দেশে
চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্পট মার্কেট থেকে ডিজেল কেনার প্রক্রিয়া
শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। যুক্তরাষ্ট্রে
নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ নিয়ে প্রাথমিক আলোচনাও হয়েছে। বর্তমান
আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ ক্রয় প্রক্রিয়া করা হবে
বলে জানিয়েছেন বিপিসি সংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে
ইরানের যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের লাগাতার হামলার বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ওই
দুই দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালাচ্ছে
ইরান। এর মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরানের জ্বালানি
কেন্দ্রগুলোতেও মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে।
বিশ্ব বাণিজ্যের
জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি, যা মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য
উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। কৌশলগতভাবে
সংবেদনশীল এ জলপথ বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয়। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত
তেলের প্রায় এক চতুর্থাংশ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং তরলীকৃত
পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বড় অংশ হরমুজ প্রণালি হয়েই পরিবাহিত হয়।
প্রধান রপ্তানিকারক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ইরাক ও
ইরানের মতো তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো এই জলপথ ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ
করে। দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেলের মতো অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি
দিয়ে পরিবাহিত হয়।
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে
উত্তেজনার কারণে ইরান এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করলে
বিশ্ববাজারে তেলের দামে প্রভাব পড়ে। এ জলপথ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশে
জ্বালানি তেল, এলএনজি ও এলপিজি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়।
যদিও বিপিসি
বলছে, বাংলাদেশে আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানির বেশিরভাগ আসে সিঙ্গাপুর,
মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও চায়নার প্রতিষ্ঠান থেকে। এসব দেশ থেকে বাংলাদেশে
আসতে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হয় না। তবে জিটুজি পদ্ধতিতে সৌদি আরব ও
সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা ক্রুড অয়েলের পুরোটাই হরমুজ প্রণালি
অতিক্রম করে আসে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে আনার জন্য এক লাখ টন ক্রুড অয়েল লোড
করতে গিয়ে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আটকে আছে নর্ডিক পোলাক
পাশাপাশি
আগামী ২২ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেলদানা অথবা ফুজাইরা বন্দরে এক
লাখ টন অ্যারাবিয়ান লাইড ক্রুড লোডের জন্য যাওয়ার কথা রয়েছে ‘ওমেরা
গ্যালাক্সি’ নামে আরেকটি ট্যাংকার ভ্যাসেল। তবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে
জাহাজ মালিকরা জাহাজ পাঠাতে রাজি হচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে
অনিচ্ছুক বিপিসির এক কর্মকর্তা।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। দেশেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে এমন
আশঙ্কায় যানবাহন চালক থেকে শুরু করে ডিলার ডিস্ট্রিবিউটররা জ্বালানি মজুত
করছেন। এতে হঠাৎ করে বিপিসিতে ডিজেল, অকটেন বিক্রি অতিরিক্ত হারে বেড়ে
গেছে। ফলে বিপিসির বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্রুত কমছে মজুত। এতে দেশে
সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে স্পট মার্কেট থেকে ডিজেল কেনার পদক্ষেপ নিচ্ছে
বিপিসি।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ‘এনার্জি
অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এলএলসি’ থেকে স্পট মার্কেটে দুই লাখ টন পরিশোধিত ডিজেল
কিনছে বিপিসি। প্রতিষ্ঠানটির লোকাল এজেন্ট হিসেবে রয়েছে মেঘনা গ্রুপ। নাম
প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্পট
মার্কেট থেকে ডিজেল কেনার জন্য বিপিসির পক্ষ থেকে আমাদের সংশ্লিষ্ট
কর্মকর্তারা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটি সম্ভবত কাজাখস্তান থেকে
তাদের ডিজেল সরবরাহ দেবে এমন কথা আমাদের জানিয়েছে। সবকিছু ঠিক মতো হলে ২৫
হাজার টনের আটটি পার্সেলে ডিজেল সরবরাহ দেবে।’
তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে
লোকাল এজেন্টের মাধ্যমে একটি কোটেশন নেওয়া হয়েছে। কোটেশন পর্যালোচনা করে
প্রতিবেদন ক্রয় সংক্রান্ত কমিটিতে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া
সাপেক্ষে সরবরাহকারীকে দ্রুততম সময়ে কার্যাদেশ দেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে কথা
হলে বিপিসির পরিচালক (অর্থ, অপারেশন ও পরিকল্পনা) নাজনীন পারভীন জাগো
নিউজকে বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে পরিশোধিত জ্বালানি তেল
সংগ্রহ করি। এখন সংকটকালীন মুহূর্তে জরুরি জ্বালানি তেল সংগ্রহ করা
প্রয়োজন। তাই স্পটমার্কেট থেকে দুই লাখ টন ডিজেল কেনার একটি প্রক্রিয়া
চলছে। আমরা বিষয়টি ৯৫ শতাংশ এগিয়ে এনেছি।’
তিনি বলেন, ‘স্পট মার্কেট
থেকে কিনলেও এ ডিজেল কিনতে বিপিসিকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে না। কারণ
আমাদের বর্তমান সরবরাহকারীদের কাছ থেকে একটি রেট নেওয়া আছে। ওই রেটের
কাছাকাছি মূল্যেই দুই লাখ টন ডিজেল কেনা হবে।’
