শুক্রবার ১৭ এপ্রিল ২০২৬
৪ বৈশাখ ১৪৩৩
কুমিল্লায় পৃথক দুর্ঘটনায় সড়কে ঝড়লো ৯ প্রাণ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ১:১৩ এএম আপডেট: ১৬.০৪.২০২৬ ২:০১ এএম |


কুমিল্লায় পৃথক দুর্ঘটনায় সড়কে ঝড়লো ৯ প্রাণনিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার দাউদকান্দিতে চাল বোঝাই ট্রাক উল্টে খাদে পড়ে ৭ জন নিহত হয়েছেন। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো অন্তত ছয় জন। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) ভোর সাড়ে তিনটার দিকে মহাসড়কের হাসানপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় হতাহতদের সবাই দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। নিহতরা হলেন- নবাবগঞ্জ উপজেলার খালিবপুর এলাকার মোহাম্মদ আফজাল হোসেন (৩৫), সোহরাব হোসেন (৪০), সালেক (৪৫), বিরামপুর উপজেলার ভাইঘর গ্রামের সুমন (২১), বিষু (৩৫), আবু হোসেন (৩০) এবং আব্দুর রশিদ (৫৫)।
অপরদিকে কুমিল্লার দেবিদ্বারে কাভার্ডভ্যানের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে সিএনজি যাত্রী মা ও ছেলে নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ৫ জন। মঙ্গলবার (১৫ এপ্রিল) বিকেলে কুমিল্লা সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের দেবিদ্বার উপজেলার বারেরা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- মুরাদনগরের বাংগরা থানাধীন গাজীর হাট গ্রামের রওশন আরা (৩২) এবং তার ছেলে ইয়ামিন(৬)। হতাহতেদর মধ্যে সিএনজি চালক ছাড়া বাকিরা সবাই একই পরিবারের সদস্য বলে জানা গেছে।

জীবিকার খোঁজে এসে মৃত্যুর কোলে ৭ শ্রমিক:
কুমিল্লার হাইওয়ে ক্রসিং থানার লাশ ঘরে রাখা লাশের সারিতে নিজের ভাই সুমনকে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সামিউল ইসলাম। লাশের পাশেই খুঁজে পেলেন সুমনের জামা কাপড় মশারির ব্যাগ। সেখান থেকেই বেগুনী রঙের একটা টি- শার্ট বের করে বললেন, 'এই জামা আমি কিনে দিয়েছি। সুমন আর এই জামা পরবে না। প্রতিবছর জীবিকার তাগিদে সুমন আমার কাছে কুমিল্লায় আসে, এবার এসে জীবনটাই হারালো।' দিনাজপুর জেলার বিরামপুরের ভাইগড় গ্রামের বাড়িতে থাকা বাবা- মাকে সামিউলের কি হয়েছে, কি বলবে- থানায় দাঁড়িয়ে সেই উত্তর খুঁজছে সামিউল। 
একই জেলার খালেদপুর এলাকার সোহরাব এবারই প্রথমবার নিজ জেলা থেকে কাজের জন্য কুমিল্লায় আসছিলেন। তাকে বাড়ি ছেড়ে আসতে নিষেধও করেছিলেন স্ত্রী চম্পা আক্তার। তারপরও দুই মেয়ের ভরনপোষনের কথা ভেবে ধানকাটার শ্রমিকের কাজ করতেই বাড়ি ছেড়ে আসছিলেন কুমিল্লায়। যে ট্রাকে করে আসছিলেন, পথিমধ্যে সেই ট্রাক উল্টে চাউলের বস্তা চাপায় প্রাণ হারালেন সোহরাব। 
তার লাশ নিতে আসা ভগ্নিপতি জসিম উদ্দিন জানান, এবার ওই এলাকায় কাজকর্ম তেমন নেই। তাই এই মৌসুমে কাজের আসায় আসছিলেন সোহরাব। তার স্ত্রী তাকে আসতে নিষেধ করলেও সে শুনে নি। 
উত্তরবঙ্গ থেকে জীবিকার খোঁজে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে চাউলের ট্রাকে চেপে আাছিলেন সামিউল, সোহরাবসহ ১৩ জন। সোমবার ভোর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দির হাসানপুর এলাকায় ট্রাকটি উল্টে যায়। ঘটনাস্থলে চাউলের বস্তা ও ট্রাক চাপায় মারা যান ৭ জন। আহত হয় আরো ৬ জন। 
