
শীতকালে
রাস্তাঘাটে-ফুটপাতে সিদ্ধ ডিমের বেচাবিক্রি বেড়ে যায়। নির্বাচনি আমেজে
সিদ্ধ ডিমের পাশাপাশি কাচা ডিমের ব্যবহার বেড়ে গেছে এ বছর। কোনো কোনো
প্রার্থীকে উদ্দেশ্য করে প্রতিপক্ষের লোকজন ডিম নিক্ষেপ করতে শুরু করে
দিয়েছে। আমাদের দেশের রাজনীতিতে অবশ্য সব সময়ই কম বেশি ডিমের ব্যবহার দেখা
যায়। বছর খানেক আগে নানা অভিযোগে প্রেপ্তার হওয়া বিগত সরকারের অনেক
মন্ত্রী-এমপিকে আদালত প্রাঙ্গনে ডিম ছুঁড়ে মারার ঘটনা নিয়ে অনেক সমালোচনা
হয়েছে। তাতে ডিমের দাম ও ডিম নিক্ষেপের ঘটনা অবশ্য কমেনি।
আওয়ামী লীগের
শাসনামলে ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরকে উদ্দেশ করে নিয়মিত ডিম মারা হতো।
ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ডিম ছিল তখন এক ধরনের ‘ভিজ্যুয়াল স্টেটমেন্ট’।
ক্যাম্পাসে বহুবার তার ওপর ডিম নিক্ষেপ করা হয়েছে এবং তখন এর ফলে তার
জনপ্রিয়তা শনৈ শনৈ বেড়েছে। ভিপি নুরও নিক্ষিপ্ত ডিমকে উপেক্ষা করে
রাজনীতিতে টিকে থাকার এক বিশেষ ডিপ্লোমা অর্জন করেছেন। রাজনীতির
পাঠ্যসূচিতে যেখানে আদর্শ, সংগঠন আর ত্যাগের কথা থাকে, সেখানে ভিপি নুর
যুক্ত করেছেন আরেকটি অধ্যায়, যার নাম দেওয়া যেতে পারে ডিম-সহিষ্ণুতা। ডিম
হজম করেই তিনি এখনও বহাল তবিয়তে আছেন-নির্বাচনের মাঠে, আলোচনায়, টকশোতে,
ফেইসবুক লাইভে।
সময় বদলায়, কিন্তু ডিমের ভাগ্য বদলায় না। রাজনীতিতে
ব্যক্তি বদলায়, স্লোগান বদলায়, জোট বদলায়-কিন্তু ডিম থেকে যায়। সম্প্রতি
ঢাকা-৮ আসনে ১১-দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর
একাধিক স্থানে ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। তিনি যেখানে যাচ্ছেন, সেখানে আগে
পৌঁছে যাচ্ছে ডিম।
রাজনীতির মাঠে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে টিকে থাকতে
হলে সম্ভবত আরও অনেক অনেক ডিমের মুখোমুখি হতে হবে। এটা পাটওয়ারী নিজেও বুঝে
গিয়েছেন বলে অনুমান করা যায়। প্রতিপক্ষ তাকে যত ডিম ছুঁড়ে মারবে, তত বেশি
ভোটও তার দিকে আসবে। এটা বোধ হয় মির্জা আব্বাসও অনুমান করতে পারছেন, যদিও
প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে
মনে হয় না। ঢাকা-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাস নেতাকর্মীদের ধৈর্য
ধরার পরামর্শ দিয়ে কোনো ধরনের উসকানিমূলক আচরণ বা কথা থেকে বিরত থাকতে
নির্দেশ দিয়েছেন। এনসিপি প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ‘হেনস্তা’র ঘটনার
প্রেক্ষাপটে তিনি এই সতর্কবার্তা দেন। প্রতিপক্ষকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন,
যাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বা জনসেবার ইতিহাস নেই, তারাই বিএনপিকে অপদস্ত
করার চেষ্টা করছে। ‘বিজয় নিশ্চিত’ উল্লেখ করে নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার
আহ্বান জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য।
ডিম এখানে আর কেবল খাবার
নয়, জব্দ করার একটা হাতিয়ার। এই বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে কিছু বাস্তবসম্মত
উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথমত, নিয়মিত ডিম-ক্যাচ প্র্যাকটিস করতে হবে। নেট
প্র্যাকটিস বাদ দিয়ে ডিম প্র্যাকটিস। প্রয়োজনে জন্টি রোডসের ভিডিও দেখে
নিতে হবে। ফিল্ডিংয়ের সঙ্গে রাজনীতির বেশ মিল আছে, দুটোতেই রিফ্লেক্স লাগে,
চোখ-হাতের সমন্বয় লাগে, আর লাগে ধৈর্য। দ্বিতীয়ত, সম্ভাব্য ডিমাক্রান্ত
ব্যক্তিরা সঙ্গে একটি স্টোভ রাখতে পারেন। ডিম ধরার পর যেন সিদ্ধ করে খাওয়া
যায়। রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে শুধু আদর্শ নয়, প্রোটিনও দরকার-এ কথা এখন আর
অস্বীকার করার উপায় নেই।
আর কে না জানে, খাদ্য হিসেবে ডিমের কোনো তুলনা
নেই। ডিম গরিবের খাবার, মধ্যবিত্তের খাবার, বড়লোকেরও খাবার। তবে
মধ্যবিত্তের খাবার হিসেবে ডিম এক নম্বর। হোস্টেল, মেস, ব্যাচেলর বাসা, ডিম
ছাড়া এক দিনও চলে না। মাসের শেষদিকে ভাত নেই, তরকারি নেই? নো চিন্তা, ডিম
আছে। ডিম দিয়ে কী হয়, এই প্রশ্নের চেয়ে ডিম দিয়ে কী হয় না, এই প্রশ্নটাই
বেশি যুক্তিযুক্ত। ডিমভাজি, ডিমচপ, ডিমের কোরমা, সেদ্ধ ডিম, ডিমের ভুনা,
অমলেট, ঝুরি, ডিম পাকোড়া-তারপর আধুনিক যুগের এগ চ্যাট, এগ সালাদ, ডিমের
মুত্তা এভিয়াল। এত রেসিপি যে ডিম নিজেই কনফিউজড-সে বুঝতে পারে না, সে খাবার
নাকি শিল্প। এ কারণেই ডিম ডিমই। পোলট্রি শিল্পের বিকাশ প্রোটিনকে
গণতান্ত্রিক করেছে। এখন বাঙালি আর শুধু মাছে-ভাতে নয়, ডিমে-ঝোলেও বেঁচে
আছে-এ যেন এক ধরনের খাদ্য-গণতন্ত্র।
ডিম নিয়ে চিরন্তন বিতর্ক আছে, ডিম
আগে, না মুরগি আগে? বহু দার্শনিক, বহু বিজ্ঞানী মাথা চুলকিয়েছেন। কিন্তু
বাঙালির উত্তর খুব সহজ, ডিম আগে। কারণ, আমাদের অনেকের সকালটাই শুরু হয় ডিম
দিয়ে। অ্যালার্ম বাজার আগেই ডিমের চিন্তা। যদিও ডিম খাওয়া নিয়ে বিভ্রান্তির
শেষ নেই। কেউ বলেন, সপ্তাহে তিনটির বেশি না। কেউ বলেন, বয়স বাড়লে কুসুম
বাদ। কেউ বলেন, দিনে দুইটা খেলেও সমস্যা নেই। পুষ্টিবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে
যাচ্ছেন, আর ডিমখেকোরা গবেষণা উপেক্ষা করে ডিম খেয়ে যাচ্ছেন;
নির্বিকারভাবে, নির্ভয়ে, বেশুমার।
আমরা সাধারণত মুরগির ডিম খাই। হাঁসের
ডিমও চলে। কোয়েলেরডিম এখন ইনস্টাগ্রাম-বান্ধব-ছোট, চকচকে, ফোটোজেনিক। অথচ
জগতে আরও অনেক প্রাণী ডিম পাড়ে-মশা, কচ্ছপ, সাপ, কুমির, তেলাপোকা, টিকটিকি,
মাকড়সা। কিন্তু সভ্যতা আমাদের বেছে নিতে শিখিয়েছে—সব ডিম খাওয়ার নয়।
সভ্যতার এই বাছাই প্রক্রিয়াও এক ধরনের রাজনীতি।
আমাদের জীবনে আরেকটি ডিম
আছে-ঘোড়ার ডিম। ব্যঙ্গার্থে ব্যবহৃত এই শব্দযুগল বাঙালির আবেগের অভিধানে
স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। জীবনযুদ্ধে পরাস্ত বাঙালির মুখে যে তিনটি বাক্য
সবচেয়ে বেশি শোনা যায়-পরিসংখ্যান করলে দেখা যাবে, এক নম্বরে ‘আল্লাহ-খোদার
নাম’, দুই নম্বরে ‘ধুর ছাই’, তিন নম্বরে ‘ঘোড়ার ডিম’। এই ‘ঘোড়ার ডিম’ দিয়েই
অনেক কথা শেষ হয়ে যায়, অনেক ক্ষোভ প্রকাশ পায়। সেদিন চলতি পথে দুজনের
কথোপোকথন শুনলাম-
: ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর দেশে কী পরিবর্তন হবে বলে মনে হচ্ছে?
