবে অসামাজিক লোকের আনাগোনা বেড়েই চলবে। শুনেছি ভিক্ষুকরাও
নাকি চাঁদা দিয়ে ভিক্ষা করে।
৩. শহরের ভেতরের রাস্তাগুলো বিন্যাস করে
যানবাহন চলাচলের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অর্থাৎ কোন রাস্তা দিয়ে
কোনদিকে যানবাহন চলবে তার নির্দেশনা থাকবে, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করবে। শহরের
ভিতরে যেসকল যানবাহন চলবে, চালকের সুনিদিষ্ট পোশাক ও অনুমতিকার্ড থাকবে।
৪.
সিটি কর্পোরেশন যখন পৌরসভা ছিল, তখন থেকে শহরের রাস্তাগুলোর নামকরণ ছিল,
এখন নামফলক দৃশ্যমান নেই। নামফলকগুলো শহরের একধরনের গুণগত ঐতিহাসিক
পরিচিতি।
বলে রাখি, শহরের কোনো রাস্তার মধ্যে গতিনিয়ন্ত্রক
(স্ট্রীটব্যাকার) থাকতে পারবে না। বর্ষা আসার আগেই রাস্তাগুলো সংস্কার না
করলে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করবে। এজন্য নিয়শ্চয়ই সিটি কর্পোরেশনের
জন্য অর্থের অভাব হবে না।
আগে দেখেছি-নানা উছিলায় নগরবাসীর হোল্ডিং
টেক্স বাড়ানো হয়েছে অস্বাভাবিকভাবে, আবার কমানোর নামে আবেদনপত্র বিক্রি করে
জনহয়রানি করা হয়েছে। এর পেছনে কী রহস্য আছে, জানি না। তবে ঘৃণা ও ক্ষোভ
জমা হয়েছে কর্তাব্যক্তিদের ভাগ্যে। মাথাউচু করে কথা বলে, কিন্তু জনগণের
কষ্টের দায় থেকে মননে রেহাই পায় না।
৫. বর্তমান সিটি কর্পোরেশনের
প্রশাসক যেহেতু আমাদের পরিচিত ও খুদে রাজনীতিবিদ, আমাদের সন্তানতুল্য তার
কাছে না বলা কথাগুলো বলতে গিয়ে থেমে গেলাম। শুধু বলতে চাই- তার স্বল্পকালীন
অবস্থানে যে কর্মযজ্ঞের স্বাক্ষর রাখবেন, আমরা যেন তাকে না ভুলি- শহর
বিহারে যেন তাঁকে খুঁজে পাই।
৬. বিশেষত রাজগঞ্জ বাজারের মাছ ও তরকারি দোকানগুলো উপরে অবস্থায় ছাউনির ব্যবস্থা করলে ক্রেতা-বিক্রেতার উপকার হবে।
সস্তা
জনপ্রিয়তা সাময়িক। মিডিয়ায় প্রচারের প্রয়োজন নেই। আমরা কাজ চাই। সিটি
কর্পোরেশনে শুধুমাত্র নির্দেশনামূলক ফেস্টুন থাকবে। অন্য সকলপ্রকার
প্রচারণাগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কান্দিরপাড় হলো শহরের রাজধানী, তাকে
নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অন্যান্য জনবহুল স্থানগুলো শৃঙ্খলায় চলে আসবে।
কুমিল্লা শহর বিত্তশালীদের আবাসভূমি নয়। মধ্যবৃত্ত ও নিম্নমধ্যবৃত্তের
লোকসংখ্যাই বেশি। তাদের জীবনযাপনে নিরাপত্তা ও স্বস্তি প্রত্যাশা করে।
নিরাপদ জীবনযাপনের জন্য সৌহার্দ্য ও আন্তরিকতা প্রত্যাশী। এক্ষেত্রে সিটি
কর্পোরেশনের দায়িত্ব হচ্ছে চলমান স্রোতকে বাসোপযোগী পরিবেশ, জনগণের
