
যুক্তরাষ্ট্র
ও ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের পেছনে বড় কারণ হলো, ইরানের প্রথম সারির নেতাদের
মেরে ফেলা। অর্থাৎ তাদের যে হিসাব সেটা হলো, ইসলামিক রিপাবলিকের বিরুদ্ধে
তারা কাজ শুরু করবে এবং বড় একটা রেজিম চেঞ্জ করতে চেষ্টা করবে। এটাই হচ্ছে
মূলত তাদের হিসাব-নিকাশ। এখন তাদের এ হিসাব আদৌ সঠিক হলো কি না সেটা ভেবে
দেখা দরকার। ইরানের জনগণ এখন কী করবে সেটাও দেখার দরকার আছে। এ ক্ষেত্রে
ইরানের ভেতরে একটা বিভাজন বা খণ্ডযুদ্ধ বেঁধে যায় কি না সেটাও দেখার দরকার
আছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো ল্যান্ডফোর্স ব্যবহার করেনি। যেকোনো রেজিম যদি
চেঞ্জ করতে হয়, যেটা আমরা ইরাকে দেখেছি, কুয়েতে দেখেছি, এমনকি
আফগানিস্তানেও দেখলাম, সব জায়গায় কিন্তু আমেরিকার ট্রুপস প্রয়োজন ছিল।
এখানে এখন পর্যন্ত সেটার ব্যতিক্রম দেখছি। আমরা ওই কাঠামো এখনো দেখছি না
যে, তারা ল্যান্ড ট্র্যাকার নামাবে। তার মানে হচ্ছে, তাদের ধারণা ইরানের
জনগণই তাদের পক্ষে চলে আসবে এবং পুরো একটা অংশ ইসলামিক রিপাবলিককে
প্রত্যাখ্যান করবে। সেটা দেখতে আমাদের আরও একটু অপেক্ষা করতে হবে। এখন
পর্যন্ত সে ধরনের কিছু আমরা দেখছি না। বরং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা দেশটির
প্রেসিডেন্ট আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে ইরানের জনগণ আবার রাস্তায়
নেমেছে। অন্য শহরগুলোতে কী হচ্ছে সেটা দেখার জন্যও আমাদের আরও অপেক্ষা করতে
হবে। আমরা দেখেছি, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এক ধরনের বিভাজন ঘটেছে। অর্থাৎ
মূলধারার মিডিয়ায় এক ধরনের খবর দেখাচ্ছে। আবার অন্য মিডিয়াগুলো একটু ঘুরিয়ে
অন্য কিছু দেখাচ্ছে। বড় আকারে ইরানের জনগণ যদি ইসলামিক রিপাবলিকের পক্ষে
থাকে এবং এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাহলে বিরোধী শক্তি খুব একটা এগোতে
পারবে না। আমেরিকা তখন আবার তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় বসতে চাইবে। তারা
বুঝতে পারবে যে, এভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এর বাইরে যদি কিছু করতেই হয়,
তাহলে তাদের একেবারে ল্যান্ডফোর্স নেমে করতে হবে। এখন তাদের পক্ষে জনগণের
একটা অংশ যদি নামে, তাহলে এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের মধ্যে যাবে।
বিভিন্ন শহরে রীতিমতো গৃহযুদ্ধ বা সিভিল ওয়ার আমরা যেটাকে বলি, সে ধরনের
কিছু ঘটবে। এবং সেটা হতে যাচ্ছে কি না সেজন্য নজর রাখা দরকার ইরান আসলে
কোন দিকে যাবে, সেদিকটায়।
দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে আছেন।
জনগণ মানে যতটুকু আমরা দেখতে পেয়েছি, সবসময় তাকে সমর্থন জানিয়েই গেছে।
অর্থাৎ কোনোভাবে কি যুদ্ধটাকে উসকে দেওয়ার জন্যই কিছু সংখ্যক মানুষকে এভাবে
রাস্তায় বের হয়ে উল্লাস করতে দেখানোর কোনো প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে? এটা
একটা বিষয় তো অবশ্যই। একজন সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে ওই ধরনের সমর্থন বা
তার মৃত্যুতে বিশেষ করে ধর্মের কাঠামোর মধ্যে যখন থাকে, তখন তাদের হইচই
করার কথা নয়। এগুলো আগে থেকেই ঠিক করা ছিল কি না তা পরিষ্কার হবে একসময়।
কয়েক মাস আগে ইরানে যে আক্রমণ করা হয়েছিল সেখানে মূলত ইসরায়েল ছিল
নেতৃত্বে। আমেরিকা তার পরে এসে ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়েছে, যখন ইসরায়েল আর
পেরে উঠছিল না। কিন্তু এবার তারই ধারাবাহিকতায় আমেরিকা নিজেই অংশ নিয়েছে।
সে হিসেবে ইসরায়েলের গ্রহণযোগ্যতা অতটা থাকার কথা নয়। আরেকটা বিষয় এখানে
বিবেচনায় রাখতে হবে- মধ্যপ্রাচ্যে যারা ক্ষমতায় আছে তারা মূলত আমেরিকাপন্থি
এবং অনেকটা আমেরিকার পকেটেই তারা আছে। অনেকে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে
আমেরিকাকে সমর্থন দিচ্ছে। সে জায়গায় একটা বড় বিভাজন কিন্তু রয়ে গেছে। সে
কারণে সেসব দেশে যারা সরকারে আছে, তারাও একটু সাবধানে সিদ্ধান্ত নেবে।
আমাদের দেখা দরকার তারা বড় আকারে ইরানের পেছনে আছে কি না। ইসরায়েল আর
আমেরিকার আক্রমণের বিরুদ্ধে তারা দাঁড়াচ্ছে কি না। সেটা যদি হয়ে থাকে তাহলে
যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটা অত সহজ হবে না। এবারে
মুসলিম রাষ্ট্রগুলো খুব বেশি সরবও নয়। তারা নীরব দর্শকের ভূমিকায় আছে। এ
ধরনের যুদ্ধে ইসলামিক রাষ্ট্রগুলো সবসময় ঐক্যবদ্ধ থাকে, সেটা আমরা সবসময়
