আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে
লোহিত সাগরের উত্তাল তরঙ্গে ডুবে মৃত্যুর সময় প্রতাপশালী ফেরাউন যখন বুঝতে
পেরেছিল তার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে, তখন সে বাঁচতে চেয়েছিল। আল্লাহর কাছে
ক্ষমা চেয়েছিল। কিন্তু আজাব চলে আসার পর সেই তওবা আর কবুল হয়নি। অহংকারী এই
শাসকের করুণ পরিণতি ঘটেছিল পবিত্র আশুরার দিনে। তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো,
সাগরে ডুবে মরলেও তার লাশ পচে যায়নি, সাগরের তিমি বা মাছেরা তা স্পর্শও
করেনি। কেন জানেন?
কারণ, মহাবিশ্বের স্রষ্টা স্বয়ং ঘোষণা করেছিলেন, আজ
আমি তোমার দেহ রক্ষা করব, যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হয়ে
থাকো। (সুরা ইউনুস, ৯২)। আল্লাহর সেই বাণী আজ বিজ্ঞানের যুগে এসেও এক
জীবন্ত সত্য হিসেবে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়,
১৮৯৮ সালে মিসরের রাজাদের উপত্যকা (কিংস ভ্যালি) থেকে বিজ্ঞানী লোরেট
ফেরাউনের মমি করা লাশটি উদ্ধার করেন। এরপর ১৯০৭ সালে প্রখ্যাত গবেষক স্যার
গ্রাফটিন এলিট স্মিথ যখন এই মমির ওপর থেকে প্রাচীন পট্টিগুলো অপসারণ করেন,
তখন একটি বিস্ময়কর জিনিস দেখতে পান। লাশটির ওপর লবণের একটি স্পষ্ট স্তর
জমাট বেঁধে ছিল! এটি প্রমাণ করে, এই ব্যক্তিটি কোনো সাধারণ বিছানায় মারা
যায়নি, বরং লবণাক্ত সাগরের পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়েছিল।
হজরত মূসা
(আ.)-এর যুগে মিসরের সম্রাট বা ‘ফেরাউন’ ছিল দ্বিতীয় রামাসিস অথবা তার
পুত্র মারনেপতাহ। নিজেকে ঈশ্বর দাবি করা এই অহংকারী রাজা মরেও আজ
বিশ্ববাসীর কাছে এক শিক্ষণীয় ট্র্যাজেডির নাম। বর্তমানে কায়রো জাদুঘরে একটি
সাধারণ কাচের বাক্সে তাঁর লাশ রাখা আছে, যা আজ ৩ হাজার বছর ধরে মানুষকে
মনে করিয়ে দিচ্ছে—অহংকারের শেষ পরিণতি কতটা ভয়ানক।
ফেরাউনের এই পতন
আমাদের আরও একটি বড় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সুরা যিলযালে আল্লাহ
বলেছেন, মানুষ দুনিয়াতে অণু পরিমাণ ভালো বা মন্দ কাজ করলে, পরকালে তা দেখতে
পাবে। আমাদের প্রতিটি মুহূর্তের কথা ও কাজ গোপনে বা প্রকাশ্যে কমপক্ষে
পাঁচটি জায়গায় রেকর্ড হচ্ছে—স্বয়ং আল্লাহর কাছে, আসমানে, জমিনে এবং আমাদের
কাঁধে থাকা ফেরেশতাদের আমলনামায়। ফেরাউন ভেবেছিল তার ক্ষমতার দাপটে সে পার
পেয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহর হাত থেকে সে রেহাই পায়নি।
সিনাই উপদ্বীপের যে
সাগরতীরে ফেরাউনের লাশ ভেসে উঠেছিল, আজ মানুষ তাকে ‘জাবালে ফেরাউন’ বা
ফেরাউন পর্বত নামে চেনে। এই নিদর্শনগুলো আমাদের জন্য নিছক কোনো গল্প নয়।
যান্ত্রিক জীবনের মোহে পড়ে আমরা যেন আমাদের রবের কথা ভুলে না যাই। শয়তানের
প্রলোভনে কোনো ভুল বা পাপ হয়ে গেলে, ফেরাউনের মতো শেষ মুহূর্তের জন্য
অপেক্ষা না করে, এখনই আমাদের তওবা করা উচিত। পবিত্র আশুরার এই দিনে আসুন
আমরা অহংকার মুক্ত জীবন গড়ার এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত
করি।