ন্যূনতম চাহিদা, রাস্তায় হেঁটে চলার সুবিধা, সন্ধ্যের পর রাস্তায় বাতিগুলো
জ¦লে উঠা, ধুলাবালিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, দৈনিক
জমানো ময়লাগুলো ভাগাড়ে ফেলার ব্যবস্থা করা, কিছুটা নান্দনিক করার স্বার্থে
রাস্তার দু’লাইন নিশ্চিত করা, শহরে কোনো যানবাহনই ওভারটেক না করার পক্ষে
কঠোর হওয়া, শপিংমলের সামনে গাড়ি পার্কিং নিষিদ্ধ করা, পূবালী চত্বরসহ
চৌমাথাগুলো একটু পরিচর্যা করা- এরূপ ছোটখাট বিষয়গুলো একটু তদারকি করলেই
শহরবাসী স্বস্তি পাবে, নগরপিতা বা প্রশাসককে বার বার খোঁজ করবে। শহরবাসী
কর দিবে, আবার সুবিধাও তো ভোগ করতে চাইবে। এই দেয়া-নেয়ার মধ্যে ভারসাম্য
থাকলে আমার, আমাদের কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন একটি মডেল অবস্থায় পৌঁছে
যাবে। বিভাগ পাইনি, অন্তত কর্পোরেশন তো পেয়েছি। জমিদারের মেয়ে যখন বিয়ে
দেয়া হয়েছে, জামাই হিসেবে স্বীকৃতি দিবেই। শুধু সময়ের অপেক্ষা এবং ধৈর্য
ধরার বিষয়।
কুমিল্লা তো কুমিল্লাই, কুমিল্লা শহর তো ইতিহাসের উজ্জ্বল
নক্ষত্র। এ শহরে রাজবাড়ি আছে, নবাববাড়ি আছে, খানবাহাদুর-রায়বাহাদুরের
আবাসভূমি, সতোরটি জমিদার বাড়ি ছিল (আছে), আছে ঐতিহাসিক দিঘি, ত্রিপুরা
রাজার পরিচয়বাহী নানা ঐতিহাসিক স্থাপনা, আমাদের আছে রাজা-নামাঙ্কিত নগর
মিলনায়তন, থিউসফিকেল সোসাইটি, শতবর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এশিয়াখ্যাত
গ্রন্থাগার ইত্যাদি। শুধু পরিচর্যার অভাবে মাঝে মাঝে ম্রিয়মান খয়ে যায়
কতিপয় অযোগ্য লোভী মানুষের জন্য। যাদের শহরবাসী একসময় বিশ^াস করেছিল।
আমাদের টাউন হল মার্কেট, সিটিশপিংমল, সোনালী চত্বরের দরকার আছে কি? শহরের
উপকন্ঠে অবহেলিত জনপদে যারা বাস করে তাদের খবরাখবর রাখা হচ্ছে কি ? শহরের
পূর্বদিকে গেলে মাদক আর চোরাকারবারি। দক্ষিণদিকে গেলে যানবাহন ও জলাবদ্ধতা,
উত্তরদিকে গেলে নদী দখলদারিত্বের আস্ফালন, পশ্চিমদিকে চাঁদাবাজি-এভাবে তো
সিটি কর্পোরেশন চলতে পারে না।
মেয়র বলি আর প্রশাসক বলি- অন্তত একজন আত্মোৎসর্গ করুক, আমরা পেছনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার চীৎকার কি শোনা যায় ?
আমার,
আমাদের কথা শুনতে হবে। আমরা বলব, আমরা এমনটি চাই যা কুমিল্লা সিটি
কর্পোরেশনের স্বার্থে, জীবন-জীবিকার স্বার্থে, উন্নত জীবনযাপনের
স্বার্থে-একটি বাসযোগ্য ভদ্রলোকের আবাসভূমি হোক, যেন গর্ব করতে পারি।
আমার এলোমেলো কথাগুলো সাজিয়ে নিবেন হে নগরকর্তা। ইতি...
