
ইতিহাস
ও ঐতিহ্য রক্ষায় সাধারণ মানুষের সচেতনতা আবারও প্রমাণ করলো জনতার শক্তিই
সবচেয়ে বড় শক্তি। অবশেষে সোমবার (১৫ জুন) জুন দিবাগত রাতে অবমুক্ত হলো
উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম নারী নবাব ফয়েজুন্নেছা চৌধুরানীর ঐতিহাসিক বাড়ির
প্রবেশপথ। এটি শুধু একটি পথ উন্মুক্ত হওয়ার ঘটনাই নয়, বরং আমাদের ইতিহাস ও
ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রতি জনসচেতনতারও প্রতিফলন।
প্রবেশদ্বারটি উন্মুক্ত
করায় এলাকার সচেতন নাগরিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়েছেন নবাব
ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর প্রৌপুত্র ও নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী ওয়াকফ এস্টেটের
মোতোওয়াল্লী সৈয়দ মাসুদুল হক।
নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর আরেক বংশধর
মো. ফজলে রহমান চৌধুরী আয়াজ বলেন, প্রবেশদ্বারটি আরো অনেক আগেই উম্মুক্ত
হওয়া দরকার ছিল। বিষয়টি নিয়ে আমারও অস্বস্তিতে ছিলাম। কারণ নবাব ফয়জুন্নেছা
চৌধুরানী আমাদের গর্ব। এই বাড়িটিতে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য মিশে আছে।
প্রবেশদ্বারটি উন্মুক্ত করায় সচেতন নাগরিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
খোঁজ
নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ৩০ অক্টোবর রাতের আঁধারে ছৈয়দ আলী নামে এক
ভুমিদস্যু কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার পশ্চিমগাঁওয়ে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘরের
শাখা "নবাব ফয়জুন্নেছা জমিদার বাড়ি জাদুঘরের গেজেটভুক্ত প্রত্নতত্ত্বের
ঐতিহাসিক প্রবেশপথটি বেআইনিভাবে ইটের দেয়াল তুলে বন্ধ করে দেন।
এই ঘটনায়
ওয়াকফ এস্টেট প্রশাসন কর্তৃপক্ষ জানান, এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনায় তাঁরা
হতভম্ব। আইনগতভাবে চলাচলের পথ কেউ বন্ধ করতে পারেন না। তাঁরা নবাব
ফয়জুন্নেছা জমিদার বাড়ি জাদুঘরের বন্ধ থাকা প্রবেশপথ খুলে দেওয়ার জন্য
কুমিল্লা জেলা প্রশাসককে সুপারিশ করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,
ভূমিদস্যু সৈয়দ আলী নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর বাড়ির প্রবেশদ্বার এবং
সামনের জায়গার মালিকানা দাবি করে গত ২০২৪ সালের ৩ মার্চ কুমিল্লার আদালতে
একটি মামলা দায়ের করেন। যেটি এখনও বিচারধীন। কিন্তু মামলা চলাকালীন
অবস্থায়ই সৈয়দ আলী একই বছরের ৩০ অক্টোবর অবৈধভাবে প্রবেশদ্বারে ইটের দেয়াল
তুলে ওই প্রবেশদ্বারটি বন্ধ করে দেন। এ ছাড়াও এই সম্পর্কিত ছৈয়দ আলীর
দায়েরকৃত অপর একটি ইনজেকশন মামলা ইতোমধ্যে বিজ্ঞ আদালত খারিজ করে দিয়েছেন।
খোঁজ
নিয়ে আরো জানা গেছে, ছৈয়দ আলীর দলিলের চৌহদ্দী নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর
বাড়ির উত্তর প্রান্তে। কিন্তু তিনি মালিকানা দাবী করেন দক্ষিণ প্রান্তে। এ
ছাড়াও সৈয়দ আলীর দলিল দাতা সৈয়দ রফিকুল হক জায়গার মালিকানা ছিল ১শতক ৯
সেন্ট। কিন্তু ছৈয়দ আলী বেআইনী ও জালিয়াতির মাধ্যমে দলিলে ৫ শতক উল্লেখ
করেছেন।
এদিকে বিচারাধীন মামলায় আদালতের রায়ের অপেক্ষা না করেই তিনি
নিজের হাতে আইন তুলে নেন। বেআইনীভাবে ফয়জুন্নেছা জমিদার বাড়ি জাদুঘরের
প্রবেশদ্বারে অবৈধভাবে দেয়াল তুলে দেন। এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা করায় এলাকার
সচেতনমহল ও বিক্ষুব্ধ নাগরিকগণ তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ফলশ্রুতিতে সোমবার (১৫ জুন) দিবাগত রাতে নবাব ফয়জুন্নেছা জমিদার বাড়ি
জাদুঘরের প্রবেশদ্বারে অবৈধভাবে নির্মিত ইটের দেয়ালটি গুঁড়িয়ে দিয়ে ক্ষোভের
বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।
লাকসাম পৌরসভা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ছৈয়দ
আলী কর্তৃক বেআইনীভাবে বন্ধ করা নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর বাড়ির
প্রবেশপথটি খুলে দিতে পৌরসভার কর্তৃপক্ষ আইনগত দিক যাচাই-বাচাই সাপেক্ষে
উক্ত ছৈয়দ আলীকে চুড়ান্ত নোটিশ দিলেও তিনি কোনো তোয়াক্কা করেননি ।
লাকসাম
পৌরসভা কর্তৃপক্ষ আরো জানায়, পৌরসভা এলাকায় যে কোনো ধরনের নির্মাণ কাজে
পৌরসভা কর্তৃপক্ষের পূর্ব অনুমোদন নেওয়া অত্যাবশ্যক। কিন্তু এই ক্ষেত্রে
পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমোদন ছাড়াই জনৈক সৈয়দ আলী নবাব ফয়জুন্নেছা
জমিদার বাড়ি জাদুঘরের প্রবেশদ্বারে ইটের দেয়াল তুলেছেন। যা স্হানীয় সরকার
বিধিমালা লংঘন।
কুমিল্লা জেল জজ আদালতের একজন বিজ্ঞ আইনজীবী ফরিদ আহমেদ
মজুমদার বলেন, কোনো চলাচলের পথ কেউ বন্ধ করতে পারেনা। যদি তিনি ওই জায়গার
মালিকও হন তাহলেও চলাচলের পথ বন্ধ করা সম্পূর্ণভাবে বেআইনী।
এই ব্যাপারে
লাকসাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নার্গিস সুলতানা জানান, বিক্ষুব্ধ
লোকজন নবাব ফয়জুন্নেছা জমিদার বাড়ি জাদুঘরের প্রবেশপথে অবৈধভাবে নির্মিত
ইটের দেয়ালটি ভেঙ্গে প্রবেশপথটি উন্মুক্ত করেছে বলে শুনেছি। বিষয়টি খোঁজ
নিয়ে দেখবো।