: কি আর হবে, ঘোড়ার ডিম!
ছোটবেলা
থেকে অসংখ্যবার শুনলেও জানা হয়নি এই ঘোড়ার ডিমের রহস্য। ‘ঘোড়ার ডিম’ আসলে
কী? আমাদের সময়ে ‘কৌতুক ছিল বেশি, কৌতূহল কম’। এখন উল্টো। এখন মানুষ প্রশ্ন
করে। এখন হোটেলে গিয়ে ‘একটা ডিম দেন’ বললে পাল্টা প্রশ্ন আসে-হাফ বয়েল,
ফুল বয়েল, পোচ, অমলেট, ঝুরি, ভুনা না কি ঝোল?’ ডিম এখন আর সাদামাটা নয়, ডিম
এখন ব্যক্তিত্ব।
বাংলাদেশে আরেক ধরনের ডিম খুব জনপ্রিয়-অদৃশ্য ডিম।
একথা বহুল প্রচলিত যে, সরকারি অফিসে বসে বসে ডিম পাড়া হয়, ডিমে তা দেওয়া
হয়। কিন্তু এগুলো গোলাকার নয়, এগুলো ‘ঘোড়ার ডিম’। এই ডিম চোখে দেখা যায় না,
ভাঙা যায় না, খাওয়া যায় না। সুবিধা একটাই-এই ডিম কখনো পচে না। প্রকল্প শেষ
হয়, বাজেট শেষ হয়, সরকার বদলায়-কিন্তু ডিম থেকে যায়। ফাইলের ভেতরে,
ড্রয়ারের কোণে।
তোর ভাগ্যে আছে অশ্বডিম্ব, তুই একটা ভিতুর ডিম-ডিম নিয়ে
এরকম ব্যঙ্গ, বিদ্রƒপ যেমন হর-হামেশা কপালে জোটে, তেমনি রিমান্ডে পুলিশের
ডিম থেরাপি নিয়ে রসালো গল্পেরও অভাব নেই। ডিম এক্ষেত্রে শুধু খাবার নয়, এটি
গালি, এটি নির্যাতন, এটি প্রতিশোধের ভাষা।
নাসির উদ্দিন হোজ্জার গল্প
এখানে প্রাসঙ্গিক। রাজসভা থেকে তাড়ানোর পর রাজা আবার ডেকে এনে জিজ্ঞেস
করলেন, দুটো জিনিস কী, যেগুলো আমরা দেখি না, কিন্তু আছে বলে বিশ্বাস করি?
হোজ্জার উত্তর আজও সমানভাবে প্রযোজ্য-একটা রাজার মাথার মগজ, আরেকটা ঘোড়ার
ডিম। বর্তমান রাজনীতিতে এই দুই অদৃশ্য বস্তু বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে!
