
সরকারের
দুটি প্রায়োগিক দিক থাকে। এক রাজনৈতিক আদর্শ লালন ও বাস্তবায়ন; দুই
অর্থনীতির চাকা সচল রাখার মাধ্যমে দেশের সার্বিক উন্নয়ন এবং অপ্রত্যাশিত
যেকোনও অবস্থার মোকাবিলা করা। অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সরকার সামষ্টিক
অর্থনীতির সূচকগুলো নিয়ে কাজ করে, যা অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য পরিমাপের জন্য
ব্যবহৃত হয়; যেমন জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, বাণিজ্য ভারসাম্য,
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রাজস্ব ঘাটতি ইত্যাদি। প্রাসঙ্গিকভাবে, সরকার কি
সব সূচকের নির্ধারিত লক্ষ্য একইসঙ্গে অর্জন করতে পারবে? অনেকে ক্ষেত্রে
পারবে, আবার অনেক সূচকের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ, প্রবৃদ্ধি ও
কর্মসংস্থান একইসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব হলেও অনেক সময়ই মুদ্রাস্ফীতি
নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রশ্ন থেকেই যায়, তাহলে সরকার কোন চলককে সবচেয়ে বেশি
গুরুত্ব দেবে? সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর মধ্যে অর্থনীতিবিদ ও
নীতিনির্ধারকগণের মতে কর্মসংস্থানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কর্মসংস্থান
কেবল একটি সংখ্যাগত সূচক নয়; এটি সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রা, আয়,
ক্রয়ক্ষমতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার সঙ্গে
প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত। আজকের এ আলোচনায় আমরা সেটিই দেখবো যে কেন একটি
সরকার কর্মসংস্থানকে লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগিয়ে যেতে পারবে।
কর্মসংস্থানকে
ঘিরেই মূলত অর্থনীতির বিভিন্ন মতাদর্শ সৃষ্টি হয়েছে। ধ্রুপদীধারার
অর্থনীতিবিদগণ একটি দেশে ‘পূর্ণ কর্মসংস্থান স্তরের উৎপাদন’ রয়েছে মর্মে
নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেন। এর নেপথ্যে রয়েছে জে বি সে’র বিখ্যাত তত্ত্ব –
“সরবরাহ তার নিজস্ব চাহিদা তৈরি করে”। এটি বুঝতে আমরা অনেকেই ভুল করি।
অনেকেই মনে করেন, সরবরাহের ফলে বাজারে চাহিদা তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ,
বাজারে নতুন মডেলের মোবাইল এলে সেটির চাহিদা তৈরি হয়। বিষয়টি এরকম নয়।
বাজারে কোনও কিছু কিনতে হলে ওই ব্যক্তিকে কিছু উৎপাদন করতে হয়। যখন কোনও
পণ্য বা সেবা উৎপাদন করা হয়, তখন সে উৎপাদনের মাধ্যমে আয় সৃষ্টি হয় (মজুরি,
ভাড়া, মুনাফা ইত্যাদি আকারে)। এ আয় মানুষকে অন্যান্য পণ্য ও সেবা কেনার
ক্ষমতা তৈরি করে। এভাবে উৎপাদন নিজেই চাহিদার জন্ম দেয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি
কারখানা কাপড় উৎপাদন করলে শ্রমিকরা মজুরি পায় এবং মালিক লাভ করে। এ আয়
তারা খাবার, বাসস্থান বা অন্যান্য জিনিস কিনতে ব্যবহার করে। ফলে উৎপাদনকে
ঘিরে নতুন চাহিদা সৃষ্টি হয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, যেহেতু
সরবরাহই চাহিদা তৈরি করে তাই ধ্রুপদীধারার অর্থনীতিতে কোনও বেকারত্ব দেখা
যায় না এবং বাজার নিজে থেকেই ভারসাম্যে অবস্থান করে।
ক্লাসিক্যাল ঘরানার
এ মতবাদ দুটি কারণে সমালোচনার দাবি রাখে। প্রথমত, জে বি সে’র মতে, উৎপাদনই
চাহিদার উৎস, কিন্তু বাস্তবে এটি সব পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য নয়। বিশেষত;
কেইন্সের মতে, সরবরাহ সব সময় চাহিদা তৈরি করে না, কারণ মানুষ আয়ের একটি অংশ
সঞ্চয় করতে পারে, ফলে মোট চাহিদা কমেও যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, ক্লাসিক্যাল
তত্ত্ব অনুসারে একটি অর্থনীতিতে মন্দা হওয়ার সুযোগ নাই। কিন্তু ১৯৩০ সালের
