
নামের
ভুলে নাকি যমরাজও মাঝেমধ্যে ভুল মানুষকে তুলে নিয়ে যান, আর আমাদের পুলিশ
ভাইদের তো সামান্য ‘নামের মিল’ পেলেই হলো! তবে এই ধরে নেওয়ার বিড়ম্বনা
পোহাতে হয় ভুক্তভোগী আর তার পরিবারকেই। সবশেষ এরকম এক নামের বিভ্রাটের
কারণে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বেনাপোল প্রতিনিধি মোহা. আসাদুজ্জামানকে
গভীর রাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার
দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাকে কারাগারে পাঠানোর যে আবেদন পুলিশ
করেছে, সেখানে বলা হয়েছে, তিনি শার্শা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক
সম্পাদক মো. আসাদুজ্জামান আসাদ।
আইনজীবী ও পরিবার বলছে, যে
আসাদুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তিনি একসময় শার্শা সরকারি মহিলা
কলেজের প্রদর্শক ছিলেন। এখন তার পেশা সাংবাদিকতা। এক সময় তিনি আওয়ামী লীগের
উপজেলা কমিটির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তবে কলেজ সরকারি হওয়ায় পরে
তিনি আর ওই পদে ছিলেন না। সাংগঠনিক সম্পাদক পদে তো নয়ই। তবে শার্শা উপজেলা
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের নামও আসাদুজ্জামান আসাদ। তিনি সাবেক সংসদ
সদস্য শেখ আফিল উদ্দিনের এপিএস ছিলেন।
আরেকটি ঘটনা বলি। রাত দুইটার দিকে
বাসায় কলিংবেল। দরজা খুলতে দেরি হওয়ায় দরজায় করাঘাত। হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির
কর্তা দরজা খুলে দেখতে পেলেন পুলিশ দাঁড়িয়ে। কী ব্যাপার? পুলিশের প্রশ্ন,
জাকির হোসেন কে? কর্তা বললেন, তিনি জাকির হোসেন নামে কাউকে চেনেন না।
বাড়িওয়ালার বাসায় নক করা হলো। তার কাছে জানতে চাওয়া হলো, জাকির হোসেন কে?
তিনি জানালেন, এই নামে একজন ভাড়াটিয়া ছিলেন। কিন্তু তিনি বেশ কয়েক মাস আগেই
বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। বাড়িওয়ালার কাছ থেকে জাকিরের নম্বরে কল দিয়ে পুলিশ
তাকে সকালে হাজারীবাগ থানায় আসতে বলল। কেন থানায় যেতে হবে? পুলিশ বলল,
‘ফ্রড কেস’। মানে প্রতারণার মামলা। টাকা নিয়ে ফেরত দেননি। চেক জালিয়াতির
মামলা।
এই জাকির আমার আত্মীয়। সকালে ঘুম ভাঙে তার ফোনে। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে
বলল, ‘দাদা পুলিশ আমাকে থানায় যেতে বলেছে।’ কেন? ঘটনা বলল এবং জানাল, তার
সঙ্গে কারও টাকা-পয়সার লেনদেন নেই। কাউকে চেকও দেয়নি। তাহলে এই মামলা হলো
কীভাবে বা কে করল? এ অবস্থায় থানায় যাবে কি না বা গেলে কোনো ঝামেলায় পড়বে
কি না, পুলিশ গ্রেপ্তার দেখিয়ে কোর্টে চালান করে দেবে কি না-এরকম নানাবিধ
ভয়ে জাকির ভীতসন্ত্রস্ত। অভয় দিয়ে বললাম, আগে আমি থানায় কথা বলি।
হাজারীবাগ
থানার তৎকালীন ওসিকে ফোন করে ঘটনা বললাম। তিনি সব শুনে বললেন, যদি আমার
সময় হয় তাহলে যেন একটু থানায় যাই এবং সংশ্লিষ্ট অফিসারের সামনেই তিনি
জিজ্ঞেস করবেন ঘটনাটা কী?
