
বর্ষবরণ
সম্পর্কে সকল বাঙ্গালীরই প্রাণে স্পন্দন আসে। মতবিভেদ থাকলেও গ্রহণযোগ্য
সংস্কৃতি চর্চা সবারই কাম্য। শোভাযাত্রার ব্যাপারে বলাবাহুল্য ১৯৮৯ সালে
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে যে শোভাযাত্রা বের হয়েছিল এর নাম ছিল
আনন্দ শোভাযাত্রা পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে এটি মঙ্গল শোভাযাত্রায় রূপ নেয়। ২০১৬
সালে উনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায় এই শোভাযাত্রাটি। ২০২৫
সালে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এটি পুরোনো নামে ফিরে যায়। তবে নিয়ম অনুযায়ী
ইউনেস্কোকে অবহিত না করায় জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা
ইউনেস্কোর অপরিমেয় সংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় এখনো ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা অন
পহেলা বৈশাখ’ শিরোনামেই অন্তর্ভুক্ত আছে বলে জানা গেছে। ইউনেস্কো নামকরণ
সংক্রান্ত জাতীয় সিদ্ধান্তে কোন অবস্থান নেয় না, কারণ এ ধরনের বিষয় সদস্য
রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব এখতিয়ার ও সিদ্ধান্তের আওতাভুক্ত। যদি বাংলাদেশ সরকার এ
নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয় তবে ইউনেস্কোর কাছে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন
জমা দিতে হবে। এ ধরনের অনুরোধ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র করতে পারে এবং তা কমিটির
অধিবেশনের অন্ততঃ তিনমাস আগে বিবেচনার জন্য জমা দিতে হয়।
বাংলা নববর্ষের
অন্যতম অনুষঙ্গ শোভাযাত্রার নতুন নাম নির্ধারণ করা হয়েছে। বিগত সময়ের মত
আনন্দ বা মঙ্গল শোভাযাত্রা নয়। এ বছর থেকে শোভাযাত্রার নাম হবে ‘বৈশাখী
শোভাযাত্রা’। জাতীয়ভাবে বাংলা নববর্ষ এবং চাকমা, মারমা, গারো, সাঁওতাল,
ত্রিপুরা ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের নববর্ষÑ১৪৩৩
উপলক্ষে প্রস্তুতি সভাশেষে সাংবাদিকদের কাছে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মূল শক্তি হল
এর বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। কোন সুনির্দিষ্ট শব্দ বা নাম যেন উৎসবের আমেজকে
নষ্ট না করে এবং সমাজের কোন অংশ যেন নিজেকে এ উৎসব থেকে বিচ্ছিন্ন মনে না
করে সেই দায়বদ্ধতা থেকেই এ সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। চারুকলা অনুষদের
শিক্ষক ইসরাফিল রতন বলেন, এবার শোভাযাত্রার প্রধান মোটিফ হবে একটি উদীত
সূর্য এবং একটি মোরগ। তিনি জানান, গ্রামবাংলায় ভোরে মোরগের আহ্বানেই সূচনা
হয় নতুন দিনের, যা শহরে এমনকি গ্রামেও খুব বেশি দেখা যায় না। এবারের
বর্ষবরণের প্রতিপাদ্য, ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ এর সঙ্গে
সামঞ্জস্য রেখেই এ মোটিফ তৈরি হচ্ছে। শিল্পকর্মের ভাষায় ঐতিহ্যের
পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানানো হচ্ছে।
আলোচনার একটা অংশ নামকরণ। আরেকটা অংশ
হচ্ছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দুই দিকপাল বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ও জাতীয় কবি
