
প্রচলিত
লেড (সিসা) অ্যাসিড ব্যাটারির বাজার বড় হলেও এটি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের
জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষের খাবারে সিসা পাওয়া যাচ্ছে চিন্তা থেকেই মানুষ
লিথিয়াম আয়নের দিকে ঝুকছে কারণ এটির স্থায়িত্ব অনেক বেশি এবং এটি
পরিবেশবান্ধব। সৌরবিদ্যুৎ নির্ভর লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা
পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। প্রশাসন, পুলিশ ও স্থানীয় পরিবহন
সংশ্লিষ্টদের এ লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারিচালিত যানবাহনের উপর নজর দেয়া উচিত।
ইতিমধ্যে বৈদ্যুতিক বাসের শুল্ক কমিয়ে দেয়া হয়েছে। স্কুলবাসের শুল্ককর
পুরোপুরি তুলে নেয়া হয়েছে। ২০২২ সালে চট্টগ্রামে একটি কারখানা হয়েছে।
বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) সঙ্গে যানবাহন সংযোজনের চুক্তি
হয়েছে ২০২৪ সালে। তবে এতদিন যানবাহন সংযোজন করা হয়নি উচ্চ শুল্ককরের কারণে।
সরকার তা কমিয়ে দিয়েছে। শুধু ছোট গাড়ী নয় বাস, ট্রাক, এসইউভি (স্পোর্টস
ইউটিলিটি ভেহিকল) এমনকি কৃষিকাজের জন্য ইলেক্ট্রিকাল টাক্টর নিয়েও কাজ
চলছে। চীনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ চলছে বলে বিশ^স্ত সূত্রে জানা
যায়। বিশ^ এখন দ্রুত বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও সেই
পরিবর্তন আসবে। যারা এখনো শুধু প্রচলিত জ¦ালানি চালিত গাড়ির ব্যবসায় আটকে
আছেন, তাঁরা সময় মত প্রযুক্তি পরিবর্তন না করলে বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে।
জেনে রাখা ভাল অনেক ফিল্মের কোম্পানী স্মার্ট ফোন বাজারে আসার পরে
বিলুপ্ত হয়েছে।
বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির কারখানা করেছে বাংলাদেশ
অটো ইন্ড্রাষ্ট্রিজ এর অংশীদার চীনা প্রতিষ্ঠান ডংফেং মোটর গ্রুপ লিমিটেড।
কারখানাটি চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে, সেখানে তারা জমি নিয়েছে
১০০ একর। বিনিয়োগ দাঁড়াবে ১ হাজার ৪৪০ কোটি। বাংলাদেশ অটো ইন্ড্রাষ্ট্রিজ
সূত্রে জানা যায়, তাঁদের কারখানায় গ্যাস সংযোগের পাইপলাইন বসানোর কাজ চলছে।
আগামী জুনের মধ্যে কাজটি শেষ হবে। জুলাইয়ে তাঁরা গাড়ি উৎপাদনে যেতে
পারবেন। তাঁরা ৩০ লাখ টাকার আশেপাশের দামে বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে ছাড়তে
পারবেন।
চার চাকার বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে চীনের বিওয়াইডি শীর্ষে
রয়েছে। তারা প্রতিমাসে গড়ে ৫০ টি করে প্রায় ৩০০ টি গাড়ি বিক্রি করেছে।
মার্সিডিজ-বেঞ্জ মাসে গড়ে ১২ টি গাড়ি বিক্রি করছে। বিএমডব্লিউ এক্সিকিউটিভ
মোটরসের মাধ্যমে একটি পূর্ণ বৈদ্যুতিক গড়ির মডেল বিক্রি করে। তাদের বিক্রির
সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায়নি। দেশে প্রায় ২০ টি টেসলা আমদানি করা হয়েছে,