সন্ধ্যায় থানায় গেলাম। সংশ্লিষ্ট অফিসারের কাছ
থেকে আসামির নাম, মামলার নম্বর এবং ওই সূত্র ধরে বাদীর মোবাইল ফোন নম্বরে
ফোন দিয়ে জানা গেল, যার নামে মামলা করেছেন তিনি আরেক জাকির হোসেন। আমার
আত্মীয় জাকির নন। বাসার যে ঠিকানা দিয়েছেন সেটিও আমার ওই আত্মীয়ের পুরোনো
বাসার কাছাকাছি। তাহলে পুলিশ কী করে ভুল জাকিরকে ধরতে মধ্যরাতে বাসায় হানা
দিল? উপরন্তু এরকম একটি দুর্বল বা ছোট মামলার একজন আসামিকে ধরতে মধ্যরাতে
বাসায় হানা দিয়ে পুরো ভবনে আতঙ্ক ছড়াতে হবে কেন? কী কারণে কয়েকটি পরিবারের
রাতের ঘুম নষ্ট করা হলো? ভোরে কিংবা সন্ধ্যায় কি আসামি গ্রেপ্তার করা যায়
না? তাছাড়া আসামির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া পুলিশ কী করে মধ্যরাতে একজন
নাগরিকের বাসায় গিয়ে এভাবে হানা দেয়-যদি না তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী বা
রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক কোনো ব্যক্তি হন?
এবার ভাবুন, পুলিশ যে জাকিরকে
ধরতে গিয়েছিল, তার বদলে যদি আমার আত্মীয় জাকিরকে মধ্যরাতে বাসায় পেত,
নিঃসন্দেহে তাকে ধরে নিয়ে আসত। তার সঙ্গে কারও টাকা-পয়সার লেনদেন আছে কি
নেই; কাউকে তিনি চেক দিয়েছিলেন কিনা এবং তা বাউন্স হয়েছে কি না; মামলায় তার
বাবা-মায়ের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরের মিল আছে কি না—এর কোনোকিছুই
পুলিশ আমলে নিত না। বরং মধ্যরাতে তাকে থানায় ধরে নিয়ে সারা রাত থানায় বসিয়ে
রাখত। পরদিন সকালে হয় তাকে কোর্টে চালান করে দিত অথবা মোটা অঙ্কের ঘুষের
বিনিময়ে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দিত। আবার পুলিশ তাকে বাসায় না পেলেও যেহেতু ফোন
করে থানায় যেতে বলেছে, অতএব তাকে থানায় যেতেই হতো। তারপর যা হবার হতো।
পরিবারে একজন সাংবাদিক থাকায় এসব হয়রানির হাত থেকে তিনি ওই যাত্রা বেঁচে
যান। কিন্তু এরকম বেঁচে যাওয়া লোকের সংখ্যা সমাজে খুবই কম। বরং প্রতিনিয়ত
দেশের থানাগুলোয় এরকম হাজারও হয়রানির গল্প জমা হয়।
আসামি ধরতে গিয়ে
পুলিশের এই ধরনের কর্মকাণ্ড নতুন নয়। এভাবে ভুল লোককে ধরার ফলে কত মানুষের
জীবন থেকে কত মূল্যবান সময় ও অর্থের অপচয় হয়েছে তার কোনো হিসেব নেই।
সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের এর জন্য কোনো শাস্তি হয়েছে বা রাষ্ট্র ওই
ভুক্তভোগীদের কোনো ক্ষতিপূরণ দিয়েছে বলেও শোনা যায় না। অর্থাৎ ভুল করবে
পুলিশ। কখনো কখনো মুরগি ধরার জন্য জেনেশুনেও করবে ভুলের অভিনয়। আর খেসারত
দেবে সাধারণ মানুষ। এমন হাজারও হয়রানির গল্পের কয়টা বাইরে আসে?
