‘তারুণ্য
ও মর্যাদার ইশতেহার’ শিরোনামে ৩৬ দফা প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসন্ন জাতীয় সংসদ
নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণা করেছে ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক
পার্টি (এনসিপি)। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর গুলশানে লেকশোর
গ্র্যান্ড হোটেলে এই ইশতেহার ঘোষণা করা হয়।
ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে
উপস্থিত ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, দলের মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয়
নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ দলটির
শীর্ষ নেতারা।
এনসিপির ৩৬ দফা ইশতেহারে যা আছে:
১. জুলাই সনদের যে
দফাগুলো আইন ও আদেশের ওপর নির্ভরশীল, তা বাস্তবায়নের সময়সীমা ও দায়বদ্ধ
কাঠামো তৈরিতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে।
২. জুলাইয়ে সংঘটিত
গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ
আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময়ে সংঘটিত সব মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক
বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং একটি ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন কমিশন গঠন করা
হবে।
৩. ধর্মবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা, সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং
জাতি-পরিচয়ের কারণে যেকোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ, নির্যাতন ও নিপীড়নকে
প্রতিহত করতে স্বাধীন তদন্তের এখতিয়ারসম্পন্ন মানবাধিকার কমিশনের একটি
বিশেষ সেল গঠন করা হবে।
৪. মন্ত্রী, এমপিসহ সব জনপ্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ
সরকারি কর্মকর্তাদের বাৎসরিক আয় ও সম্পদের হিসাব, সরকারি ব্যয় ও বরাদ্দের
বিস্তারিত ‘হিসাব দাও’ পোর্টালে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ ও হালনাগাদ করা হবে।
৫.
আমলাতন্ত্রে ল্যাটেরাল এন্ট্রি বৃদ্ধি করা হবে এবং স্বাধীন পদোন্নতি
কমিশনের মাধ্যমে সরকারি চাকরির শতভাগ পদোন্নতি হবে পার্ফরমেন্সভিত্তিক।
পে-স্কেল
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি তিন বছরে হালনাগাদ করা হবে এবং
পে-স্কেলে ইমাম-মুয়াজ্জিন-খাদেমদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা হবে।
৬. বিভিন্ন কার্ডের ঝামেলা ও জটিলতা দূর করতে এনআইডি কার্ডকেই সব সেবা প্রাপ্তির জন্য ব্যবহার করা হবে।
৭. জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১শ টাকা, বাধ্যতামূলক কর্ম-সুরক্ষা বিমা ও পেনশন নিশ্চিত করে শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
৮.
টিসিবির বিদ্যমান এক কোটি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থাকে ট্রাকে লাইনে
দাঁড়িয়ে নয়, বরং নিবন্ধিত মুদি দোকানে ব্যবহারযোগ্য করা হবে।
৯. সুনির্দিষ্ট বাড়িভাড়া কাঠামো তৈরি ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা ওয়াকফ সুকুক ভিত্তিতে সামাজিক আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হবে।
১০.
গরিব ও মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা কমিয়ে, কর ফাঁকি বন্ধ করে কর-জিডিপি ১২
শতাংশে উন্নীত করে শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করা হবে ও ক্যাশলেস অর্থনীতি
গড়ে তোলা হবে।
১১. পরিকল্পিতভাবে এলডিসি উত্তরণের জন্য আগাম এফটিএ
সিইপিএ করা হবে। রপ্তানি বৈচিত্র্য ও নতুন শিল্প গড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি,
আর্থিক খাত (ব্যাংকিং, ইন্সুরেন্স ও পুঁজিবাজারে) শৃঙ্খলা ফেরানো হবে।
ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস, কঠোর আইন, সম্পদ
বাজেয়াপ্ত ও রাজনৈতিক অধিকার প্রত্যাহার নিশ্চিত করা হবে।
১২.স্থানীয় ও
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসার রাজনৈতিক ব্যয় শূন্যে নামাতে চাঁদাবাজি
সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে, ৯৯৯-এর মতো হটলাইন চালু ও জিরো টলারেন্স নীতি
কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
১৩. মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশে নামানো হবে।
ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর অর্থনৈতিক ডেটা প্রকাশ বন্ধ করা হবে, রেগুলেটরি
প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা ও স্কুলভিত্তিক আর্থিক শিক্ষা চালু করে
জনগণের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা হবে।
১৪. ভোটাধিকারের বয়স হবে ১৬ এবং তরুণদের কণ্ঠকে প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর করতে ণড়ঁঃয ঈরারপ ঈড়ঁহপরষ গঠন করা হবে।
১৫.
আগামী পাঁচ বছরে দেশে এক কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে।
এসএমই খাতে ক্যাশফ্লোভিত্তিক ঋণ, নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ হাজার
কোটি টাকার তহবিল, নিবন্ধন খরচ হ্রাস ও প্রথম ৫ বছরের করমুক্তি নিশ্চিত করা
হবে।
১৬. সরকার-নিয়ন্ত্রিত প্লেসমেন্ট, ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বছরে ১৫ লাখ নিরাপদ ও দক্ষ প্রবাসী কর্মী গড়ে তোলা হবে।
১৭.
শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করে বিদ্যমান সব ধরনের শিক্ষার মাধ্যম ও
পদ্ধতিগুলোর একটি যৌক্তিক সমন্বয় করা হবে। শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো
বাস্তবায়ন ও ৫ বছরে ৭৫ শতাংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা
হবে।
১৮. উচ্চশিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের সংযোগ স্থাপন করতে স্নাতক
পর্যায়ে ৬ মাসের পুর্ণকালীন ইন্টার্নশিপ বা থিসিস রিসার্চ বাধ্যতামূলক করা
হবে।
১৯. প্রবাসী গবেষকদের সিনিয়রিটি ও ল্যাবের জন্য এককালীন ফান্ডিং
দিয়ে রিভার্স ব্রেন ড্রেইন করা হবে। কম্পিউটেশনাল গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব
আরোপ করার জন্য একটি ন্যাশনাল কম্পিউটার সার্ভার তৈরি করা হবে।
২০.
