
বিশ্ব
রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরেই নেতৃত্বের দাবিদার।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এক নীরব পরিবর্তন ঘটছে। মঞ্চের আলোয় পশ্চিমারা যতটা
সরব, মঞ্চের পেছনে চীন ততটাই দৃঢ়ভাবে নিজের অবস্থান গড়ে নিচ্ছে। তাদের
কৌশল হলো সফট ডিপ্লোমেসি, যেখানে শব্দ কম, কিন্তু প্রভাব গভীর। তাই বিশ্ব
রাজনীতির মানচিত্রে এক নতুন ভারসাম্য গড়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া যখন
প্রকাশ্য সংঘাতে ব্যস্ত, তখন চীন নীরব কৌশলে তার প্রভাব বিস্তার করছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ পর্যন্ত সবখানেই
চীনের উপস্থিতি এখন এক অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন
বিশ্বব্যবস্থা ক্রমশ ভেঙে পড়ার চিত্র কয়েক দশক ধরেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় ২০০১ সালে চীনের অন্তর্ভুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের একক
আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বাড়িয়ে বিশ্ব
অর্থনীতিতে বেইজিং এখন নিঃসন্দেহে একটি প্রভাবশালী শক্তি। সাম্প্রতিক
বছরগুলোয় চীনই একমাত্র দেশ নয়; আরও বেশ কিছু দেশ শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা
করছে। ভ্লাদিমির পুতিনের সংশোধনবাদী নেতৃত্বে রাশিয়াও বিশ্বশক্তি হিসেবে
ফেরার চেষ্টায় আছে। বাণিজ্যযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ফের আলোচনায় বিশ্বের দুই
ক্ষমতাধর দেশ চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক সময়ে দেশ দুটি একে অপরকে
নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে বিশ্বজুড়ে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা
তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির
দেশ হয়। যার মোট দেশজ উৎপাদন ২৯ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এরপরই চীনের
অবস্থান। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন ১৮ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অন্যদিকে ২০২৪
সালে চীন ছিল বিশ্বের বৃহত্তম পণ্য রপ্তানিকারক। যার মোট পরিমাণ ছিল ৩
দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি
করে। যার পরিমাণ ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। পণ্যের ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে
যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় বাণিজ্যঘাটতি রয়েছে, যা ২০২৪ সালে ৩৫৫ বিলিয়ন ডলারে
পৌঁছেছে।
সম্প্রতি মিসরের শারম আল-শেখে যখন সব ক্যামেরার দৃষ্টি
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে নিবদ্ধ ছিল, তখন তিনি গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য
নিজেকেই অভিনন্দিত করছিলেন। তার পাশে ছিলেন মিসরের আব্দেল ফাতাহ আল সিসি,
যিনি ইসরায়েল-হামাসের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সহায়তা করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যকার ২১ শতকের প্রতিযোগিতায় শি এগিয়ে আছেন; ট্রাম্প
ইতোমধ্যে নানা ভুল পদক্ষেপে জর্জরিত। বিস্ময়কর হলো, যুক্তরাজ্য ও
যুক্তরাষ্ট্রে এখনো চীনের সম্প্রসারণবাদী শাসনের চরিত্র ও লক্ষ্য নিয়ে
বিতর্ক চলমান। চীনের বিশ্বব্যাপী আগ্রাসী অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য তৈরি; হংকং,
জিনজিয়াং ও তিব্বতে নিপীড়ন চালানো; গোটা অঞ্চলে যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং
গোয়েন্দাগিরির ভিত্তিতে কেবল একটি উপসংহারেই পৌঁছা যায়। এমনকি ব্রিটিশ
এমপিরা যখন তর্ক করছিলেন, বেইজিং শত্রু কি না অথবা বিনিয়োগের সুযোগ আছে কি
না- তার উত্তর স্পষ্টভাবে শি জিনপিং দিচ্ছিলেন। বিরল খনিজ ও চুম্বকের
বৈশ্বিক রপ্তানির ওপর চীনের প্রায় একচেটিয়া দখল রয়েছে। এসব উপকরণ ফোন থেকে
শুরু করে গাড়ি পর্যন্ত অধিকাংশ ইলেকট্রনিক যন্ত্র তৈরির জন্য জরুরি। এর