ডিমের
বদনামও কম নয়। পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে মা ডিম খেতে দেন না-ডিম পাবে এই
ভয়ে। অথচ পৃথিবীর সব মেধাবীরাই ডিম খেয়ে পরীক্ষা দিয়েছেন, কেউ ফেল করেননি
শুধু ডিমের কারণে। তবু কুসংস্কার বেঁচে থাকে-ডিমের মতোই।
মনে পড়ছে
ডিম-বিষয়ে খুশবন্ত সিংয়ের একটি গল্প। নিজের দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাড়ির পাশে
বসে বিলাপ করে কাঁদছিলেন এক সর্দারজি, ‘আমার মুরগিটা মারা গেল। আমার কী
হবে?’ এক পথচারী দেখে থমকে গেলেন। বললেন, ‘সে কী সর্দারজি! আপনার এত দামি
গাড়ির এই হাল হলো কী করে?’ ‘আর বলবেন না, গাড়িটা রাস্তার পাশে রেখে আমি
গিয়েছিলাম একটু দোকানে। কথা নেই বার্তা নেই, এক ট্রাক ড্রাইভার তার বেঢপ
ট্রাকটা আমার গাড়ির ওপর উঠিয়ে দিল। আর গাড়ির পেছনে থাকা আমার মুরগিটা গেল
মরে।’ বলে আবার বিলাপ করে কাঁদতে লাগলেন সর্দারজি। পথচারী ভ্রƒ কুঁচকে
বললেন, ‘এত দামি গাড়িটা একেবারে ভেঙেচুরে গেল, আর আপনি কিনা মুরগির জন্য
কাঁদছেন?’ সর্দারজি বললেন, ‘আরে বোকা, গাড়ি দিয়ে কী হবে? গাড়ি তো আর
প্রতিদিন একটা করে ডিম দেয় না!’
ডিম নিয়ে গল্প রয়েছে আমাদের গ্রাম
দেশেও। এক কৃষক অলৌকিকভাবে একদিন একটি সোনার ডিম পাড়া মুরগি পেল। সে তার
বউকে এসে মুরগিটি দিয়ে বলল, এটার দিকে বিশেষ খেয়াল রেখো, ঠিকঠাক মতো খেতে
দেবে। বিনিময়ে সে রোজ সকালে একটি সোনার ডিম পাড়বে। এভাবেই প্রতিদিন তার বউ
সকালে উঠে একটি করে সোনার ডিম সংগ্রহ করত। এভাবে দিন কাটছিল তাদের। একদিন
কৃষকের বউয়ের লোভ হলো। সে ভাবল, নিশ্চয় মুরগিটার পেট ভর্তি অনেক সোনার ডিম
আছে। তাই সে ঠিক করল, একসঙ্গে সবকটা ডিম বের করে নেবে। তাই মুরগিটা জবাই
করে পেট কাটল সে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখল, অন্য যে কোনো মুরগির মতোই এর পেটে
কোনো ডিম নেই। বোকা ও লোভী রাতারাতি বড়লোক হতে গিয়ে নিশ্চিন্তে রোজ যেটা
পাচ্ছিল সেটাও হারিয়ে বসল। যে কারণে আমরা বলি লোভের পরিণতি সর্বনাশ। তাই
লোভ কোরো না।
বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন বলেছিলেন, আজকের একটি ডিম কালকের একটি
মুরগির চেয়ে ভালো। ডিম মানুষকে শুধু পুষ্টিই দেয় না, প্রতিবাদের ভাষাও
শেখায়। খারাপ নাটক, খারাপ বক্তৃতা, খারাপ রাজনীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে সহজ
অস্ত্র-পচা ডিম। বিশুদ্ধ ডিম খাওয়ার জন্য, পচা ডিম ছোড়ার জন্য। আমাদের
রাজনীতির যে হাল, নেতার্মীদের যে মনমানসিকতা, তাতে করে এই দেশে ডিম আরও
দীর্ঘদিন সগৌরবে টিকে থাকবে বলেই আশা করা যায়। কখনো প্লেটে, কখনো নেতা বা
মঞ্চের দিকে ছোড়া অবস্থায়! এত ডিমের সরবরাহ কীভাবে হবে, এবারের
মহাগুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে বিষয়টি নিয়ে ভাবা দরকার।
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক. কলামিস্ট।