যার মধ্যে ১২ টি বিক্রির খবর পাওয়া গেছে। তেলচালিত নতুন গাড়ীর দাম
বৈদ্যুতিক গাড়ীর প্রায় সমান তবে রিকন্ডিশন গাড়ীর দাম বৈদ্যুতিক গাড়ির চেয়ে
কিছুটা কম। বিওয়াইডির গাড়ির সর্বনিম্ন দাম ৪৮ লাখ টাকা তবে তারা ৪০ লাখ
টাকার কমে একটি গাড়ি বাজারে ছাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের ইলন মাস্কের টেসলা
মোটর্স কোম্পনীর বৈদ্যুতিক গাড়ি ২০০৮ সাল থেকে সরবরাহ শুরু করে। ২০২৪ সালে
বিশে^ ১ কোটি ৭০ লক্ষ বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি হয়, যা আগের বছরের চেয়ে ২৫
শতাংশ বেশি। তখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ৪০ শতাংশ বাষ্পচালিত, ৩৮ শতাংশ
বৈদ্যুতিক, ২২ শতাংশ জ¦ালানিচালিত গাড়ির দখলে। চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ার
দূর্বলতার কারণে ১৯২০ সালের বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজার থেকে প্রায় উধাও হয়ে
যায়।
ঢাকার বাইরে গেলে কিভাবে চার্জ দেয়া হয় জানতে চাইলে একজন
এক্সপার্ট বলেন Ñ“ ধরেন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছি কুমিল্লায় তিনটি
চার্জিং ষ্টেশন আছে, আধা ঘন্টা লাগে চার্জ দিতে। গাড়ি চার্জে দিয়ে চা-কফি
পান করি। তারপর রওনা দেই। আর গ্রামের বাড়ী গেলে পোর্টেবল চার্জার দিয়ে
চার্জ দেই। তাতে অবশ্য একটু বেশি সময় লাগে, ঘন্টা তিনেক।” ক্র্যাক প্লাটুন
চার্জিং সলিউশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ীদের চাহিদার ভিত্তিতে চার্জিং
স্টেশন স্থাপনের কাজ করছে। তাঁরা এ পর্যন্ত ৩২টি চার্জিং স্টেশন বসিয়েছেন।
তাদের বাইরে অন্য প্রতিষ্ঠান বসিয়েছে ৬টি। পাঁচ বছরের মধ্যে দেশে আরও পাঁচ
হাজারের মত চার্জিং স্টেশন বসবে বলে বিজ্ঞ মহলের ধারণা। প্রতি কিলোমিটারে
জ¦ালানি তেলে খরচ ১৩ টাকা। বৈদ্যুতিক গাড়ি বাড়িতে চার্জ দিলে কিলোমিটারে
খরচ পড়ে ২ টাকার আশেপাশে। আর বানিজ্যিক চার্জিং ষ্টেশনে খরচ পড়ে সাড়ে ৩
থেকে ৪ টাকা। জ¦ালানি তেলের অনিয়ন্ত্রিত মূল্য বৃদ্ধির এ সময়ে ভি-মোটর মত
বিশ^মানের ই-বাইকগুলো সাধারণ বাইকের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ
কমিয়ে দিচ্ছে। একটি পেট্রোল বা অকটেন চালিত বাইকের মাইলেজ যদি প্রতি ঘন্টায়
গড়ে ৪০ কিলোমিটার হয় এবং একজন চালক যদি গড়ে প্রতিদিন ৫০ কিলোমিটার বাইক
চালান তবে তাঁর প্রতিকিলোতে খরচ হয় ৩.৫ টাকা, যা মাসে চার হাজার ২০০ টাকা।
এক্ষেত্রে একজন ইভি বাইক চালকের প্রতি কিলোমিটার চালাতে খরচ ১৫ পয়সা যা
মাসে ১৮০ টাকা মাত্র।
সরকার এরই মধ্যে ইভি খাতকে গুরুত্ব দিতে শুরু
করেছে, যা শিল্পের জন্যও ইতিবাচক। তবে এ খাতকে আরও দ্রুত এগিয়ে নিতে ইভি
রেজিষ্ট্রেশন প্রসেস সহজ করা, চার্জিং অবকাঠামো তৈরি, ব্যাটারির মান
নির্ধারণ, স্থানীয় ম্যানুফেকচারিং এ প্রণোদনা এবং কনজিউমার ফিনানশিয়াল
