ইসলামি সংস্কৃতিতে যেসব দিবস ও রজনী বিখ্যাত, এর মধ্যে শবেবরাত অন্যতম। প্রতি বছর হিজরি বর্ষের শাবান মাসের ১৪ তারিখ রাতটি ‘শবেবরাত’ হিসেবে পালন হয়। হাদিস শরিফে একে ‘নিসফ শাবান’ বা শাবান মাসের মধ্যরাত বলা হয়েছে।
হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা অর্ধ শাবানের রাতে (শবে বরাতে) তাঁর সৃষ্টির প্রতি মনযোগী হন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান : ৫৬৬৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৯০, মুসান্নাফু ইবনে আবি শাইবাহ : ৩০৪৭৯)
হজরত আলা ইবনুল হারিছ (রাহ.) থেকে বর্ণিত, হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে নামাজে দাঁড়ান এবং এত দীর্ঘ সেজদা করেন যে, আমার ধারণা হলো তিনি হয়তো মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তখন উঠে তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সেজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করলেন তখন আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা, অথবা বলেছেন, ও হুমায়রা, তোমার কি এই আশংকা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসুল তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, না, ইয়া রাসুলুল্লাহ। আপনার দীর্ঘ সেজদা থেকে আমার আশংকা হয়েছিল, আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কি না। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জানো এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন ইরশাদ করলেন-
অর্থ : এটা হলো অর্ধ-শাবানের রাত (শাবানের চৌদ্দ তারিখের দিবাগত রাত) আল্লাহ তায়ালা অর্ধ-শাবানের রাতে তাঁর বান্দার প্রতি মনোযোগ দেন এবং ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহপ্রার্থীদের প্রতি অনুগ্রহ করেন আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই। (শুআবুল ঈমান, বায়হাকি : ৩/৩৮২-৩৮৩)
উল্লিখিত হাদিস থেকে প্রতিয়মাণ হয় যে, এ রাতে ইবাদতের কোনো ধরণ নির্দিষ্ট নেই, বরং এ রাতে এমন সব নেক আমল করা উচিৎ যার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত লাভ করা যায়। তাই এ রাতে আমরা নিম্মোক্ত আমলসমূহ করতে পারি।
এক . মাগরিব, এশা ফজরের নামাজ অবশ্যই জামাতের সাথে আদায় করা।
দুই . নফল নামাজ পড়া। তবে মনে রাখবেন, কোরআন-হাদিসে শবেবরাতের জন্য বিশেষ পদ্ধতির কোনো নামাজ নেই। সবসময় যেভাবে নামাজ পড়া হয়, সেভাবেই পড়বেন। অর্থাৎ দুই রাকাত করে যত রাকাত সম্ভব হয় আদায় করবেন এবং যে সুরা দিয়ে সম্ভব হয় পড়বেন। তদ্রূপ রোজা বা অন্যান্য আমলেরও বিশেষ কোনো পন্থা নেই। বিভিন্ন বই-পুস্তকে নামাজে যে নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন লেখা আছে, অর্থাৎ এত রাকাত হতে হবে, প্রতি রাকাতে এই এই সুরা এতবার পড়তে হবে- এগুলো ঠিক নয়। হাদিস শরিফে এ ধরনের কোনো নিয়ম নেই, এগুলো মানুষের মনগড়া পন্থা।
তিন . তওবা করা। জীবনের সমস্থ ভুল-ত্রুটির জন্য মন থেকে অনুতপ্ত হওয়া এবং আল্লাহর দরবারে ক্ষমা ও হেদায়াতের প্রার্থনা করা।
চার . কোরআনে কারিম তেলাওয়াত করা, দরূদ শরীফ পড়া, জিকির-আজকার করা ও ইস্তেগফার পড়া ইত্যাদি।
ফজিলতপূর্ণ দুটি ইস্তিগফার
সায়্যিদুল ইস্তিগফার
উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা আনতা রাব্বি লা ইলা-হা ইল্লা আনতা খালাক্বতানি, ওয়া আনা আবদুকা ওয়া আনা আ’লা আহদিকা ওয়া ওয়া’দিকা মাসতাত্বা‘তু, আ‘ঊযুবিকা মিন শার্রি মা ছানা‘তু। আবূউ লাকা বিনি‘মাতিকা ‘আলাইয়া ওয়া আবূউ বিজাম্বি, ফাগফিরলী ফাইন্নাহূ লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা।