মহামন্দা আমাদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে যে অর্থনীতিতে বেকারত্ব তৈরি হতে
পারে।
অর্থনীতির রিয়েল বিজনেস থিওরির অনুসারীরা মনে করেন, সময়ের
পরিক্রমায় অর্থনীতি “মন্দা-পুনরুদ্ধার সময়-চাঙা-মন্দা” – এভাবে তরঙ্গ আকারে
পরিচালিত হয়। একটা দেশ যখন অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হয় তখন এর ভোগ ব্যয়
কমে, প্রবৃদ্ধি কমে, বিনিয়োগ কমে ইত্যাদি। এর ফলে ওই অর্থনীতির কর্মসংস্থান
কমে যায়। মূলত, কর্মসংস্থানের তথ্য দেখে একটি দেশ রিয়েল বিজনেস সাইকেলের
কোথায় অবস্থান করছে তা বলে দেওয়া সম্ভব। জন মেনার্ড কেইন্স তার বিখ্যাত
“দ্য জেনারেল থিওরি অব এমপ্লয়মেন্ট, ইন্টারেস্ট অ্যান্ড মানি” গ্রন্থে
যুক্তি দেন যে একটি অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের মাত্রা সামগ্রিক চাহিদার ওপর
নির্ভরশীল। বেকারত্ব বৃদ্ধি পেলে পরিবারগুলোর আয় কমে যায়। ফলে ভোগ ব্যয়
হ্রাস পায় এবং ফলশ্রুতিতে প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। এটিই মূলত কেইন্সিয়ান
মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট। কেইন্স মনে করতেন, সরকারের সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব
নীতির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই মন্দা থেকে বের হওয়ার প্রধান উপায়।
বর্তমানে এ কৌশলই বেশি প্রযোজ্য। ওকুনের সূত্র (১৯৬২) কর্মসংস্থান ও
উৎপাদনের মধ্যে সরাসরি গাণিতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। সূত্র বলছে, ৪ শতাংশ
প্রবৃদ্ধি বাড়লে ১ শতাংশ বেকারত্ব কমবে। কার্যত, প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদন
একইসাথে ক্রিয়া করে। কর্মরত মানুষ উৎপাদনে অংশ নেয়, আয় করে এবং ব্যয় (ভোগ ও
বিনিয়োগ) করে। এর ফলাফল হিসেবে আগামীতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং বাজেট
ঘাটতি কমবে।
ব্যয়ভিত্তিক জিডিপি পরিমাপের চারটি উপকরণ রয়েছে; ব্যক্তি
পর্যায়ের ভোগ ব্যয়, বেসরকারি বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয় (সরকারি বিনিয়োগ ও
রাজস্ব ব্যয়) এবং নিট রফতানি। মোট জাতীয় আয়ের ৭০ শতাংশের অধিক হলো ব্যক্তি
পর্যায়ের ভোগ ব্যয়, যা সরাসরি কর্মসংস্থানের সাথে সম্পৃক্ত। কর্মসংস্থান
বাড়লে পরিবারের আয় বাড়ে, ব্যয় বাড়ে, ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়ে —এ ‘সার্কুলার
ফ্লো’ অর্থনীতিকে সচল রাখে। এছাড়া, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক স্থিতিশীলতা
রক্ষা, ক্ষমতায়নসহ কর্মসংস্থান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অর্থনীতির গতিপথ
নিরূপণ করে। কারণ, বেকারত্ব মানুষকে কেবল আর্থিকভাবেই নয়, মনস্তাত্ত্বিক ও
সামাজিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। উচ্চ বেকারত্ব সামাজিক অসন্তোষ, অপরাধ
বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সাথে যুক্ত— এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত।
সাম্প্রতিক সময়ে আমরা ‘আরব বসন্ত’ দেখেছি, যার পেছনে ছিল বেকারত্বের
নেতিবাচক প্রভাব। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে তৈরি
পোশাক খাত, যা ৪০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে ৮০
শতাংশ নারী। এ কর্মসংস্থান শুধু আয় বৃদ্ধি করেনি, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু
বিবাহ হ্রাস এবং মাতৃমৃত্যুর হার কমাতেও ভূমিকা রেখেছে (বিশ্বব্যাংক,
২০২২)। উপরন্তু, একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার মানবসম্পদ।
কর্মসংস্থান নিশ্চিত না হলে এ সম্পদের অপচয় হয়।
‘বিশ্বের কারখানা’
হিসেবে পরিচিত চীন গত তিন দশকে কয়েক কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে বের