হৃদরোগ, ক্যানসার, ট্রমা,বন্ধ্যাত্ব ও জটিল অস্ত্রোপচারসহ জটিল ও দুরারোগ্য
রোগের চিকিৎসার জন্য দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা
জোন গড়ে তোলার মাধ্যমে বিদেশে মেডিকেল ট্যুরিজমের বিকল্প তৈরি করা হবে।
২১.
দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে সার্বজনীন জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের
জন্য জিপিএস-ট্র্যাকড জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স ও প্রি-হসপিটাল ইমার্জেন্সি
সিস্টেম গঠন করা হবে, যেখানে ইমার্জেন্সি প্যারামেডিক রেসপন্স টিম সংযুক্ত
থাকবে। সব বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে অত্যাধুনিক ইমার্জেন্সি
ডিপার্টমেন্ট গড়ে তোলা হবে। প্রতি জেলা হাসপাতালে অন্তত একটি অত্যাধুনিক
সুবিধা সম্বলিত আইসিইউ ও সিসিইউয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
২২.
প্রত্যেক নাগরিকের জন্য এনআইডিভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড এবং কার্যকর
রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলা হবে। পর্যায়ক্রমে সব নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ
ইনস্যুরেন্সের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
২৩. নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে
নিম্নকক্ষে ১শ’টি সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের
ব্যবস্থা করা হবে, যার সংখ্যা রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সাথে সাথে
হ্রাস করা হবে।
২৪. সব প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ বেতনে ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ও
এক মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করা হবে। সরকারি কর্মক্ষেত্রে ঐচ্ছিক
পিরিয়ড লিভ চালু করা হবে এবং ডে-কেয়ার সুবিধা বাধ্যতামূলক করা হবে।
২৫.
উপজেলাভিত্তিক বিকেন্দ্রীকৃত কাঠামোতে স্যানিটারি সামগ্রীসহ প্রয়োজনীয়
নারীবান্ধব স্বাস্থ্যসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এই কর্মসূচির আওতায়
উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সরকারি স্কুল ও কলেজে সরাসরি বরাদ্দ দেওয়া
হবে।
২৬. একটি ‘ডায়াস্পোরা ডিজিটাল পোর্টাল’ (ওয়ান-স্টপ সার্ভিস) গড়ে
তোলা হবে, যেখানে পাসপোর্ট, এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, কনস্যুলার সেবা, বিনিয়োগ
ইত্যাদি সবকিছু অনলাইনে করা যাবে। বিমানবন্দর ও দূতাবাসে হয়রানি ও
দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর মনিটরিং চালু করা হবে।
২৭. প্রবাসীদের
পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণের বিপরীতে বিনিয়োগ ও পেনশন সুবিধা এবং বিমানে
‘জবসরঃগরষবং’ নামে ট্রাভেল মাইলস প্রদান করা হবে।
২৮. প্রতিবন্ধী ও
পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ভোটাধিকার, দক্ষতা
উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
২৯. ঢাকা ও চট্টগ্রামে একক
কর্তৃপক্ষের আওতায় সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা করা হবে এবং মালবাহী ট্রেন
বাড়িয়ে সড়কপথে ট্রাকের চাপ কমানো হবে।
৩০. দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ,
পরিচ্ছন্ন যানবাহন ও সবুজ প্রযুক্তি নিশ্চিত করা হবে। পাঁচ বছরে বিদ্যুতের
অন্তত ২৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন ও সরকারি ক্রয়ে ৪০ শতাংশ
ইলেকট্রিক ভেহিকল চালু করা হবে।
৩১. দেশের সব শিল্পকারখানায় ইটিপি
(ইটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে এবং এর ব্যয় কমাতে কর ও আর্থিক
প্রণোদনা দেওয়া হবে। শিল্প দূষণ, নদী-খাল দখল ও পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে
কঠোর আইন প্রয়োগ করে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা হবে।
৩২.
এনআইডিভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে কৃষকের কাছে সরাসরি ক্যাশব্যাকের মাধ্যমে
সার, বীজ ও যন্ত্রে ভর্তুকি দেওয়া হবে। কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও বিক্রয় কেন্দ্র,
মাল্টিপারপাস কোল্ড স্টোরেজ ও ওয়্যারহাউজ স্থাপন করে কৃষকের কাছ থেকে
সরাসরি পণ্য ক্রয় নিশ্চিত করা হবে।
৩৩. দেশীয় বীজ গবেষণা, সংরক্ষণ ও
বিতরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করে শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নয়, খাদ্য সার্বভৌমত্ব
নিশ্চিত করা হবে। খাদ্য ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত
করা হবে।
৩৪. ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হত্যা, আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানির
ন্যায্য হিস্যা, শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে আনা, অসম
চুক্তিসহ সব বিদ্যমান ইস্যুতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সর্বোচ্চ পর্যায়ে দৃঢ়
ভূমিকা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আদালতে যাওয়া হবে।
৩৫.
দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট মানবিক সমাধান
ও আসিয়ানে যুক্ত হয়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন
করা হবে।
৩৬. সশস্ত্র বাহিনীর জন্য রেগুলার ফোর্সের দ্বিগুণ আকারের
রিজার্ভ ফোর্স তৈরি করা হবে। পাঁচ বছরে সেনাবাহিনীতে একটি ইউএভি ব্রিগেড
গঠন ও মাঝারি পাল্লার অন্তত আটটি সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যাটারি অধিগ্রহণ
করা হবে।