দেখেছি।
যেকোনো যুদ্ধের দুটো দিক আছে। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক
অস্থিতিশীলতা যুদ্ধের কিছু কিছু ক্ষেত্রে লাভও করা যায়। আবার কিছু কিছু
ক্ষেত্রে জনগণের দুর্ভোগও বাড়ে। সেটাও খেয়াল রাখা দরকার মনে হয়।
অর্থনৈতিকভাবে অনেক সময় অনেক ব্যবসায়ীরা লাভ করেন এবং সে কাঠামোর মধ্যে
যারা কাজ করেন তাদেরও লাভ হয়। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই, যদি যুদ্ধ
দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলে বড় আকারের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যদি দেখা যায় যে,
পুরো ইরান ঐক্যবদ্ধ, তাহলে আকাশ থেকে বোম মারা ছাড়া আমেরিকা অথবা ইসরায়েলের
আর কোনো উপায় থাকবে না। এর ফলে রেজিস্টেন্স বাড়বে। এটা পৃথিবীর সব জায়গায়
দেখা গেছে। ইরান তখন আরও মরিয়া হয়ে আক্রমণ করবে। তারা সে জায়গায় যাবে কি না
সেটা আমাদের দেখা দরকার। সে হিসেবে যদি গৃহযুদ্ধ হয়, তাহলে সহজে থামার কথা
নয়। এখন সেরকম পরিস্থিতি হবে কি না সেটা নিয়েও ভাবার দরকার আছে।
এ কথাও
সত্য যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শুধু ইরান নয়, গোটা
মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে এ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে তাতে বাংলাদেশে জ্বালানি
আমদানি ও শ্রমবাজারের ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে করে বাংলাদেশসহ
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ
জ্বালানির জন্য মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ
হওয়ায় নিশ্চিতভাবে জাহাজে পণ্য পরিবহনে ব্যয় বাড়বে। কর্মপরিবেশ নিয়েও
উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অনেক শ্রমিকের বেকার হওয়ার
শঙ্কা রয়েছে। যারা দৈনিক শ্রমিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করেন, যুদ্ধের
কারণে তাদের অনেকেই বাসা থেকে বের হতে পারছেন না। তাদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এর প্রভাব পড়বে আরও ভয়াবহ রূপে।
এ যুদ্ধ বাংলাদেশসহ
সমগ্র বিশ্বের জন্য একটা ভয়াবহ উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরতা, রিজার্ভ স্বল্পতা, অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক
পরিবেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত বাংলাদেশি নাগরিকের
অবস্থানের কারণে চলমান সংঘাত বাংলাদেশের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে
পারে।
এ সংঘাত অচিরেই শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। এদিকে
ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন তাদের লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত ইরানে হামলা
অব্যাহত থাকবে। ইরানও জানিয়েছে তারা পাল্টা হামলা চলবে। তাদের এ
পাল্টাপাল্টি অবস্থান পুরো অঞ্চলকে দীর্ঘ ও অনিশ্চিত যুদ্ধে ঠেলে দিতে
পারে। দুই পক্ষই আগের সব সীমা অতিক্রম করেছে। পরিস্থিতি এখন সরাসরি ও
বিস্তৃত সামরিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরকার
পরিবর্তনের লক্ষ্য থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়নি। অন্যদিকে ইরানের
শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার জন্য সর্বাত্মক লড়াইয়ে নামতে প্রস্তুত। ফলে
মধ্যপ্রাচ্য আবারও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল এক যুদ্ধে প্রবেশ করেছে, বৈশ্বিক
অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে এর ক্ষতিকারক প্রভাব পড়তে পারে।
আমেরিকার
মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আশা করছে বিশ্বজুড়ে শান্তিকামী মানুষ। আমেরিকা খুশি
যে, সে শক্তিশালী ও আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি করছে। এটা যদি পরিবর্তন না
হয়, তাহলে আমরা বড় আকারে যে পৃথিবীর শান্তির কথা বলছি তা সম্ভব নয়। কারণ
আমেরিকার কাঠামোটাই হচ্ছে অস্ত্র তৈরি করা বা যুদ্ধের মধ্যে যাওয়া বা যুদ্ধ
পরিস্থিতি তৈরি করা। কারণ ৪০০ বছর ধরে পশ্চিমা সভ্যতার কাঠামো তৈরি হয়েছে।
সে জায়গায় পরিবর্তন আসতে হলে অর্থাৎ আধিপত্য বিস্তারের আগ্রাসী বিস্তারের
সংঘাতময় মনোভাব থেকে মুক্ত হতে হলে অবশ্যম্ভাবীভাবেই আমেরিকার জনগণকে এর
বিরুদ্ধে সজাগ হয়ে পরিবর্তন করতে হবে।
লেখক: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
