জুলাই নিয়ে কিছু কথা
পর্ব-১
আমি ফারহা এমদাদ। জন্ম কুমিল্লা মোগলটুলির ফারুকী হাউজে, আমার নানার বাড়িতে। আমার নানারা মোগলটুলির স্থায়ী বাসিন্দা। নবাব ফারুকীর বংশধর। আমি এই বংশের ৫ম প্রজন্ম। ছোট থেকেই এই শহরে থাকা ও বেড়ে ওঠা। স্কুল-কলেজও এই শহরেই। কখনো কোনো প্রকার সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি, রাজনৈতিকভাবেও আলহামদুলিল্লাহ।
আওয়ামী লীগ দ্বারা আমার বা আমার পরিবারের কখনো কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে কেন আমি ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নিজেকে যুক্ত করেছিলাম? কারণ, ২০১৫ সালে আমি আমার আপন ছোট ভাই কাজী ইনজামামুল হক সামিকে হারিয়েছি। মাত্র ২১ বছর বয়সে আমার ভাই একটি রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। আল্লাহ আমার ভাইকে জান্নাত নসিব করুন। তারপর থেকে আমি এই বয়সী কারো মৃত্যু দেখতে পারি না।
যখন ২০২৪ সালে আমি দেখতে পেলাম, এই বয়সী অনেক ছাত্র মারা যাচ্ছে, তখন আমি চুপ করে থাকতে পারিনি। আমি প্রতিবাদ করেছি। নিজের জায়গা থেকে যতটুকু পেরেছি, প্রতিবাদ করেছি। আমি এবং আমার মতো অনেকে সম্পূর্ণ আবেগ থেকে নিজেদের যুক্ত করেছিলাম। আমার কোনো স্বার্থ ছিল না। আমি সরকারি চাকরি করব না, করার ইচ্ছেও কখনো ছিল না। আমার কেউ আওয়ামী লীগের হাতে হেনস্তা বা ক্ষতিগ্রস্তও হয়নি। সত্যি বলতে, আমাদের পরিবার সাধারণ জীবনযাপন করে। আমরা কখনো কোনো ঝামেলায় যুক্ত হইনি।
আওয়ামী লীগ তো আমার কোনো ক্ষতি করেনি। কিন্তু তারপরও কেন তাদের বিরুদ্ধে আমি কথা বলেছি, আন্দোলন করেছি? পরিবারের অনেকে আওয়ামী লীগ করত। তারা সবাই আমাকে অনেক বুঝাত। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে তারা ভুল ছিল। আমি অন্যায়ের পক্ষে থাকতে পারিনি। যা ন্যায়, তার পক্ষেই নিজেকে যুক্ত করেছি। ক্ষমতার জন্য মানুষ এত হিংস্র হতে পারে না। যা অন্যায়, তা অন্যায়—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই আন্দোলনে অনেক আওয়ামী পরিবারের মানুষও যুক্ত ছিল, এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই। সবার সমন্বয়ে এই আন্দোলন সফল হয়েছে।
আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার কারণে জীবনে প্রথমবার আমি রাজনৈতিকভাবে হয়রানির শিকার হই। আমাকে কল দিয়ে বলা হয়, আমার নামে মামলা হচ্ছে। আমি ১১ নম্বর আসামি। আমাকে জামায়াতের নেত্রী বলা হয়। অথচ আমি শুধু আন্দোলন করেছি। আমার পরিবারের কেউ এগুলোর সঙ্গে ছিল না। আমার হাসবেন্ড তো এটা পছন্দই করত না এবং অনেক কিছু জানতও না। কিন্তু আওয়ামী লীগের কিছু মানুষ ওর দোকানে গিয়ে তালা দিয়ে দেয়। বলে, আর খোলা যাবে না। তারপর আরও অনেক কিছু ঘটে। আমরা কঠিন সময় পার করি।
তারপর এলো ৫ আগস্ট। আন্দোলন সফল হলো। ভেবেছিলাম, সবার সমন্বয়ে একটা নতুন যাত্রা শুরু হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ৫ আগস্টের পর এক বিশেষ গোষ্ঠী নিজেদের এই আন্দোলনের প্রধান বলে দাবি করে জুলাইয়ের সঙ্গে বেইমানি শুরু করে। জুলাইকে হাইজ্যাক করে। যারা ৫ আগস্টের আগে বলত, "আমরা আন্দোলন করছি", তারা বলতে শুরু করল, "আমি আন্দোলন করেছি"। শুরু হলো "আমরা" থেকে "আমি"-র খেলা। নিজের কৃতিত্ব নেওয়ার খেলা। বিভাজন শুরু হলো।
তারপর হুট করে মামলা-বাণিজ্য শুরু হলো। আমার এলাকার আমার এক বোন, যে নিজে আওয়ামী পরিবারের হয়েও আমার সঙ্গে আন্দোলনে যুক্ত ছিল, তার বাবাও ওই সময় আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন। তার বাবার নামেও মামলা হয়। (উনি এক সময় আওয়ামী লীগ করতেন, কিন্তু অনেক আগেই শারীরিক অসুস্থতার কারণে রাজনীতি থেকে সরে যান।) সে একটি পোস্ট করে। পোস্টটি দুই মিনিটের মধ্যেই আমার চোখে পড়ে। তারপর আমি তার সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করি।
এরপর একে একে শুরু হতে থাকে এক সময় রাজনীতি করা মানুষের নামে হয়রানিমূলক মামলা। সত্যি বলতে, এগুলো আগে বুঝিনি, কারণ এসবের সঙ্গে কখনো যুক্ত হইনি।
তারপর কিছু মানুষের আসল রূপ দেখলাম। টাকার প্রতি লোভ দেখলাম। আমি কিছু পরিচিত মানুষের নামে করা মামলা থেকে তাদের মুক্ত করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু কিছু ধান্দাবাজ, যারা এসেছিল শুধু ধান্দাবাজি করতে, তারা বলত—৫ লাখ দিতে হবে, ১০ লাখ দিতে হবে। অর্থাৎ বাটপারি শুরু হলো, আর জুলাই ধ্বংসের শুরু হলো।
-ফারহা এমদাদের ফেসবুক পোস্ট থেক নেওয়া