নামের
মিলের কারণে পুলিশ ও র্যাব এক জোড়া ‘হায়দার’ এবং জোড়া ‘জাকির’কে আটক করে
যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, তা নিয়ে এখনও আলোচনা হয়। নাম বিভ্রাটে ও চার
ব্যক্তিকে আটক হয়েছিলেন ২০১০ সালে এসআই গৌতম কুমার রায় হত্যা মামলায়। ওই
বছরের ২০ এপ্রিল বংশাল থানার এই অপারেশন্স কর্মকর্তা সন্ত্রাসীদের গুলিতে
খুন হওয়ার পর, র্যাব ও ডিএমপি হায়দার ও জাকির নামে পৃথক দুই জোড়াকে
গ্রেপ্তার করলে দুই বাহিনীর কোন্দল প্রকাশ্য রূপ নেয়। পুলিশের পক্ষ থেকে
অভিযোগ করা হয়েছিল, হায়দার ও জাকির নামে নিরাপরাধ দুজনকে ধরে নিয়ে র্যাব
নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করেছে। অথচ চরম উদাসীনতায়
হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মূল অস্ত্র উদ্ধার না করেই ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ
আদালতে চার্জশিট জমা দেয়। এরপরের বিচারিক ট্র্যাজেডি আরও করুণ।
অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা সবাই এখন জামিনে মুক্ত এবং ‘কাইল্যা জাকির’ নামের
একজন গত দুই বছর ধরে পলাতক। মামলার ১৮ জন সাক্ষী পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের
সদস্য হওয়া সত্ত্বেও, গত ছয় বছর ধরে ডিএমপি তাদের আদালতে হাজির করতে
পারেনি। প্রায় দেড় দশক আগের সেই আলোচিত ঘটনায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা
নিহত পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারকে আশ্বাসের বাণী শোনালেও, বছরের পর বছর
সাক্ষীদের হাজির করতে এই চরম অবহেলা ভুক্তভোগীদের মনে কেবল বিচারহীনতার
বার্তাই দিয়ে যাচ্ছে।
যদিও পুলিশ এগুলোকে ভুল মনে করে কি না তা নিয়েও
যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ভুল যদি মনে করতই, তাহলে ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার
বিষয়টি আলোচিত হতো। উপরন্তু, তারা এই ভুলগুলোকে কোনো না কোনোভাবে
ন্যায়সঙ্গত প্রমাণের চেষ্টা করে ভুক্তভোগীদের আরও বিপদে ফেলে।
আবারও
ফিরি সাংবাদিক আসাদের ঘটনায়। পরিবারের অভিযোগ, নামের মিল থাকায় রাজনৈতিক
নেতা আসাদুজ্জামান আসাদের পরিবর্তে সাংবাদিক আসাদুজ্জামানকে পুলিশ ২০২৫
সালে এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। সোমবার (৮ জুন) বিকালে তাকে যশোরের
আদালতে তোলা হলে অতিরিক্ত জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তার জামিন নাকচ করে
কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এই ঘটনায়ও পুলিশ একইভাবে রাত ২টার দিকে
দেওয়াল টপকে বাড়িতে প্রবেশ করে। এরপর তারা দরজা খুলতে বাধ্য করে। অথচ
সাংবাদিক আসাদুজ্জামানকে আটকের কারণ জানতে চাইলে পুলিশ কোনো কাগজ দেখাতে
পারেনি এবং সদুত্তরও দিতে পারেনি।
প্রশ্ন হলো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়
সুনিশ্চিত না হয়েই পুলিশ কি কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে? ৫৪ ধারায় যে কাউকে
গ্রেপ্তারের ক্ষমতা পুলিশের আছে। যদিও এই ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তারপরও
তর্কের খাতিরে এটা মেনে নেওয়া গেলেও পুলিশ যখন সুনির্দিষ্ট মামলায় কাউকে
গ্রেপ্তার করবে, সেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিষয়ে খোঁজ নেবে না? কে আওয়ামী
লীগ নেতা আসাদ আর কে সাংবাদিক আসাদ-এটুকু খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন পুলিশ বোধ
করে না নাকি এটুকু তথ্য যাচাই-বাছাইয়েরও প্রয়োজন বোধ করে না? নাকি আসামি
ধরতে পারাটাই তাদের যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়? অথবা মুরগি একবার খাঁচায়
ঢুকাতে পারলেই হলো। তারপর দেখা যাবে এটাকে জবাই করা হবে নাকি ছেড়ে দেওয়া
হবে-পুলিশ কি এই তত্ত্ব অনুযায়ী আটক বা গ্রেপ্তার করে?