নজরুল। আমার মনে হয় শেকস্পিয়ার ইংরেজি সাহিত্যকে যা দিয়েছেন আমাদের এ
কবিদ্বয় বাংলা সাহিত্যকে তার চেয়ে অনেক বেশি দিয়েছেন। তাঁদের স্মরণে একটি
রোমাঞ্চকর গল্প যা আমার শিক্ষকের কাছে শুনেছি তা না বলে পারছিনা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কালÑভারতে প্রথম রেডিও স্টেশন চালু করা হবে। একটা
ভাল নাম দরকার। কর্তৃপক্ষ কবিগুরুর শরণাপন্ন হলেন। রবি ঠাকুর কি এক রচনায়
ব্যস্ত ছিলেন। অনুরোধ শুনে মূহুর্তেই একটা নাম বলে আবার নিজের লেখায় ব্যস্ত
হয়ে পড়লেন। নাম দিয়েছিলেন, ‘আকাশবাণী’। তখন থেকেই ভারতের রেডিওর নাম হয়ে
গেল ‘আকাশবাণী’। নামকরণত হল, এখন একটা সূচনা সঙ্গীত দরকার উদ্বোধনী করার
জন্য। অগত্যা কর্তৃপক্ষ আবারও কবিগুরুর শরণাপন্ন হলেন। আবদার শুনে কবিগুরু
হেসে বলেন, ‘আমি যদি সব করি, তাহলে পাগলায় করবে কি। পাগলার কাছে যাও, ও করে
দেবে।’ পাগলা কাকে বলেছিলেন? বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। কর্তৃপক্ষ
কাজী নজরুলের কাছে গিয়ে হাজির হলেন। বিদ্রোহী কবিত ফরমায়েশী কাজ করেন না।
কখনো পাত্তা দিতেন না এসব। তিনি শুনেই না করে দিলেন। হতাশ কর্তৃপক্ষ আবার
কবিগুরুর কাছে গেলেন। সব শুনে তিনি বললেন, ‘ও তো পাগলা। এভাবে ত করবে না।
ওকে আমার কথা বল আর একটা হারমোনিয়াম দিয়ে একটা ঘরে আটকে রাখো। ও করে
ফেলবে।’ তারাও ভয়ে ভয়ে তাই করলেন। ১ দিন যায়, ২ দিন যায় কিছুই হয় না। ৩
দিনের মাথায় বিদ্রোহী কবি একটা গান রচনা করে তাকে অবমুক্ত করতে বললেন,
বলাবাহুল্য সেই গান দিয়েই আকাশবাণীর উদ্বোধন হয়েছিল Ñ
“আকাশে আজ ছড়িয়ে দিলাম প্রিয়
আমার কথার ফুল গো
আমার গানের মালাগো
কুড়িয়ে তুমি নিও।”
বিদ্রোহী
কবি, প্রেমিক কবি, সর্বকালের রকস্টার কবি, কাজী নজরুল ইসলামের আর কবিগুরুর
প্রতি বছরের শুরুতেই সমগ্র জাতি শ্রদ্ধা জানানো সকল বাঙ্গালীয়ানা থেকে
দাবী রাখে।
চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগীতা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক
অনুষ্ঠানের সঙ্গে রবীন্দ্র-নজরুল সাহিত্য ও কাব্যচর্চাতে উৎসবের প্রাচুর্য
আনবে। অপসংস্কৃতি ও গোষ্ঠীগত সাংঘর্ষিকতার অনেক উর্ধ্বে চলে যাবে গোটা
বাঙ্গালী জাতি। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৈসাবি মূলত ত্রিপুরাদের বৈসু,
মারমাদের সাংগ্রাই এবং চাকমাদের বিজুর সম্মিলিত রূপে বর্ষবরণে উৎসব আনন্দঘন
হয়ে উঠছে। পরিশুদ্ধি ও নতুন বছরের সূচনার প্রতীক পানি খেলার মাধ্যমে
পুরোনো বছরের সব ক্লান্তি ধূয়ে ফেলে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো পাহাড়ী
জনগোষ্ঠীকে আরও সাংস্কৃতিক আবেশে আন্দোলিত করে। আঞ্চলিক অনুষ্ঠানে স্থানীয়
সাহিত্যিক কবিগণের সাহিত্যচর্চাকে যেমন Ñফরিদপুরে জসীমউদ্দিন, বরিশালে
জীবনানন্দ, সিলেটে মুজতবা আলীসহ সকল মনিষীদের স্মরণে বরণে রাখা হলে বর্ষবরণ
আরও মধুর হয়ে উঠবে। কেন্দ্রিয়ভাবে আয়োজন মালায় সন্নিবেশিত হোক বরীন্দ্র
নজরুল স্মরণিকা।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ
