রাজধানীর
ব্যস্ত পল্টন এলাকার ফুটপাতই ছিল ১২ বছর বয়সী সাইদুলের ঠিকানা। কখনো
ভাঙারির কাজ, কখনো বোতল টোকানো এভাবেই কাটত দিন। দীর্ঘ ৫ বছর পর সেই
ঠিকানাহীন জীবনের অবসান ঘটল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের একটি পোস্টের
সূত্র ধরে নিজের পরিবারকে ফিরে পেয়েছে কুমিল্লার মুরাদনগরের এই কিশোর।
মঙ্গলবার
দুপুরে রাজধানীর পল্টন মডেল থানায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে সাইদুলকে তার
মা-বাবা ও স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এ সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি
হয়। সন্তানকে ফিরে পেয়ে মা ফাতেমা আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন,
“স্বপ্নও দেখিনি বড় ছেলেকে কোনোদিন ফিরে পাব।”
ঘটনার সূত্রপাত ১০
এপ্রিল। বিশ্ব পথশিশু দিবস উপলক্ষে সংবাদ সংগ্রহের সময় পুরানা পল্টন এলাকায়
সাইদুলের সঙ্গে কথা হয় গণমাধ্যমকর্মীদের। সে জানায়, ছোটবেলায় ভুল করে
ট্রেনে উঠে সে ঢাকায় চলে আসে। দীর্ঘ ৫ বছর সে তার পরিবারের খোঁজ পায়নি।
তবে সে বাড়ি ফিরতে চায়। এরপর ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় একটি পত্রিকার ফেসবুক পেজে
সাইদুলের ছবিসহ একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়।
পোস্টটি দেওয়ার
কিছুক্ষণের মধ্যেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। প্রায় ৩৪ হাজার মানুষ তাতে পতিক্রিয়া
জানায় এবং ৬ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ এটি শেয়ার করেন। মন্তব্যের ঘরে
‘রোদেলা আকাশ’ নামের একজন দাবি করেন, সাইদুল তাঁর ভাশুরের ছেলে। এরপর তাঁর
দেওয়া মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে সাইদুলের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়।
সাইদুলের
বাবা মো. মোস্তফা কামাল পেশায় অটোরিকশা মিস্ত্রি এবং মা ফাতেমা পোশাক
শ্রমিক। ৬ বছর বয়সে চট্টগ্রাম থেকে হারিয়ে গিয়েছিল সাইদুল। মোস্তফা কামাল
জানান, গত ৫ বছর ছেলেকে খুঁজতে তিনি জিডি করা, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া
থেকে শুরু করে হেন কোনো চেষ্টা নেই যা করেননি। ছেলের ছোটবেলার টিকা কার্ড ও
ছবিগুলো তিনি পরম যতন করে আগলে রেখেছিলেন এই আশায় যে, একদিন তাকে খুঁজে
পাবেন।
মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম থেকে সাইদুলের মা-বাবা ও স্বজনরা ঢাকায়
আসেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণিতে যখন সাইদুল তার মা-বাবাকে দেখতে পায়, তখন
এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। পাঁচ বছরের বিচ্ছিন্নতা ঘুচিয়ে মা তাকে
জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করেন। এতদিন রাজপথের যে পথশিশুরা ছিল সাইদুলের
পরিবার, তাদের কাছ থেকেও চোখের জলে বিদায় নেয় সে।
নিরাপত্তা ও আইনি
নিশ্চয়তার জন্য পল্টন মডেল থানায় যোগাযোগ করা হলে ওসি মোহাম্মদ মোস্তফা
কামাল খান ও শিশু সুরক্ষা সমাজকর্মী শাহানাজ মনির উপস্থিতিতে প্রয়োজনীয়
যাচাই-বাছাই শেষে সাইদুলকে তার মা-বাবার জিম্মায় দেওয়া হয়। পুলিশ
কর্মকর্তারা এই মহতী উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
বর্তমানে সাইদুল তার
মা-বাবার সঙ্গে কুমিল্লার মুরাদনগরে দাদা-দাদির কাছে ফিরে গেছে। যাওয়ার সময়
তার মুখে ছিল চওড়া হাসি। ৫ বছরের এক দীর্ঘ অনিশ্চিত যাত্রার পর সাইদুল এখন
নিজের ঘরে, নিজের মানুষের কাছে।