সংবাদমাধ্যমের
খবর বলছে, কোনো মামলা ছাড়া কেন সাংবাদিক আসাদকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, সেজন্য
প্রতিবাদ করায় শাহরিয়ার সাদাব তরঙ্গ নামে আরও একজনকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়।
এমনকি পুলিশ বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরাও নিয়ে গিয়েছে।
প্রশ্ন হলো, পুলিশ
এই ধরনের বেপরোয়া আচরণ করে কোন আইনি ক্ষমতায়? নাকি রাজনৈতিক মামলায়
গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশকে অতিরিক্ত তথা বিশেষ রাজনৈতিক ক্ষমতা দেওয়া আছে?
নাগরিকদের
সঙ্গে পুলিশের এই ধরনের মাস্তানি চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের আগে ছিল।
অভ্যুত্থানে যে অনেক পুলিশ আক্রমণের শিকার হয়েছে, সেখানে অন্যান্য কারণের
সঙ্গে পুলিশের ওপর মানুষের এই রাগ ও ক্ষোভেরও বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ওই কারণে
অভ্যুত্থানের পরে জনগণের মনে এই প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে, পুলিশ হয়তো এই
ঘটনা থেকে শিক্ষা নেবে এবং সত্যিই জনগণের বন্ধু হয়ে ওঠার চেষ্টা করবে।
কিন্তু কোথাও এই চেষ্টা দৃশ্যমান নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে পুলিশের
ভেতরে ন্যূনতম কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না। উপরন্তু জনগণের
পয়সা খরচ করে পোশাকের রং বদলে দেওয়া হয়েছে। পোশাক বা পোশাকের রং বদলালেও
ভেতরের মানুষগুলোকে পরিবর্তনের যে আয়োজন, সেটি এখনও অনুপস্থিত।
বিগত
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশন এই বাহিনীর সংস্কারে যে
১১৩টি সুপারিশ দিয়েছিল, বর্তমান সরকার ওই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করবে কি
না তা এখনও পরিষ্কার নয়। পুলিশ আগের মতোই সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে
সরকারি দলের ক্যাডারের ভূমিকা পালন করবে নাকি পুলিশকে সব ধরনের রাজনৈতিক ও
রাষ্ট্রীয় চাপমুক্ত রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হবে-তাও নিশ্চিত নয়।
তবে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন পুলিশের ব্যক্তিগত সততা। এই বাহিনীতে নিশ্চয়ই অনেক
সৎ, দেশপ্রেমিক, আন্তরিক ও জনবান্ধব সদস্য আছেন। কিন্তু ওই সংখ্যাটি যে
খুবই নগণ্য, সে বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ কম।
পুলিশকে এটা উপলব্ধি করতে হবে
যে, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে তারা যদি
সত্যিই জনবান্ধব হতে না পারে; জনগণের বন্ধু না হোক, অন্তত তারা যদি
গণবিরোধী হওয়ার প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে না পারে; কোনো প্রয়োজনে থানায়
যেতে যদি মানুষ উল্টো হয়রানির আতঙ্কে থাকে-তাহলে তার পরিণতি পুলিশ বাহিনীর
জন্য যেমন শুভ নয়, দেশের জন্য তো নয়ই।
লেখক: সাংবাদিক