ফজিলত : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি নিষ্ঠা ও বিশ্বাসের সাথে দিনে ও রাতে এই ইস্তিগফার পড়বে এবং এ অবস্থায় যে কোনো সময় মারা যাবে, সে নিঃসন্দেহে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (বোখারি : ৬৩০৬ ও তিরমিজি : ৩৩৯৩)
সংক্ষিপ্ত ইস্তেগফার
উচ্চারণ : আসতাগফিরুল্লাহাল আজিম, আল্লাজি লা ইলাহা ইল্লাহুয়াল হায়্যুল ক্বাইয়্যুম ওয়া আতূবু ইলাইহি।
ফজিলত : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি বিছানায় যাওয়ার পূর্বে এ ইস্তিগফার তিনবার পড়বে, আল্লাহ তায়ালা তার গোনাহ মাফ করে দেবেন- যদিও তা সুমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হয় বা গাছের পাতার মতো অগণিত হয়; অথবা ‘আলেজের’ মরুও বালুকারাশির সমপরিমাণ হয় কিংবা দুনিয়ার যত দিবসসমূহের সমপরিমাণ হয়। (তিরমিজি : ৩৩২৯ ও আততারগিব আততারহিব : ১/১২)
পাঁচ . এ রাতে গুরুত্বসহকারে দোয়া করা, কারণ এ রাতে দোয়া কবুল হওয়ার কথা বার বার ধ্বনিত হয়েছে।
ছয় . এ রাতে কিছু দান সদকা করে এবং নফল ইবাদত করে মৃতদের জন্য ইসালে সাওয়াব পৌঁছানো।
সাত . ১৫ শাবান নফল রোজা রাখা। রোজা রাখার বিষয়টি উল্লিখিত হাদিস ছাড়াও অন্যান্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
আট . সলাতুত তাসবিহ্ আদায় করা যেতে পারে। সালাতুত তাসবিহের নিয়ম কোনো আলেম থেকে জেনে নিতে হবে।
এ রাতের নফল আমলসমূহ সম্মিলিত নয়, ব্যক্তিগত
বিশুদ্ধ মতানুসারে, শবেবরাতে নফল আমলগুলো একাকী করণীয়। ফরজ নামাজ তো অবশ্যই মসজিদে জামাতের সঙ্গে আদায় করতে হবে। এরপর যা কিছু নফল পড়ার তা নিজ নিজ ঘরে একাকী পড়বেন। এসব নফল আমলের জন্য দলে দলে মসজিদে এসে সমবেত হওয়ার প্রমাণ হাদিস শরিফে নেই , এমনকি সাহাবায়ে কেরামের যুগেও এর রেওয়াজ ছিল না। তবে কোনো আহ্বান ও ঘোষণা ছাড়া এমনিই কিছু লোক যদি মসজিদে এসে যায়, তাহলে প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলে মশগুল থাকবে, একে অন্যের আমলে ব্যাঘাত সৃষ্টির কারণ হবে না। ( ইকতিজাউস সিরাতিল মুস্তাকিম : ২/৬৩১-৬৪১ ও মারাকিল ফালাহ : পৃ. ২১৯)
শবে বরাতে বর্জনীয় বিষয়
১. আতশবাজী, পটকা ইত্যাদি ফুটানো ও তারাবাতি জ্বালানো।
২. মসজিদ, ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট ও অন্যান্য জায়গায় আলোকসজ্জা করা। এসব অপচয়ের শামিল। তাছাড়া এটি বিধর্মী এবং হিন্দু দেওয়ালী উৎসবের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার কারণে অবশ্যই পরিত্যাজ্য ও বর্জনীয়। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে।
৩. ইবাদত মনে করে হালুয়া-রুটি বা খিচুড়ির আয়োজন করা যাবে না। কারণ এসবের কারণে মা-বোনদের দামি সময় নষ্ট হয়, মসজিদে হৈ চৈ ও শোরগোল হয়, ইবাদত করার পরিবেশ নষ্ট হয় এবং এ সবের পিছনে পড়ে এ রাতের তাওবা-ইত্তেগফার, নফল ইবাদত ইত্যাদি ছুটে যায়। (ইকতিষাউস সিরাতিল মুস্তাকিম : ২/৬৩২ , ইমদাদুল ফাতাওয়া : ৫/২৮৯)
সুতরাং এগুলোও পরিহার করা আবশ্যক। এক কথায় এ রাতে আনুষ্ঠানিকতা এবং অপ্রয়োজনীয় কাজ বর্জন করে নিবিড়ভাবে নফল ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা উচিৎ, যাতে আমরা বরকতপূর্ণ রাতের বরকত লাভে ধন্য হয়ে আল্লাহর সাধারণ ক্ষমাপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি।