নিরাপত্তাজনিত তাৎপর্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিরল খনিজজাত উপকরণ ব্যবহার হয় ক্রুজ
ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান, পারমাণবিক সাবমেরিন, ড্রোন ও অন্যান্য আধুনিক
অস্ত্রে। চীনের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এগুলো সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার নিষিদ্ধ
থাকবে। বিভিন্ন দেশ বিকল্প সরবরাহের উৎস খুঁজলেও তাদের বেগ পেতে হচ্ছে। এ
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে ইউক্রেনের জন্য পশ্চিমা অস্ত্র সরবরাহ এবং রাশিয়ার
বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও বিপন্ন হতে পারে।
চীনের ইচ্ছা, বিদেশি
উৎপাদক ও সরবরাহ শৃঙ্খলগুলোর মাধ্যমেও এসব উপকরণের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা।
যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৯ সাল থেকে একই ধরনের অতিরিক্ত ক্ষমতা দেখাচ্ছে। এখন
বেইজিং ওয়াশিংটনের মতো একই প্রভাবশালী খেলায় নামছে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে
বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে ট্রাম্প ক্ষিপ্ত হয়ে শতভাগ
শুল্ক আরোপ করেন এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক বাতিলের হুমকি দেন।
তবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে তিনি পিছু হটেন। কিন্তু ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়-
এমন শাস্তি অব্যাহত থাকলে তা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণ হতে পারে।
স্বভাবতই বলা যায়, ট্রাম্প কী করছেন, সে বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই। শি
জিনপিংয়ের অবস্থা তেমন নয়। তিনি দেখাচ্ছেন, ট্রাম্প যদি পূর্ণমাত্রার
বাণিজ্যিক যুদ্ধ করতে বাধ্য করেন, তিনিও হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যুদ্ধে
নামবেন। বিরল খনিজ নিয়ে দরকষাকষি একটা কৌশল হতে পারে কিংবা এটি শি
জিনপিংয়ের দলের অভ্যন্তরীণ কৌশলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। তার পরও যুদ্ধের
চিন্তা অতিরঞ্জন। এর মাধ্যমে বিশ্লেষকরা মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
প্রথমে নীরব থাকলেও এখন শি জিনপিংকে আক্রমণাত্মক মনে হচ্ছে। এই পরিবর্তনের
কারণ কী? সম্ভবত এটা বেইজিং উপলব্ধি করেছে, ট্রাম্পের বেপরোয়া ‘আমেরিকা
ফার্স্ট’ নীতি পুরোনো ও নতুন মিত্রদের একঘরে করে রাখছে। এতে যে শূন্যতা
তৈরি হচ্ছে, তা পূরণ করতে পারবে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব ও
প্রভাববলয় দ্রুত কমছে। ইউরোপ ও এশিয়ার জোটে ভাঙন, রাশিয়া ও ইসরায়েলের মতো
স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে দুর্বল অবস্থান, মার্কিন বৈদেশিক সহায়তা ও সফট
পাওয়ার কার্যক্রমের বিলুপ্তি এবং জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক
বিশ্বের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানেই তার প্রতিফলন ঘটছে।
চীন এখন
উন্মুক্ত গোলপোস্টের মতো। একদিকে বাস্তববাদী শি, অন্যদিকে অদক্ষ ট্রাম্প- এ
যেন অস্বস্তিকর অসম প্রতিযোগিতা। কিন্তু ওয়াশিংটনের কম বুদ্ধিসম্পন্ন
নেতারা এখনো বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছেন না। কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছিলেন, ‘খেলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের
প্রেসিডেন্টের হাতে চীনের চেয়ে অনেক বেশি কার্ড আছে।’ ভ্যান্সকে তাস খেলায়
পাওয়া গেলে তার অবস্থা বোঝা যেত। যেখানে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড
ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বলছে, ‘চীন অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে
এবং যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পাঁচ থেকে ছয় গুণ গতিতে আধুনিক অস্ত্র
বানাচ্ছে’, সে বিষয় কি ভ্যান্স জানেন? ভ্যান্স কি জানেন, যুক্তরাষ্ট্র সেই
