
সারা দেশে নির্বাচনি তোড়জোড়ে উপেক্ষিত ছিল নাগরিক সেবা। একদিকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির শূন্যতা, অন্যদিকে নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যস্ততায় প্রশাসনের মনোযোগ সরে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ কাক্সিক্ষত নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির চিত্র দেখা যায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আওতাধীন এলাকাগুলোয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কয়েক মাস ধরে নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। এর ফলে রাজধানীতে মশা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। অনেক এলাকায় ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জ্বরের আতঙ্কে বাসিন্দারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে কাউন্সিলরসহ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা অনুপস্থিত। সেই সঙ্গে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় নাগরিক সেবা কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের অন্যান্য নাগরিক সেবা জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন, হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ ও আদায়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা (বর্জ্য ব্যবস্থাপনা), সড়কবাতি স্থাপন, রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ রক্ষণাবেক্ষণ চলছে ঢিমেতালে। কর্মকর্তাদের একটি অংশের দাপ্তরিক কাজে গতি হারিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ের সেবা কার্যক্রমেও প্রভাব পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, অর্থ ছাড় না হওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আটকে আছে। নিয়মিত নাগরিক সেবার খাতগুলোতে তদারকি কমেছে। এলাকাবাসী বলছেন, কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে তেমনভাবে তদারকি করছেন না। এতে সমস্যার কোনো সমাধান মিলছে না। নগরবিদরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, বর্তমান অচলাবস্থার দ্রুত কোনো সমাধানের সম্ভাবনাও নেই। অন্তর্বর্তী সরকার কার্যকর সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নগর ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবায়।
সচেতন মহলের মতে, নির্বাচন একটি সাময়িক প্রক্রিয়া হলেও নাগরিক সেবা একটি চলমান দায়িত্ব। নির্বাচনি ব্যস্ততার অজুহাতে নগর ব্যবস্থাপনা উপেক্ষা করা হলে জনস্বাস্থ্য ও জীবনমান মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তারা দ্রুত মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারসহ পরিচ্ছন্নতা, ড্রেনেজ ও অন্যান্য মৌলিক নাগরিক সেবা স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত কাউন্সিলরদের সরিয়ে যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই স্থানীয়ভাবে পরিচিত নন এবং এলাকার বাস্তব সমস্যা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। ফলে জনপ্রতিনিধি না থাকায় সাধারণ মানুষ তাদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর কোনো পথ পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ জানালেও তা সিটি করপোরেশনের নগর ভবন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে নগরবাসী সমস্যায় পড়ছেন, কোনো সমাধানও পাচ্ছেন না। সরকার সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিলেও তারা ওয়ার্ড পর্যায়ে কার্যকর তদারকি করছেন না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হবে।
নাগরিক সেবা নামকাওয়াস্তে চললেও তার সুষ্ঠু তদারকি নেই। এতে জনভোগান্তি বেড়েই চলেছে। ভোগান্তি কমাতে এ জন্য নতুন সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মৌলিক নাগরিক সেবা স্বাভাবিক রাখতে করণীয় ঠিক করতে হবে। দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে করে জনপ্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করা যায়। দেশের সব ধরনের নাগরিক সুবিধা স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। প্রত্যাশা করছি, ভোগান্তি দূর করতে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী সরকার নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
