
ডেঙ্গু
জ্বর বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বিস্তার লাভকারী মশাবাহিত রোগগুলোর
একটি। বিশেষ করে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে, যেমন
বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ডেঙ্গু জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি
বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর বর্ষাকাল ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে
ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পায় এবং হাজার হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়।
ডেঙ্গু শুধু একটি সাধারণ জ্বর নয়; এটি কখনো কখনো ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা
ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো প্রাণঘাতী অবস্থায় রূপ নিতে পারে। ডেঙ্গুর
ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এর নির্দিষ্ট কোনো কার্যকরী
অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা এখনো নেই। চিকিৎসা মূলত উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত
পানি ও তরল গ্রহণ, বিশ্রাম এবং জটিলতা প্রতিরোধের ওপর নির্ভরশীল। তাই
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—“নিরাময়ের চেয়ে প্রতিরোধই
কার্যকরী।” কারণ রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা করে জীবন রক্ষা করা সম্ভব হলেও,
রোগের কষ্ট, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং প্রাণহানির ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে এড়ানো যায়
না। কিন্তু সঠিক সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ডেঙ্গু
সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
ডেঙ্গু জ্বর: ডেঙ্গু হলো একটি
ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত এডিস (অবফবং) মশার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়ায়।
ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রধান ধরন বা সেরোটাইপ রয়েছে-উঊঘঠ-১, উঊঘঠ-২,
উঊঘঠ-৩ এবং উঊঘঠ-৪। একবার কোনো ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট ধরনের ডেঙ্গু
ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সাধারণত সেই ধরনের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ
ক্ষমতা তৈরি হয়, তবে অন্য ধরনের ভাইরাস দ্বারা পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার
সম্ভাবনা থাকে। এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় কামড়ায়, বিশেষ করে সকাল ও
বিকেলের সময়। এই মশা পরিষ্কার ও জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। বাড়ির
আশপাশে জমে থাকা পানি, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, গাড়ির টায়ার, ছাদ বা
বারান্দায় জমে থাকা পানি-এসব এডিস মশার প্রজননের উপযুক্ত স্থান।
লক্ষণ ও
জটিলতা:ডেঙ্গুর লক্ষণ সাধারণত মশার কামড়ের ৪-১০ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায়।
সাধারণ লক্ষণগুলো হলো- হঠাৎ উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে
ব্যথা, শরীর ও মাংসপেশিতে ব্যথা, অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব, ত্বকে
লালচে দাগ, দুর্বলতা ও ক্লান্তি। অনেক ক্ষেত্রে রোগী কয়েক দিনের মধ্যে
সুস্থ হয়ে যায়। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিতে পারে:
পেটের তীব্র ব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা,
রক্তচাপ কমে যাওয়া এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
জরুরি।
ডেঙ্গু কেন এত ভয়াবহ হয়ে উঠছে?
ডেঙ্গুর বিস্তারের পেছনে বিভিন্ন সামাজিক, পরিবেশগত ও জীবনযাত্রার কারণ রয়েছে। যেমন-
*
অপরিকল্পিত নগরায়ন: দ্রুত নগরায়নের ফলে অনেক স্থানে পানি নিষ্কাশন
ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত জমি ও অপরিচ্ছন্ন
পরিবেশ মশার প্রজনন বাড়ায়।
* জলবায়ু পরিবর্তন: তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তনের কারণে এডিস মশার বংশবিস্তার ও বিস্তারের সুযোগ বেড়েছে।
*
মানুষের অসচেতনতা: অনেক মানুষ এখনো মনে করেন ডেঙ্গু শুধু বর্ষাকালীন
সমস্যা। কিন্তু বাস্তবে সারা বছরই ডেঙ্গুর ঝুঁকি থাকতে পারে, যদি মশার
প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ করা না হয়।
* অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: প্লাস্টিক বোতল, ক্যান, পলিথিন ও অন্যান্য আবর্জনায় পানি জমে সহজেই মশার জন্ম হয়।
চিকিৎসার
সীমাবদ্ধতা: ডেঙ্গুর জন্য নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই যা সরাসরি ভাইরাস ধ্বংস
করতে পারে। অনেক সময় মানুষ ভুল ধারণার কারণে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ করে,
বিশেষ করে ব্যথানাশক ওষুধ, যা রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই চিকিৎসকের
পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়। যেহেতু রোগের পর চিকিৎসা সীমিত, তাই
রোগ প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
প্রতিরোধের উপায়: ডেঙ্গু প্রতিরোধের
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো এডিস মশার প্রজনন বন্ধ করা । এক্ষেত্রে করণীয়
হলো বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা, ফুলের টব, পানির পাত্র
নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, পরিত্যক্ত বোতল, টায়ার ও পাত্র সরিয়ে ফেলা, ছাদ বা
বারান্দায় পানি জমতে না দেওয়া, ড্রেন ও নালা পরিষ্কার রাখা। একটি ছোট পানির
পাত্রও হাজার হাজার মশার জন্ম দিতে পারে। তাই প্রতিটি পরিবারকে নিজের ঘর ও
আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা ও মশার কামড় থেকে
নিজেকে রক্ষা করাও ডেঙ্গু প্রতিরোধের অন্যতম উপায়। এক্ষেত্রে করণীয় হলো
মশারি ব্যবহার করা, মশা প্রতিরোধক ক্রিম বা স্প্রে ব্যবহার করা, ফুলহাতা
জামা ও লম্বা পোশাক পরা, দরজা-জানালায় নেট ব্যবহার করা, বিশেষ করে শিশু,
বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। সামাজিক
সচেতনতা বৃদ্ধিও ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজন। ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু একজন
ব্যক্তির কাজ নয়; এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। একটি বাড়ি পরিষ্কার রাখলেও
পাশের বাড়িতে মশার প্রজনন হলে ঝুঁকি থেকে যায়। তাই, স্কুল-কলেজে
সচেতনতামূলক কার্যক্রম, সামাজিক প্রচারণা, গণমাধ্যমে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও
স্থানীয় পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা অতীব প্রয়োজন। ডেঙ্গু
প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা প্রথম স্তর। প্রতিদিন মাত্র কয়েক মিনিট সময় দিয়ে
পরিবারের সদস্যরা অনেক বড় ঝুঁকি কমাতে পারেন। প্রতি সপ্তাহে বাড়ির চারপাশ
পরীক্ষা করা, কোথাও পানি জমেছে কিনা দেখা, পানির পাত্র পরিষ্কার করা। এসব
অভ্যাস ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর।
প্রতিরোধ কেন বেশি কার্যকর:
প্রতিরোধের মাধ্যমে রোগ হওয়ার আগেই ঝুঁকি কমানো যায়, চিকিৎসার খরচ কমে,
হাসপাতালে ভিড় কমে, মৃত্যুহার কমে ও সমাজে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায়।
একজন আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা করার চেয়ে হাজার মানুষের সংক্রমণ প্রতিরোধ
করা অনেক বেশি কার্যকর।
লেখক: সহকারী রেজিস্ট্রার, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল,ঢাকা
