মধ্যপ্রাচ্যে চলমান
অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন
করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পরিশোধিত
জ্বালানিতে তাৎক্ষণিক সংকট না থাকলেও অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে ব্যাঘাত
ঘটলে চাপ তৈরি হতে পারে। বর্তমানে মজুত থাকা কোন জ্বালানিতে কতদিন চলবে,
আমদানির বর্তমান পরিস্থিতি কী এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি কতটা- তা নিয়ে রয়েছে
নানান প্রশ্ন।
জ্বালানি তেল
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পরিশোধিত জ্বালনি
তেলে সংকট না হলেও অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে সমস্যায় পড়তে পারে
বাংলাদেশে। বিপিসি’র মজুতের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের
মজুত ১৪ থেকে ২১ দিনের মধ্যে শেষ হতে পারে। তবে আরও দুটি জাহাজ চট্টগ্রামে
তেল নিয়ে এসেছে- যার একটির খালাস শুরু হয়েছে। তবে কোনও কারণে মধ্যপ্রাচ্যের
সংকট আরও ঘনীভূত হলে জ্বালানি তেল আমদানিতে সংকট বাড়তে পারে বলে মনে করেন
সংশ্লিষ্টরা।
বিপিসি সূত্র বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের বিক্রির হিসাব
অনুযায়ী, বর্তমানে যে পরিমাণ ডিজেল মজুত আছে, তাতে চলবে আর মাত্র ১৪ দিন,
অকটেনে চলবে ১৭ দিন, পেট্রোলের মজুত আছে ৯ দিনের, ফার্নেস অয়েল আছে ৩৫
দিনের, জেট ফুয়েল আছে ২১ দিনের, কেরশিনের মজুত আছে ২০০ দিনের, আর মেরিন
ফুয়েলের মজুত রয়েছে ৪২ দিনের।
বাংলাদেশ মূলত দুই ধরনের জ্বালানি তেল
আমদানি করে। এরমধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের
দেশগুলো থেকে। এই অপরিশোধিত জ্বালানি চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে
পরিশোধন করা হয়। এরপর তা বিপিসির কাছে বিক্রি করা হয়। প্রতি বছর গড়ে ১৫ লাখ
মেট্রিক টন অপরিশোধিত জ্বলানি তেল আমদানি করা হয়। কোনও কারণে এই আমদানি
বন্ধ হলে পরিশোধিত তেলের আমদানি বাড়াতে হবে। সেক্ষেত্রে দেশের একমাত্র তেল
শোধনাগারটি সাময়িক বন্ধ রাখা হতে পারে।
এর বাইরে আরও ৪৫ লাখ টন পরিশোধিত
জ্বালানি আমদানি করা হয়। এই পরিশোধিত জ্বালানির একটি বড় অংশ আসে ভারত এবং
চীন থেকে। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘায়িত হলে ভারত ও চীনের যেসব রিফাইনারি
বাংলাদেশে পরিশোধিত জ্বালানি বিক্রি করে, তারাও সংকটে পড়বে। কারণ তাদের
একটি বড় অংশই কম দামে ইরান থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করে পরিশোধন করে।
বিপিসি বলছে, এখন পরিশোধিত জ্বালানি তেল যেসব দেশ থেকে আসছে, তার মধ্যে রয়েছে- সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া ও চীন।
এদিকে
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জরুরি বৈঠক
করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশে ৩৬ দিনের মজুত সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে
মজুত রয়েছে ১৫ দিনের। সমুদ্রপথে ও খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে আরও ২০ থেকে ২৫
দিনের তেল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকার জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২৮
লাখ ২০ হাজার টন তেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ২৪ লাখ ২০ হাজার টন
উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এবং ১৪ লাখ টন সরকার-টু-সরকার চুক্তিতে আমদানি
করা হবে।
বিপিসির একজন কর্মকর্তা জানান, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও
সিঙ্গাপুরের সঙ্গে জুন পর্যন্ত চুক্তি রয়েছে। আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে
রাখা হয়েছে।
এলএনজি
দেশের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করা হয়
এলএনজি দিয়ে। দেশীয় খনি থেকে প্রতিদিন ১৭১ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়।
এলএনজি আমদানি করা হয় ৮৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট। বছরে প্রায় ১১৫টি কার্গোর
মাধ্যমে ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশ, যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ টন
আসে কাতার থেকে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, ‘‘দেশীয়
গ্যাস ও আমদানিকৃত এলএনজি- দুই উৎস থেকেই সরবরাহ আসে। দেশে দুটি এলএনজি
টার্মিনাল রয়েছে, সেখানে সীমিত পরিমাণ মজুত রাখা যায়। ইতোমধ্যে আমদানি করা
ছয়টি কার্গোর মধ্যে চারটি দেশে এসে পৌঁছেছে, দুটি নিয়ে কিছুটা শঙ্কা আছে।
তবে বাকি কার্গোর উৎস হরমুজ প্রণালি নয় বলে তা নিয়ে উদ্বেগ কম।’’
তিনি
বলেন, ‘‘সম্ভাব্য সমস্যার কথা বিবেচনায় রেখে বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে
সংশ্লিষ্টদের ইমেইল করা হয়েছে।’’ এরফানুল হক জানান, স্বল্পমেয়াদে সমস্যা না
হলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হবে।
তবে চলমান
সংকটে কাতার এলএনজি সরবরাহ কোনও কারণে বন্ধ করে দিলে অন্যদেশগুলোর মতো
বাংলাদেশেকেও বিপাকে পড়তে হতে পারে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী
ইরানের হামলার পর কাতার এলএনজি আমদানি সীমিত করেছে। অপরদিকে বাংলাদেশের
এলএনজি’র আরেকটি একটি উৎস হচ্ছে ওমান। ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুমতি না
নিয়েই ইরানের বিপ্লবি গার্ড ওমানে হামলা চালিয়েছে। এই যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে
পরিস্থিতি শেষে কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, বলা কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে।
এলপিজি
দেশে
বছরে অন্তত ১৪ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। মাসে প্রয়োজন হয় কমপক্ষে ১
লাখ ২০ হাজার টন। পুরো সরবরাহই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। জানুয়ারি থেকে বাজারে
এলপিজির সংকট চলছে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের
সহসভাপতি ও এনার্জি-প্যাক পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক
মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ বলেন, ‘‘ঈদ পর্যন্ত সংকটের আশঙ্কা নেই। ইতোমধ্যে ১
লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি এসেছে, চলতি মাসে আসার কথা আরও ১ লাখ ৯০ হাজার টন।
কিছু জাহাজ পথে আছে, কিছু পৌঁছেছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী না হলে বড় প্রভাব
পড়বে না।’’
কয়লা
বাংলাদেশে বেশিরভাগ কয়লা আমদানি হয় ইন্দোনেশিয়া
থেকে। আন্দামান সাগর থেকে বঙ্গোপসাগরে এই জাহাজগুলো প্রবেশ করে। ফলে কয়লা
আমদানিতে কোনও প্রভাব পড়ার কথা না। হরমুজ প্রণালি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে,
পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগর এলাকায় অবস্থিত। এটি মূলত সৌদি আরব, কুয়েত,
কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক প্রভৃতি দেশ থেকে তেলবাহী জাহাজ বের হওয়ার
প্রধান রুট। (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন)