করে এনেছে। তাদের মূল কৌশল ছিল শ্রমনিবিড় উৎপাদন ব্যবস্থা। ১৯৮০ থেকে ২০২০
সালের মধ্যে প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা সম্ভব
হয়েছে। বিশেষত, চীনের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং
লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে। চীনের ‘হুকৌ’ সিস্টেম বা আবাসন
নিবন্ধন ব্যবস্থার সংস্কার গ্রামীণ শ্রমিকদের শহরে কাজ করার সুযোগ করে
দিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে চীনের লক্ষ্য ছিল ১ দশমিক ২ কোটি নতুন
শহুরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এ কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক নীতিই সামাজিক
স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’-এর দুটি প্রধান লক্ষ্য রয়েছে মূল্য
স্থিতিশীলতা এবং সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা মনে
করেন, একটি শক্তিশালী শ্রমবাজারই হলো সুস্থ অর্থনীতির প্রধান নির্দেশক।
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক মন্দার পর এবং সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারির পর
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে শ্রমবাজারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমিয়ে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে, যার
মূল লক্ষ্য ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
জার্মানি ২০০৮-০৯-এর বৈশ্বিক
আর্থিক সংকটে কর্মসংস্থান হার স্থিতিশীল রাখাকে গুরুত্ব দেয়। এর মূল
চাবিকাঠি ছিল ‘কার্জারবেইট’ বা স্বল্পকালীন কাজের নীতি। এ নীতির অধীনে,
কোম্পানিগুলো কর্মীদের ছাঁটাই না করে তাদের কাজের সময় ও বেতন সাময়িকভাবে
কমিয়ে দেয় এবং সরকার বেতনের একটি অংশ ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করে। ফলে, দক্ষ
শ্রমিকরা চাকরি হারাননি এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সময় দ্রুত উৎপাদন
বাড়ানো সম্ভব হয়েছিল। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বের উচ্চ বেকারত্বের
হারের দেশসমূহের মধ্যে অন্যতম। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে বেকারত্বের হার
৩২ দশমিক ৯ শতাংশ। এ সংকটের মূলে রয়েছে অপর্যাপ্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি,
শ্রম-নিবিড় শিল্পের অভাব, শিক্ষা ও দক্ষতার অমিল এবং ঐতিহাসিক বৈষম্যের
প্রভাব।
এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক যে বর্তমান সরকার তার ২০২৬ সালের
নির্বাচনি ইশতেহারে কর্মসংস্থানকে সামষ্টিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ও
উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে। ইশতেহারের দ্বিতীয় অধ্যায়
‘বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন’ এ
বেকারত্বকে আমাদের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কর্মসংস্থান
সৃষ্টিকে এক ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি বিনির্মাণে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া
হবে। এটি খুবই ইতিবাচক বিষয় যে সরকার অর্থনীতির মূল সূচককে শনাক্ত করতে
পেরেছে। সমাধান হিসেবে অনেক কার্যক্রম গ্রহণের কথা উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে
রয়েছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চালু, ক্ষুদ্র ও
মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, রফতানি খাতে বৈচিত্র্য আনা, উদ্ভাবন,
স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা ইত্যাদি। তথ্য-প্রযুক্তিতে নতুন বিকাশের
মাধ্যমে ১০ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা
হয়েছে।
