ভেনেজুয়েলায়
মার্কিন সামরিক বাহিনীর হামলা ও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের ঘটনায়
নিন্দা জানিয়েছে রশিয়া-ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ।
শনিবার ভোরে দক্ষিণ
আমেরিকার দেশটিতে আক্রমণ চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড
ট্রাম্প সেই খবর দিয়ে মাদুরোকে স্ত্রীসহ আটক করে ‘ভেনেজুয়েলার বাইরে’ নিয়ে
যাওয়ারও কথা বলেছেন।
আক্রমণের পর এক্সে এক বিবৃতিতে মার্কিন
উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ বলেন, ভেনেজুয়েলা এক ‘নতুন ভোর’
দেখেছে। স্বৈরশাসকের বিদায় হয়েছে। এখন সে তার অপরাধের জন্য বিচারের
মুখোমুখি হবে।”
আল জাজিরা লিখেছে, হামলার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায়
মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর সামরিক আগ্রাসনের অভিযোগ
তোলেন। হামলার এ ঘটনাকে ভেনেজুয়েলার ‘সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে’
বিভিন্ন দেশ।
রাশিয়ার উদ্বেগ
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাশিয়া। সশস্ত্র আগ্রাসনের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিবৃতিতে
মন্ত্রণালয় বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হল সংঘাত বাড়াতে না
দেওয়া। সংলাপের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে হবে।
“বাইরের কোনো ধ্বংসাত্মক, বিশেষ করে সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ বা ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।”
রুশ
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “ভেনেজুয়েলার জনগণের সঙ্গে
পুনরায় সংহতি জ্ঞাপন করছি এবং জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশটির
নেতৃত্বের নীতির প্রতি সমর্থন জানাচ্ছি।”
স্ত্রীসহ প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আটকের ঘটনায়ও অত্যন্ত উদ্বেগ জানিয়েছে রাশিয়া।
রুশ সরকার বলছে, “যদি এমন ঘটনা ঘটে, তবে সেটি হবে স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন, যা অগ্রহণযোগ্য।”
অবশ্যই শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে: ইরান
ভেনেজুয়েলার ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে ইরান সরকার।
দেশটির
সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এক্সে লিখেছেন, “সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, যখন কেউ বুঝতে পারে ভুয়া দাবির মাধ্যমে কোনো শত্রু
কোনো সরকার বা জাতির ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে চায়, তখন তাদের অবশ্যই সেই
শত্রুর বিরুদ্ধে কঠোরভাবে দাঁড়াতে হবে।”
তিনি বলেন, “আমরা তাদের কাছে মাথা নত করব না। আল্লাহর ওপর ভরসা ও জনগণের সমর্থনের ওপর আত্মবিশ্বাস রেখে আমরা শত্রুকে পদাবনত করব।”
আলাদা একটি বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়েছে।
“ভেনেজুয়েলায় আমেরিকান বাহিনীর এই হামলা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার স্পষ্ট লঙ্ঘনের ঘটনায় কঠোর নিন্দা জানাচ্ছে ইরান।”
পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে: ইইউ
মার্কিন
সামরিক হামলার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক উচ্চ
প্রতিনিধি কায়া কালাস বলেন, তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও
এবং ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা
বলেছেন।
এক্সে এক পোস্টে কায়া কালাস বলেন, ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন তারা।
“ইইউ
বারবার বলেছে, মাদুরোর বৈধতার অভাব রয়েছে এবং আমরা একটি শান্তিপূর্ণ
পরিবর্তনের পক্ষ সমর্থন করেছি। তবে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের
মূলনীতি অবশ্যই যেকোনো পরিস্থিতিতে মেনে চলতে হবে। সবাইকে ধৈর্য্য দেখানোর
আহ্বান জানাই। বর্তমানে ভেনেজুয়েলায় অবস্থানরত ইইউ নাগরিকদের নিরাপত্তা
আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।”
সংঘাত না বাড়ানোর আহ্বান স্পেনের
ভেনেজুয়েলায় হামলার ঘটনার পর সংঘাত না বাড়াতে আহ্বান জানিয়েছে স্পেন।
দেশটির
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সহিষ্ণুত ও
সম্মান দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। সেইসঙ্গে সমস্যা সমাধানে মধ্যস্থতা করারও
প্রস্তাব দিয়েছে স্পেন সরকার।
‘পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে’ জার্মানি
ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছে জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এএফপি নিউজ এজেন্সিকে এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, গুরুতর উদ্বেগের সঙ্গে সবশেষ পরিস্থিতি তারা খুব কাছ থেকে দেখছে।
ইতালি
ইতালির
প্রধঅনমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে
পর্যবেক্ষণের কথা বলেছেন। দেশটিতে ইতালির জনগণের ব্যাপারে খোঁজ রাখছেন।
তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলায় তাদের বর্তমানে ১ লাখ ৬০ হাজার নাগরিক রয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই দ্বৈত নাগরিক।
ভেনেজুয়েলা ও লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর আগ্রাসন: কলাম্বিয়া
মার্কিন হামলাকে ভেনেজুয়েলা ও লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর আগ্রাসন হিসেবে দেখছে প্রতিবেশী কলাম্বিয়া।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এক বিবৃতিতে বলেন, “পুরো বিশ্বকে সতর্ক করছি তারা ভেনেজুয়েলাকে আক্রমণ করেছে।
“অবশ্যই
যেকোনো সশস্ত্র সংঘাতের ঊর্ধ্বে উঠে শান্তি, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি
শ্রদ্ধা এবং জীবন ও মানবিক মর্যাদার সুরক্ষা প্রাধান্য পেতে হবে।”
তিনি বলেন, “ভেনেজুয়েলা ও লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে এই আগ্রাসন প্রত্যাখ্যান করছে কলম্বিয়া।”
হামলার পর সীমান্তে সামরিক বাহিনী মোতায়েনর কথাও জানিয়েছেন পেত্রো।
এই সন্ত্রাসবাদ কেবল ভেনেজুয়েলার জনগণের বিরুদ্ধে নয়: কিউবা
ভেনেজুয়েলার ওপর হামলায় কড়া ভাষায় নিন্দা জানিয়েছে কিউবা।
দেশটির
প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল ডিয়াজ-ক্যানেল এই আগ্রাসনকে ‘ক্রিমিনাল অ্যাটাক’ বলে
বর্ণনা করেছেন। এর বিরুদ্ধে জরুরি আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন
তিনি।
এক্সে এক পোস্টে তিনি বলেন, “কিউবার তথাকথিত ‘শান্তি অঞ্চল নিষ্ঠুরভাবে আক্রান্ত’।”
যুক্তরাষ্ট্রের
আক্রমণকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ বর্ণনা করে তিনি বলেন, “এই সন্ত্রাসবাদ
কেবল ভেনেজুয়েলার জনগণের বিরুদ্ধেই নয়, বরং সামগ্রিকভাবে ‘আমাদের আমেরিকা’
বিরুদ্ধে পরিচালিত।”
মিগেল দিয়াস-কানেল বলেন, “মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু, আমরা বিজয়ী হবই।”
এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি প্রতিক্রিয়া দাবি করে তিনি এই হামলাকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ বলে মন্তব্য করেন।
ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো
ভেনেজুয়েলার খুব কাছের প্রতিবেশী ত্রিনিদাদ ও টোবাগো এই পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
দেশটির
প্রধানমন্ত্রী কামলা প্রসাদ-বিসেস বলেছেন, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো চলমান এই
সামরিক অভিযানের কোনো অংশীদার নয়। ত্রিনিদাদ ও টোবাগো ভেনেজুয়েলার জনগণের
সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।