শুল্কযুদ্ধে হেরে যাচ্ছে, যা সে নিজেই শুরু করেছিল? ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের
জেমস পামার লিখেছেন, ‘এ বছর ট্রাম্প বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করার পর থেকে চীনা
রপ্তানিকারকরা নতুন বাজার খুঁজে পেতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছেন। গত
মাসে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ২৭ শতাংশ কমেছে;
কিন্তু মোট রপ্তানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।’
অন্যদিকে চীনে
যুক্তরাষ্ট্র তাদের গুরুত্বপূর্ণ সয়াবিন বাজার হারিয়েছে। ব্রাজিলীয়
উৎপাদনকারীরা সম্ভবত স্থায়ীভাবে সে বাজার দখল করে নিচ্ছে। বন্ধের মৌসুম যখন
আসছে, তখন আমেরিকার ভোক্তারা বর্ধিত মূল্য দেখছেন। আমেরিকার অধিকাংশ খেলার
সামগ্রী এবং ক্রিসমাস পণ্যের ৯০ শতাংশ চীনের তৈরি। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে
পেছাচ্ছে, অন্যদিকে শি আগাচ্ছেন। এটাই প্রমাণ করছে- চীন বহু মেরুর বিশ্বে
শক্তিশালী অবস্থানে আছে। সাম্প্রতিক চীন আয়োজিত সামিটে রাশিয়া, ভারত, উত্তর
কোরিয়া ও ইরানের নেতারা অংশগ্রহণ করেছেন। তাই প্রমাণ করছে, চীনের
নির্দেশনায় নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে। চীন উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংগঠন
ব্রিকসের মাধ্যমে তার প্রভাববলয় বাড়াচ্ছে। জাতিসংঘের বিপরীতে গ্লোবাল
সাউথের জন্য নতুন ব্যবস্থা সামনে আসছে। ট্রাম্প বিশ্বের অন্যদের ওপর শুল্ক
বাড়ালেও চীন আফ্রিকা থেকে আমদানিতে শুল্ক বাদ দিয়েছে।
ট্রাম্প বিদেশি
সাহায্য কমিয়ে দিলেও চীন তার বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগে মনোযোগী হয়েছে।
ট্রাম্প একদিকে ভেনেজুয়েলা আক্রমণের হুমকি দিয়েছেন, অন্যদিকে শি বৈশ্বিক
নিরাপত্তায় ‘গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ’ চালু করেছেন। সব জায়গায়ই
যুক্তরাষ্ট্র ভূরাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানে হেরে যাচ্ছে। কিংবা বলা যায়, তার
এসব কর্মকাণ্ডের কারণে বিপদের মুখে আছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন নেতৃত্ব
প্রতিষ্ঠায় তার তথাকথিত নিয়মতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা হেরে গেছে। এ
ব্যবস্থাকে কারসাজি বলে ধরে নেওয়া হয়। বলা হয়, এ পদ্ধতি আন্তর্জাতিক আইনকে
পাশ কাটিয়ে পশ্চিমকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্তু এরপরও বহুমেরুকেন্দ্রিক
বিশ্বব্যবস্থা বিকল্প হিসেবে খুব উজ্জ্বল নয়, যেহেতু অন্যান্য শক্তি
শূন্যস্থান পূরণে চেষ্টা করছে। বহু দেশই শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায়
লিপ্ত এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষা এবং কে কার চেয়ে এগিয়ে, তা নিয়ে বিবাদে
জড়াতে পারে।
তারা একটি উন্নততর পৃথিবী তৈরিতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে
পারবে না। বরং উল্টো। শত্রুতানির্ভর ব্যবস্থা বিশ্বে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি
করতে পারে। পশ্চিমাদের নীতি প্রতিক্রিয়াশীল, তারা ঘটনার পর সিদ্ধান্ত নেয়।
অন্যদিকে চীনের নীতি পরিকল্পিত, তারা আগে থেকেই জানে, পরবর্তী দশকে কোথায়
দাঁড়াবে।’ তাদের এই কৌশলই চীনকে কূটনৈতিকভাবে এগিয়ে রাখছে। চীনের আরেকটি বড়
সাফল্য হলো নিজেকে ‘নন ইন্টারফেয়ারিং পাওয়ার’ হিসেবে উপস্থাপন করা। তারা
যেকোনো দেশের সঙ্গে কাজ করে, শর্ত আরোপ না করেই। এ কারণেই আফ্রিকা, লাতিন
আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এখন চীনের কাছাকাছি যেতে চাইছে। আজ যখন
যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন যুদ্ধে ক্লান্ত, ইউরোপ জ্বালানিসংকটে বিপর্যস্ত, তখন
চীন নীরবে নিজস্ব বৃত্তে প্রভাব বিস্তার করছে। একে কেউ বলছে, সাইলেন্ট
ডিপ্লোমেসি। আবার কেউ বলছে, সফট ডিপ্লোমেসি। তবে ফল একটাই, বিশ্ব রাজনীতির
মেরুকরণ বদলে যেতে শুরু করেছে।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, যুক্তরাজ্য