বলতে দ্বিধা নাই, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের অর্থনীতির মতো আমাদের
অন্যতম প্রধান সমস্যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি। যথেষ্ট কর্মসংস্থানের অভাবেই
মানুষ গ্রাম থেকে শহরমুখী হয়। ঢাকায় যে এত ব্যাটারিচালিত রিকশা– এর নেপথ্যে
রয়েছে গ্রামে কর্মসংস্থানের অভাব। শহরে বিভিন্ন রকমের কাজের সুযোগ রয়েছে।
কারণ এখানে শিল্প, বাণিজ্য ও সেবা খাতের ব্যাপক লেনদেন ঘটে। ব্যাংক ও
কর্পোরেট অফিসে অফিসভিত্তিক চাকরি, স্কুল-কলেজে শিক্ষকতা, হাসপাতাল ও
ক্লিনিকে ডাক্তার-নার্সের কাজ, দোকান বা শপিং মলে ব্যবসা ও বিক্রয়কর্মীর
কাজ, পরিবহন খাতে চালক বা রাইড শেয়ারিং সেবা, কারিগরি কাজে ইলেকট্রিশিয়ান
বা মেকানিক, আইটি খাতে প্রোগ্রামার বা ফ্রিল্যান্সার, হোটেল-রেস্টুরেন্টে
শেফ ও ওয়েটার, গৃহস্থালি কাজ এবং নিরাপত্তারক্ষীর মতো পেশা শহরকে কেন্দ্র
করেই বিদ্যমান। তবে মাথায় রাখতে হবে, লিফটম্যানের চাকরি আসলে কর্মসংস্থান
নয়। এখানে হয়তো একজনের রুটি-রুজি জড়িয়ে যায়, কিন্তু এটি অর্থনীতিতে তেমন
প্রভাব ফেলতে পারবে না।
দীর্ঘ আলোচনার পর পাঠক জানতে চাইতেই পারেন,
কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান কীভাবে সৃষ্টি হবে? সংক্ষেপে এবং সুনির্দিষ্টভাবে
বললে, একমাত্র বেসরকারি বা ব্যক্তি খাতের বিকাশের মাধ্যমে তা সম্ভব হবে।
সরকারি খাতে চাকরির সংখ্যা সীমিত এবং কোনোভাবেই এর আকার বড় করে সরকারকে
অদক্ষ করে তোলার প্রয়োজন নাই। বেসরকারি খাতে শিল্পকারখানা, ব্যবসা
প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আইটি কোম্পানি, হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ নানা প্রতিষ্ঠানের
মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়। উদ্যোক্তারা নতুন ব্যবসা
শুরু করলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, বাজার সম্প্রসারিত হয় এবং সরাসরি ও
পরোক্ষভাবে বহু মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কোনও পণ্য উৎপাদিত হলে একে
ঘিরে শিল্প (অন্যান্য পণ্য তৈরি) ও সেবার খাত (বাজারজাতকরণ, পরিবহন,
ইত্যাদি) প্রসারিত হয়। এছাড়া, প্রযুক্তি ও সেবাভিত্তিক খাতে উদ্ভাবন ও
প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দক্ষ জনশক্তির চাহিদাও বাড়ে। টেকসই ও ব্যাপক
কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে বেসরকারি বা ব্যক্তি খাতের উন্নয়নই একমাত্র
সমাধান।
পরিশেষে, কর্মসংস্থান সামষ্টিক অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
সূচক। কারণ এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং মানুষকেন্দ্রিক মানবিক উন্নয়নের
কেন্দ্রবিন্দু। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়, এটি একটি দেশের রাজনৈতিক
স্থিতিশীলতারও ভিত্তি। বেকার যুবসমাজ যেকোনও দেশের জন্য ‘ডেমোগ্রাফিক
ডিভিডেন্ড’ হওয়ার পরিবর্তে সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। তাই
নীতিনির্ধারকদের উচিত কেবল প্রবৃদ্ধি নয়, বরং ‘কর্মসংস্থানবান্ধব
প্রবৃদ্ধি’ নিশ্চিত করা। একটি দেশের প্রবৃদ্ধি বা অন্যান্য সূচক যতই ভালো
হোক, যদি কর্মসংস্থান না বাড়ে, তাহলে সে উন্নয়ন টেকসই নয়। তাই কর্মসংস্থানই
হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক, কারণ এটি মানুষের
জীবনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত এবং অর্থনীতির প্রতিটি খাতকে প্রভাবিত করে।
ইশতেহার বলছে, ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরই হবে
একমাত্র লক্ষ্য। কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে তাই সরকারকে
ব্যক্তি খাতের বিকাশেই মনোযোগী হতে হবে।
লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক
