
এমন
একটি নিকৃষ্ট অপরাধের কথা চিন্তা করুন, আইনত যার অকাট্য প্রমাণ আছে। আছে
অপরাধীর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও। কিন্তু, সত্য উন্মোচিত হবার পরও
বিচার পেতে লাগবে দুই সহস্রাধিক দিন!
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে
প্রতিটি ধর্ষণ মামলার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পাদন এবং ৯০ দিনের
মধ্যে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হবার কথা বলা হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত এই
নীতিমালা কেবল কিতাবেই সীমাবদ্ধ, এর প্রায়োগিক বহিঃপ্রকাশ নেই। এ কেমন
বিচারব্যবস্থা, যেখানে একটি মন্থর ও দীর্ঘসূত্রী কাঠামোগত কার্যপ্রক্রিয়ার
দরুণ অপরাধী সাব্যস্ত হবার পরও বিচার শেষ হতে গড়ে সময় লাগে ২৩৪৯ দিন!
তাই
যখন ৭ বছরের শিশু রামিসার বাবা আক্ষেপ করে বলেন, “আমার বিচার চাই না।
এদেশে বিচারের নজির নাই। ১৫ দিন পরে আবার নতুন কিছু হবে, তখন এই ঘটনা চাপা
পড়ে যাবে,” তখন বাস্তবিক অর্থেই আমরা বুঝতে পারি তিনি এই বিচারহীনতার
সংস্কৃতিকেই ইঙ্গিত করেন। ব্যবস্থার এই গাফিলতি দেখে আমরা শুধু নির্বাকই হই
না, আমরা হয়ে যাই আতঙ্কিত ও স্তম্ভিত। কারণ এটাই সমাজের বর্তমান বাস্তবতা।
ভয়াবহ
বিষয় হলো, এখন আর ১৫ দিন অপেক্ষার প্রহর গোনার প্রয়োজন হয় না।
বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা এখন এতটাই প্রকট যে ধর্ষণ-পরবর্তী শিশুহত্যা
প্রতিদিনকার রুটিনে পরিণত হয়েছে। মাত্র সাতদিনের ব্যবধানে রাজধানীর
পল্লবীতে ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর মস্তিষ্ক বিচ্ছিন্ন করে হত্যা, সিলেটে ও
ঠাকুরগাঁওয়ে ৪ বছরের দুটি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, মুন্সীগঞ্জে ১০ বছরের
শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা কিংবা ধর্ষণ-চেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ার পর শিশুহত্যার
নজির-আমাদের চোখে আঙুল তুলে যেন বর্তমান সমাজের নোংরা বাস্তবতাকে উপস্থাপন
করছে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম মহানগরীর বাকলিয়ায় সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে
ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। হত্যা করা হয়নি, এ যেন তার সৌভাগ্য! কিন্তু, এই
ঘটনাও কি ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের চেয়ে কম গৌণ? শিশুটি কি আদৌ বাঁচবে,
আমরা জানি না বিধির বিধান!
২.
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের
সাম্প্রতিক ঘটনার কথাও প্রসঙ্গক্রমে আসে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন চলছে
বহিরাগত এক ধর্ষকামী কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থীকে
ধর্ষণ-চেষ্টার বিচারের দাবিতে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে
শিক্ষার্থীরা বরাবরই সুরক্ষিতই ভাবেন। কিন্তু, সেখানেও পুরুষতন্ত্রের শিকার
হতে হয় নারীদের এবং সবসময়ই লড়াইয়ের বারুদ সঙ্গে করে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ
গড়তে হয়।
তবে লড়াই তো সর্বত্র এক রকম হয় না। জাহাঙ্গীরনগর একটা
বিশ্ববিদ্যালয়, চিরাচরিতভাবে প্রতিবাদ হয়, তা-ই জানা যায়। হয়তো ধর্ষণের পর
মেরে ফেলা হয়েছে বলে মিডিয়া মারফত আমরা জেনেছি দিনাজপুরের ইয়াসমিন, ঢাকার
গুলশানের মুনিয়া, কুমিল্লার তনু, ফেনীর নুসরাত কিংবা
সিরাজগঞ্জ-সাতক্ষীরা-গোপালগঞ্জের পূর্ণিমাদের কথা। কিন্তু, এই তালিকা বহু
বহু লম্বা। একটার পর ঘটনার শেষ নেই যেন, কিন্তু কয়েকগুণ ঘটনা সামনেই আসে
না!
