আপনার
সামনে যদি বিশাল এক সমুদ্র গর্জে ওঠে, আর পেছনে তাড়া করে আসে এক জাহাবাজ
রাজার সশস্ত্র বিশাল সেনাবাহিনী-কেমন হবে সেই মুহূর্তটি? নিশ্চিত মৃত্যু
যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, ঠিক তখন যদি সমুদ্রের পানি মাঝখান থেকে ফেটে গিয়ে
১২টি বিশাল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে যায় আর তৈরি হয় শুকনো রাস্তা! রূপকথা নয়,
আজ থেকে হাজার বছর আগে পবিত্র আশুরার দিনে পৃথিবীর বুকে এমনই এক অবিশ্বাস্য
অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল। মহাবিশ্বের পরম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালা পবিত্র
কোরআনে সেই রোমাঞ্চকর ও হৃদয়স্পর্শী মুক্তির গল্পটি যেভাবে বর্ণনা করেছেন,
তা প্রতিটি বিশ্বাসী হৃদয়ে আশার আলো জাগায়।
এক জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী
ছিল-বনি ইসরাঈল বংশে জন্ম নেওয়া এক শিশু ধ্বংস করবে প্রতাপশালী ফেরাউনের
রাজত্ব। এই ভয়ে ফেরাউন বনি ইসরাঈলের সব নবজাতক পুত্রসন্তানকে নির্মমভাবে
জবাই করা শুরু করে। পবিত্র কোরআনের সরা বাকারার ৪৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ
বলেন, আর (স্মরণ করো) সে সময়ের কথা, যখন আমি তোমাদেরকে মুক্তি দান করেছি
ফেরাউনের লোকদের কবল থেকে, যারা তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দান করত; তোমাদের
পুত্রসন্তানদের জবাই করত এবং তোমাদের স্ত্রীদের অব্যাহতি দিত।
আল্লাহর
নির্দেশে এক রাতে হযরত মুসা (আ.) তার অনুসারীদের নিয়ে মকসুদের উদ্দেশ্যে
রওনা হলেন। কিন্তু ভোরেই ফেরাউন তার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে তাদের প্রায় ধরে
ফেলল। সামনে উত্তাল সমুদ্র, পেছনে ঘাতক বাহিনী। বনি ইসরাঈল যখন ভয়ে
কাঁপছিল, ঠিক তখনই আল্লাহর নির্দেশ এলো: আপনার লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত
করুন। (সুরা আশ-শোয়ারা, ৬৩)। লাঠির আঘাতে সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল।
মাঝখানের পানি বিশাল পর্বতের মতো দাঁড়িয়ে গেল আর তৈরি হলো শুকনো পথ।
হযরত
মুসা (আ.) তার দলবল নিয়ে নিরাপদে পার হয়ে গেলেন। কিন্তু অহংকারী ফেরাউন
যখন তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে সেই পথে পা রাখল, অমনি আল্লাহর হুকুমে সমুদ্রের
পানি চারপাশ থেকে ভেঙে পড়ল। চোখের পলকে তলিয়ে গেল ফেরাউন ও তার অহংকারী
সাম্রাজ্য। আল্লাহ বলেন, আর যখন আমি তোমাদের জন্য সাগরকে দ্বিখণ্ডিত করেছি,
অতঃপর তোমাদেরকে বাঁচিয়ে দিয়েছি এবং ডুবিয়ে দিয়েছি ফেরাউনের লোকদেরকে, অথচ
তোমরা দেখছিলে। (সুরা বাকারা, ৫০)।
আশুরার এই চিরন্তন ইতিহাস আমাদের
কেবল একটি গল্প শোনায় না, এটি আমাদের জীবনের এক পরম সত্যকে মনে করিয়ে দেয়।
সত্য ও ন্যায়ের পথ যতই কঠিন হোক, তার জয় নিশ্চিত। আর অন্যায়-অত্যাচারের
রাজত্ব যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আল্লাহর একটি মাত্র ইশারায় তা তাসের ঘরের
মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য।
আজকের পৃথিবীতে যারা হতাশা আর অন্যায়ের অন্ধকারে
ডুবে আছেন, আশুরার এই দিনটি তাদের শেখায়-সব পথ বন্ধ হয়ে গেলেও আল্লাহর
সাহায্যের পথ কখনো বন্ধ হয় না। আসুন, কান্নাকাটি আর শোকের সাগরে না ভেসে,
আমরা মুসা (আ.)-এর মতো আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা রাখি এবং সত্যের পথে
নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করি।
লেখক: আলেম