এই দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন, দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার খালিবপুর গ্রামের আজাদের ছেলে মোহাম্মদ আফজাল হোসেন (৩৫), আলম মিয়ার ছেলে সোহরাব হোসেন (৪০), ফজলুর রহমানের ছেলে সালেক (৪৫), একই জেলার বিরামপুর উপজেলার ভাইঘর গ্রামের পলাশ মিয়ার ছেলে সুমন (২১), মজিরুল ইসলামের ছেলে আবু হোসেন (৩০), একই গ্রামের বাসিন্দা বিষু মিয়া (৩৫) এবং রকিবুল্লার ছেলে আব্দুর রশিদ (৫৫)।
নিরাপদ সড়ক চাই - দাউকান্দি উপজেলা সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন বলেন, 'দিনাজপুর থেকে কুমিল্লা আসতে বাসে জনপ্রতি কমে দেড় হাজার টাকা খরচ হয়। খরচ বাঁচাতে এই শ্রমিকরা চাউলের ট্রাকের উপরে উঠেন। এতে হয় তো তারা দুই/তিন শ টাকা জনপ্রতি খরচ হয়। টাকার অভাবেই তো তারা এভাবে বেআইনী ভাবে পণ্যবাহী ট্রাকে আসছিলেন।'
তবে আলমগীর হোসেন জানান, আমি আহতদের সাথে কথা বলেছি, তারা জানিয়েছে মুন্সিগঞ্জের মেঘনা টোলপ্লাজায় এসে চালকের আসনে বসেন হেল্পার। সেখান থেকে আনুমানিক ১৫ কিলোমিটার দূরে এসেই সে ট্রাকের নিয়ন্ত্রণ হারায়, আর এই প্রাণহানি ঘটে।
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে আসেন হাইওয়ে কুমিল্লা রিজিয়ন পুলিশ সুপার শাহিনুর আলম খান, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য খন্দকার মারুফ হোসেন, দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসরিন আক্তার। তাৎক্ষনিক ভাবে জেলা প্রশাসন থেকে নিহতদের পরিবহনের জন্য ২৫ হাজার টাকা ও আহতদের চিকিৎসার জন্য ১৫ হাজার টাকা সহযোগিতা দেয়া হয়। 
এসময় পুলিশ সুপার শাহিনুর আলম খান বলেন, 'দুর্ঘটনার প্রকৃত কারন তদন্তের পর জানা যাবে। তবে প্রাথমিক ভাবে দেখা গেছে, যে জায়গায় দুর্ঘটনা সেখানে মহাসড়কের অবস্থা ভালো। তাহলে বোঝা যায় যানবাহনটি যেহেতু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দিনাজপুর থেকে আসছিলো- সেক্ষেত্রে চালক কতক্ষণ গাড়ি চালাচ্ছিলো কিংবা তার লাইসেন্স আছে কি, নাই - এই বিষয়গুলো প্রতীয়মান হচ্ছে।'

আত্মীয়ের কুলখানি শেষে বাড়ি ফেরা হলো না মা-ছেলের:
কুমিল্লায় এক আত্মীয়ের কুলখানির দাওয়াত শেষে বাড়ি ফেরার পথে কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় সিএনজি চালিত অটোরিক্সা উল্টে সড়কেই মা ও তার শিশু সন্তানের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় ওই নারীর বাবা মাসহ আরও পাঁচ জন আহত হয়েছে। আহতদের উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। 
গতকাল বুধবার (১৫ এপ্রিল) বিকালে কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের দেবিদ্বার পৌরসভার বারেরা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এরই মধ্যে সন্ধ্যায় নিহতদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানায় মীরপুর ফাঁড়ি থানার ওসি মো.আক্তারুজ্জামান। নিহতরা হলেন, মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরাবাজার আন্দিকুট ইউনিয়নের জাড্ডা গ্রামের দিদার মিয়ার স্ত্রী রোশন আরা বেগম (৩৮) এবং তাঁর ছয় বছরের শিশু সন্তান মো. ইয়ামিন হোসাইন। দুর্ঘটনায় আহতরা হলেন,  ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার বাশারুপ গ্রামের মৃত বজলু মিয়ার ছেলে এবং নিহত রওশন আরার বাবা মো. তাজুল ইসলাম (৭৩) ও তার স্ত্রী মিনু আরা বেগম (৬৫), মুরাদনগর উপজেলার দারোরা গ্রামের লাল মিয়ার ছেলে সিএনজি চালক জিসান (৩৫) ও অপর আহত দুইজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। 