মোদ্দাকথা, এই সমাজে নারীরা মোটেও সুরক্ষিত ও নিরাপদ নন, লড়াই-ই
তাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। কিন্তু, আমাদের অবুঝ শিশুদের আশ্রয়স্থল হবে কারা?
শিশুরা যে ক্রমাগত এমন নিরাপত্তাহীন নৃশংসতার বলি হচ্ছে, সেটাকে সামাজিক
ব্যাধির সর্বোচ্চ স্তর না বলার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে কি?
আমরা কি
ভুলে গেছি মাগুরার আছিয়ার কথা, যার মৃত্যু পুরো দেশকে কাঁদিয়েছিল? ২০২৫
সালের ৫ মার্চ রাতে মাগুরার শ্রীপুরে ৮ বছরের শিশু আছিয়া নির্মমভাবে ধর্ষণ ও
নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। পরবর্তীকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হলে
সারা দেশে তা নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। যার প্রেক্ষিতে এই মামলার
প্রধান আসামি হিটু শেখকে বিচারিক আদালত দ্রুততম সময়ে মৃত্যুদণ্ড দিলেও,
হাইকোর্টে আপিলের ঘুরপাকে তা এক বছর ধরে ঘূর্ণায়মান। প্রশ্ন জাগে, সকল
সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ধর্ষণের মামলাগুলোতে কেন এত উদারতা দেখাবার
প্রয়োজন হয়?
যারা সব কিছুতে বিচারব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে বলেন, তাদের
কি দিনাজপুরের পার্বতীপুরের ছোট্ট শিশু পূজার কথা মনে আছে, যার যোনিপথ
ধর্ষণ-চেষ্টাকালে ব্লেড দিয়ে কেটে ফেলা হয়েছিল? পূজার ধর্ষক সাইফুলকে
আমাদেরই বিচারব্যবস্থা জামিনও দিয়েছিল গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে! হায় ভাষার
মাস! তোমার মাটিতে নারীর ভাষা বন্ধ করে দেয়া হায়েনাও অবাধ বিচরণের
স্বাধীনতা পায়। এ উদ্ধত উদারতা কি বিচারের বাণীকে নিভৃতে কাঁদায় না?
৩.
বাংলাদেশ
নারী ও শিশু নির্যাতন সমীক্ষা, ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে ২০২৪ সালে ৩৬৪টি
ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। পক্ষান্তরে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুনে
অর্থাৎ শুধু প্রথম ছয় মাসেই সংখ্যাটি ছিল ৩৬৪। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের
তথ্যানুযায়ী চলতি বছরের প্রথম চার মাসে অন্ততপক্ষে ৫৬ জন শিশু ধর্ষণের
শিকার হয়েছে, যাদের সবার বয়স ১২ বছরের নিচে। প্রশ্ন হলো, এই সংখ্যাগুলো কি
কেবল সংখ্যা নাকি এটি প্রকাশ করে আমাদের নৈতিকতার অবক্ষয়?
এসব ধর্ষণ,
ধর্ষণচেষ্টা কিংবা ধর্ষণ-উত্তর হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে ভুক্তভোগী নারী বা
কন্যাশিশুর ওপর দোষারোপে সিদ্ধহস্ত একটি গোষ্ঠী ধর্মীয় অনুশাসনকে বারবার
ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেন। তারা যারা ধর্মীয় অনুশাসনকে সকল
সমস্যার সমাধান গণ্য করেন, তারা কি দেখেন না আমাদের মাদ্রাসাগুলোতে শিশু
নির্যাতনের ভয়াবহতা? নুসরাতের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড কোথায় হয়েছিল? ধর্মীয়
অনুশাসনই যদি একমাত্র সমাধান হয়, তাহলে তারা কেন সর্বাগ্রে এসব ‘শিক্ষা
প্রতিষ্ঠান’ নিয়ে কাজ করেন না, যারা সব কিছুতে ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারে
তৎপর? কেন ১০ বছরের শিশুকে বাথরুমে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, যার পায়ুপথ
বিকৃত যৌনাচারে ক্ষতবিক্ষত?