সাপোর্ট আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। আমাদের বিশ^াস, সরকার, মেনুফেকচারার,
ফাইনান্সিয়েল ইস্টিটিউশন এবং টেকনোলজি পার্টনার Ñসব পক্ষ একসঙ্গে কাজ করলে
বাংলাদেশে ইভি এডাপশন অনেক দ্রুত হবে। আশাব্যঞ্জক সবাই এই বলে,
‘ইলেক্ট্রিকেল ভেহিকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা Ñ২০২৫’ প্রণয়ন হয়েছে। এ
নীতিমালা ইভি শিল্পের বিকাশে প্রয়োজনীয় শুল্ক ছাড় ও নানাহ সুপারিশ
অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এ নীতিমালায় একটি ‘গ্রিনফান্ড’ তৈরির উপর গুরুত্ব
দেয়া হয়েছে। পরিবেশবাদী নাগরিকদের অনুরোধ থাকবে, বাংলাদেশ ব্যাংক যেন এখাতে
৫০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ ফান্ড গঠন করে।
যদি আপনার কাজে
এমন একটি অপশন থাকে, যেখানে আপনি মাত্র ১৫ টাকায় ১০০ কিলোমিটারের মত চলতে
পারেন, তাহলে সেটি অবশ্যই একটি আকর্ষণীয় সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়ায়। এ বছর থেকেই
নতুন টু হুইলার ক্রয়ের ২০ শতাংশের বেশি ইলেক্ট্রিক হতে পারে। আগামী পাঁচ
বছরে এ সংখ্যা ৬০ শতাংশের বেশি হতে পারে। মানুষের মাঝে ইলেক্ট্রনিক
যানবাহনের প্রতি আস্থা তৈরি হয়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো Ñভালো
মানের পণ্য এবং শক্তিশালী আফটার সেলস সার্ভিস নিশ্চিত করা। এ দুটি বিষয়
নিশ্চিত করা গেলে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার পথে আর বড় কোন বাধা থাকবে না। ইভি
সম্পর্কে ব্যবহারের সুবিধা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের
মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর
উন্নয়ন, স্মার্ট চার্জিং ব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ¦ালানির গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রাখবে বলে সকলের বিশ^াস। সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ থাকলে বাংলাদেশে
অতি দ্রুত একটি শক্তিশালী ও টেকসই ইভি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলা সম্ভব।
আজকে
চীনারা তাদের আপগ্রেডেড টেকনোলজিগুলো সকলকে দেখিয়ে দিয়েছে। ড্রাইভারবিহীন
এ,আই চালিত ৫ম জেনারেশনের গাড়ি থেকে শুরু করে গ্রীন এনার্জি, নতুন সাব
ম্যাটরিয়েলস, বয়োমেডিসিন, লাইফ সাইন্স, অ্যারোস্পেস, রোবটিক্স, মেডিকেল
টেকনোলজিস এবং অ্যাডভান্সড মাইক্রোচিপসের মত এমাজিং সব ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি
এখন আমাদের দ্বারপ্রান্তে। অসাধারণ প্রযুক্তির দিকে চীনারা যে কতদূর
এগিয়েছে তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ^াস করাই কঠিন। উন্নয়নের চরম শিখরে
আরোহন করতে হলে মধুর ক্যান্টিনে মারামারি না করে, কারো পিছনে স্লোগান না
ধরে টেকসই প্রযুক্তিতে মনোনিবেশই জাতীয় দায়িত্ব।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ