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আহত মো. তাজুল ইসলাম বলেন,  মেয়ে, নাতি ও স্ত্রীসহ কুমিল্লার ক্যান্টমেন্ট ময়নামতি এলাকায় এক নিকট আত্মীয়ের কুলখানি দাওয়াত শেষ সিএনজিচালিত অটোরিক্সায় করে বাড়ি মুরাদনগর উপজেলার কোম্পানীগঞ্জে ফিরছিলাম। দেবিদ্বার উপজেলার বারেরা এলাকায় আসার পর পিছন থেকে একটি কাভার্ডভ্যান দ্রুত গতিতে ওভারটেক করতে গিয়ে সিএনজিটির একপাশে চাপা দেয়, এতে সিএনজিটি ধুমড়ে মুচড়ে উল্টে যায়। আমি আরেকজন যাত্রী ও চালক সামনে থাকায় রাস্তার এক পাশে ছিটকে পড়ে যাই। আমার মেয়ে স্ত্রী  ও নাতি ভিতরে ছিল তারা বের হতে পারেনি। ঘটনাস্থলে আমার মেয়ে  মারা যায়,  হাসপাতাল নেওয়ার পথে আমার ছয় বছরের নাতিও মারা যায়।
প্রত্যাক্ষদর্শী বাইকচালক মো. সেলিম উদ্দিন  বলেন, আমি পাঠাও কোরিয়ার সার্ভিসের কাভার্ডভ্যানের পিছনে ছিলাম। কাভার্ডভ্যানটি দ্রুত গতিতে সিএনজিটিকে ওভারটেক করতে গিয়ে সিএনজির পিছনে ধাক্কা দেয় এতে সিএনজিটি কয়েক ফুট দূরে গিয়ে উল্টে পড়ে। ভিতরের থাকা এক নারী ঘটনাস্থলেই মারা যেতে দেখেছি। তারপর কয়েকজন এসে অন্য আহতদের ধরে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এর মধ্যে একটি শিশু রয়েছে।  
ময়নামতি থেকে একটি সিএনজি যোগে ৬ যাত্রী নিয়ে কোম্পানীগঞ্জ যাওয়ার পথে বেলা ৩টায় কুমিল্লা- সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের দেবীদ্বার পৌর এলাকার বারেরা সরকার বাড়ির সামনে  কাভার্ড ভ্যান (সিএনজিটিকে ধাক্কা দিলে আরোহীরা হতাহত হন। কাভার্ড ভ্যানটি পালিয়ে গেলে স্থানীয়রা কংশনগর এলাকা থেকে ধরে এনে পুলিশে দেয়। ঘটনায় নিহতার মা-বা গুরুতর আহত হলেও বাকী আহতরা চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি চলে গেছেন বলে জানা যায়। 
এ বিষয়ে মিরপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো.আক্তারুজ্জামান কুমিল্লার কাগজকে বলেন, কাভার্ডভ্যান (ঢাকা- মেট্রো ন-১৭-৯৩০১) জব্দ করা হয়েছে। তবে কাভার্ডভ্যানের চালক হেলপার কাউকে আটক করা যায়নি। দুর্ঘটনা কবলিত সিএনজি হাইওয়ে থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যায় নিহত মা ছেলের মরদেহ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বজনরা মামলা দায়ের করলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 




















http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
কুমিল্লার ১৪৫৮ জন কৃষক ‘কৃষি কার্ড’ পাবেন আজ
কুমিল্লায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা আজ
হোমনায় স্বামীকে বেঁধে রেখে গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান
নারী উদ্যোক্তা প্রমির হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে বিক্ষোভ
কুমিল্লায় হাম আক্রান্ত আরেক শিশুর মৃত্যু
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
নববর্ষে কুমিল্লায় বিশাল মাছের মেলা
কুমিল্লায় পৃথক দুর্ঘটনায় সড়কে ঝড়লো ৯ প্রাণ
৫ বছর পর মা-বাবার কোলে ফিরল মুরাদনগরের সাইদুল
বর্ণিল আয়োজনে বর্ষবরণ কুমিল্লায়
কুমিল্লায় ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষা শুরু
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২