শাবান মাসের ১৫তম রাতকে বলা
হয় ‘শবে বরাত’। এ রাতে অগণিত মানুষের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয় এবং বহু
জাহান্নামিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়, তাই এ রাতটি শবে বরাত বা
মুক্তির রাত নামে পরিচিত।
কোরআন শরিফে শবে বরাতের রাতকে লাইলাতুম
মুবারাকাহ বা বরকতময় রাত হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। আর হাদিসে শবেবরাতকে
লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান বা শাবান মাসের মধ্য রাত তথা ১৪ তারিখ দিবাগত রাত
হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) বলেন, শবেবরাতকে
শবেবরাত বলা হয় এ কারণে যে এ রাতে দুই প্রকারের বরাত (মুক্তি) হয়ে থাকে।
অপরাধী
ও হতভাগাদের আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দান করেন। দুই.
যারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা, তাদের বিপদ-আপদ, বালা-মুসিবত, অপমান-লাঞ্ছনা
থেকে মুক্তি দান করেন। (গুনিয়াতুত তালেবিন, পৃষ্ঠা ৪৫৬) হাদিসে শবেবরাতের
অনেক গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। তন্মধ্যে কতিপয় হাদিস উল্লেখ করা হলো:
আয়েশা
(রা.) বলেন, এক রাতে আমি রাসুলুল্লাহকে (সা.) বিছানায় না পেয়ে ঘর থেকে
খুঁজতে বেরিয়ে পড়লাম। হঠাৎ তাকে জান্নাতুল বাকিতে (মদিনা তায়্যিবার
কবরস্থান) গিয়ে পেলাম। তিনি আমাকে বলেন, তুমি কি আশঙ্কা করো আল্লাহ ও তার
রাসুল তোমার ওপর কোনো অন্যায় করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি
আপনার অন্য কোনো স্ত্রীর কাছে চলে গিয়েছেন বলে আমার ধারণা হয়েছিল।
তিনি
বলেন, শোন, আল্লাহ তাআলা মধ্য শাবানের রাতে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে নেমে
আসেন। আর বনু কালব (বনু কালব ছিল আরবের একটি গোত্র, তাদের কাছে আরবের সব
গোত্রের চেয়ে বেশি ছাগল ছিল) গোত্রের বকরি পালের লোমের সংখ্যার চেয়েও
বেশিসংখ্যক লোককে তিনি ক্ষমা করে দেন। (তিরমিজি, হাদিস : ৭৩৯)
আবু মুসা
আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে
আত্মপ্রকাশ করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া তার সৃষ্টির সবাইকে ক্ষমা করেন।
(ইবনে মাজাহ, পৃষ্ঠা ৯৯; শুআবুল ঈমান : খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৮২)
মাশাহানের
তাফসির অনুযায়ী, উপরিউক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে সেসব বিদআতিও তার
অন্তর্ভুক্ত যারা মুসলিম জামাত থেকে ভিন্ন পথ অবলম্বন করে। (মুসনাদে ইসহাক
বিন রাহাবিয়া : খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৯৮১, হাশিয়ায়ে ইবনে মাজাহ, পৃষ্ঠা ৯৯)
এ
রাতে ইবাদতের কোনো ধরন নির্দিষ্ট নেই; বরং এ রাতে এমন সব নেক আমল করা উচিত
যার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত লাভ করা যায়। তাই এ রাতে আমরা
নিম্নোক্ত আমল করতে পারি।
এক. মাগরিব, এশা ও ফজরের নামাজ অবশ্যই জামাতের সঙ্গে আদায় করা।
দুই.
নফল নামাজ পড়া। এ ক্ষেত্রে অনির্ভরযোগ্য কিছু বই-পুস্তকে নফল ইবাদতের
বিভিন্ন নিয়মের কথা উল্লেখ আছে। যেমন-এত রাকাত পড়তে হবে, প্রতি রাকাতে এই
এই সুরা এতবার পড়তে হবে। অথচ সহিহ হাদিসে শবেবরাত, শবেকদর বা অন্য কোনো
ফজিলতপূর্ণ রাতে এসব বিশেষ পদ্ধতির কোনো নামাজ প্রমাণিত নেই।
তিন. তাওবা
করা। তাওবা বলা হয় : (ক) কৃতপাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া। (খ) তৎসঙ্গে উক্ত
পাপটি পরিহার করা। (গ) ভবিষ্যতে উক্ত পাপটি আর করব না-মর্মে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা
করা। (ঘ) বান্দার হক নষ্ট করে থাকলে তার হক আদায় করে কিংবা ক্ষমা গ্রহণ করে
দায়মুক্ত হওয়া। (ঙ) কোনো ফরজ-ওয়াজিব ছুটে গিয়ে থাকলে মাসআলা অনুযায়ী তার
কাজা-কাফফারা আদায় করা। অতঃপর আল্লাহর আনুগত্যের দিকে ফিরে আসা এবং অন্তর
থেকে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
চার. কোরআন তিলাওয়াত করা, দরুদ শরিফ পড়া, জিকির-আজকার করা ও ইস্তিগফার পড়া ইত্যাদি।
পাঁচ. এ রাতে গুরুত্ব সহকারে দোয়া করা, কারণ এ রাতে দোয়া কবুল হওয়ার কথা হাদিসে উল্লেখ আছে।
ছয়. এ রাতে সাধ্যমতো কিছু দান-সদকা করে এবং নফল ইবাদত করে মৃতদের জন্য সওয়াব পৌঁছানো।
সাত. ১৫ শাবান নফল রোজা রাখা। রোজা রাখার বিষয়টি উল্লিখিত হাদিস ছাড়াও অন্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
আট. সালাতুত তাসবিহ আদায় করা যেতে পারে। সালাতুত তাসবিহের নিয়ম কোনো আলেম থেকে জেনে নিতে হবে।