প্রধানমন্ত্রী নজির স্থাপন করে শিশু রামিসার
বাসায় গিয়ে তার শোকাহত পিতামাতার সঙ্গে দেখা করেছেন। দ্রুততম সময়ে বিচারের
আশ্বাস দিয়েছেন। বিচার তো অবশ্যই জরুরি, এতে সম্ভাবনাময় ধর্ষকামীরা সতর্ক
হলেও হতে পারে। কিন্তু, বিচারের ভয়ে সতর্ক হওয়া আর পুরুষতন্ত্রের লোলুপ
সংস্কৃতি গুপ্ত রাখার বাসনা এক বিষয় না। এক বিষয় হলে, সমাজে এই ভয়ানক
ঘটনাগুলো ঘটতই না।
ঠিক এ কারণেই সরকারপ্রধানের মাদ্রাসাগুলোতে গিয়েও
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। ঘটনা যেখানেই ঘটুক, যার সঙ্গেই ঘটুক,
আমরা সরকারের কাছে একটি কড়া বার্তা প্রত্যাশা করি। প্রত্যাশা করি, প্রায়
মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়া ধর্ষকামী পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে শুধু
বিচারব্যবস্থার জুজু নয়, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধেও একজন কন্যাসন্তানের পিতা
হিসেবে নেতৃত্ব দেবেন সরকারপ্রধান।
৪.
বাংলা ভাষার বিশিষ্ট কবি,
নাট্যকার ও সংগীতস্রষ্টা দ্বিজেন্দ্রলাল রায় লিখেছিলেন, “এমন দেশটি কোথাও
খুঁজে পাবে নাকো তুমি/ সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।” প্রশ্ন হলো,
রানীর মতো যে দেশটি তিনি ১৯০৫ সালে কল্পনা করেছিলেন, ওই রানীর সন্তানদের
সম্মান আর সুরক্ষা বিধান কি বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর অত্যাধুনিক
সমাজব্যবস্থা আনয়ন করতে পেরেছে?
সামাজিক চুক্তির মূল প্রতিপাদ্য হলো
রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধান করবে এবং এর কোনো ধরনের বিচ্যুতিতে
দ্রুত বিচার নিশ্চিত করবে। কিন্তু বাংলাদেশে যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে
পদ্ধতিগত জড়তা আইনিব্যবস্থাকে স্থবির করার ফলে দশকব্যাপী এই মামলাগুলো চলতে
থাকে, যা ব্যাহত করে ন্যায়বিচার। যৌন সহিংসতার অপরাধের ক্ষেত্রে আসামির
স্বস্বীকৃতিকে সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধের মতো আমলাতান্ত্রিক শিথিলতা দিয়ে
বিবেচনা কেবল বিচার বিভাগের অকার্যকারিতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং জনমনে
প্রশ্নের উদ্রেক ঘটায় যে, বিচারব্যবস্থা আসলে কাকে রক্ষা করছে? ভুক্তভোগী
নাকি অপরাধীকে? এ যেন বাস্তবিক অর্থেই “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো
তুমি”- কচ্ছপগতির বিচারব্যবস্থা নিয়ে চলা আমার জন্মভূমি!
সবচেয়ে বড়
প্রহসন হলো, স্বস্বীকৃত অপরাধী, যার বিচার সবাই প্রত্যাশা করে, সে
কারাগারের অভ্যন্তরে বিচার ছাড়াই জনগণের ট্যাক্সের টাকায় আয়েশী জীবন যাপন
করে! অর্থাৎ, অপরাধ স্বীকার করে যদি বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রির ‘কল্যাণে’
আরামে জীবন অতিবাহিত করা যায়, তাহলে এর চেয়ে ভালো বিকল্প আর কী হতে পারে?
৫.
রাষ্ট্র
ও সমাজের নীতিনির্ধারকদের কাছে আহ্বান, নিজেকে ভুক্তভোগী শিশুদের অভিভাবক
বা স্বজনদের জায়গাটিতে একবার বসিয়ে ভাবুন, অনুধাবন করুন। নিজেদের
গ্রহণযোগ্যতাকে সর্ববিষয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না। নইলে কয়েকদিন আগে রাজধানীর
মিরপুর কালশী বাউনিয়াবাদ এলাকায় সরকারি জমি উদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযানকে
কেন্দ্র করে পুলিশ, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে
স্থানীয় বস্তিবাসী ও জনতা যে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি
সর্বক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, “দিনে দিনে বহু
বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ।”
লেখক: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব জেনারেল এডুকেশনের সিনিয়র লেকচারার, গবেষক এবং কলামিস্ট।
