শনিবার ২৭ জুন ২০২৬
১৩ আষাঢ় ১৪৩৩
আইনের অপব্যবহার রোধ করা জরুরি
সুলতানা কামাল
প্রকাশ: শনিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৫, ১:২২ এএম আপডেট: ০৪.১০.২০২৫ ১:৫৮ এএম |

 আইনের অপব্যবহার রোধ করা জরুরি

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তেমন একট না থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করে ঘোষণা দেওয়ায় দেশে একটি নির্বাচনি আমেজ চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ও মামলার সংখ্যা কমে গেলেও দুষ্কৃতকারী কর্তৃক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাসহ রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের অন্তর্দ্বন্দ্ব অব্যাহত রয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। 
নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতারোধে দেশে কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর ও দৃশ্যমান ভ‚মিকা দেখা যাচ্ছে না। ফলে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তাহীনতার জায়গাটি প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ সহিংসতার ম‚ল কারণ হিসেবে কাজ করছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। ফলে অপরাধীরা বারবার নৃশংস অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে। পারিবারিক সহিংসতার এ ভয়াবহ পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন দ্রæত ও কার্যকর পদক্ষেপ। 
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থাকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই আইনের ফাঁক গলে বের হতে না পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয় ভ‚মিকার কারণে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা একই ধারাবাহিকতায় ঘটেই চলেছে। যা নাগরিক জীবনে উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সনাতন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপ‚জা চলছে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্বিঘেœ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব পালনে প‚জার্থীদের আশ্বস্ত ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এর পরও আশঙ্কা ও উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। ইতোমধ্যে তা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। প‚জার প্রাক্কালে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আশ্বস্ত হওয়ার বিষয়টি দুরূহ হয়েছে।
কর্মসংস্থান হারানো ও প্রাপ্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হওয়ার হতাশা যখন তীব্র হয়, তখন শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম নেওয়া স্বাভাবিক। 
এ ক্ষোভ শান্তিপ‚র্ণ প্রতিবাদের রূপ নিতে পারত, যদি কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে সংলাপে বসত এবং সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট থাকত। কিন্তু তা না করে হঠাৎ কারখানা বন্ধ করে দেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত ভয়াবহ সহিংস ঘটনায় তিনজনের বিচারবহির্ভ‚ত হত্যা, গণধর্ষণ, কথিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা এবং বাজারের অসংখ্য দোকানপাটে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, যা দুঃখজনক ও স্থানীয় মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে আসামির মৃত্যুর বিষয়ের সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়া জনমনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক করে। প্রতিটি হেফাজতে মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া আবশ্যক। যেকোনো ব্যক্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করা আইনি দায়িত্ব, ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মানবাধিকার ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
নিবর্তনম‚লক সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিলের উদ্দেশ্যে অন্তর্র্বতী সরকার কার্যকর কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও এ আইনের অপব্যবহার অব্যাহত আছে। অধিকারকর্মী ও জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় এ অধ্যাদেশকে আগের তুলনায় উন্নত বললেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় কিছু বাধা রয়েই গেছে। সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে যেভাবে শারীরিক, মানসিক এবং আইনি হয়রানি, আক্রমণ, হুমকি ও লাঞ্ছিত করা হচ্ছে তা শুধু অনাকাক্সিক্ষতই নয় বরং সৎ সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দৃশ্যমান হচ্ছে না। এখনো মতপ্রকাশ ও তথ্যের স্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষিত হয়নি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি খুব গুরুত্বপ‚র্ণ। সাংবাদিকদের হত্যা বা নির্যাতনের ব্যাপারে দায়মুক্তির সংস্কৃতি লক্ষ করা গেছে। নতুন খসড়া আইনগুলোর মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিসর আবারও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অপরদিকে যখন সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, নির্যাতন, নিপীড়ন, মামলা, গ্রেপ্তার, সেন্সরশিপ বা ভীতি প্রদর্শনের সংস্কৃতি চালু হয়, তখন তা কেবল সংবাদপত্র নয়, বরং সমগ্র গণতান্ত্রিক সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে মানবাধিকার লংঘনের চিত্র ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। 
সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ করতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় সীমান্ত হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না বরং ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত রয়েছে। গত মাসে উভয় দেশের উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে সীমান্তে নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর গুলি চালানো, হত্যা, আহত বা মারধরের ঘটনা শ‚ন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে উভয়পক্ষ সম্মত হলেও সীমান্তে হত্যা, নির্যাতন ও ধরে নিয়ে যাওয়া বন্ধে অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও তা বন্ধ হচ্ছে না। সদ্যসমাপ্ত উভয় দেশের উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে সীমান্তে নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর গুলি চালানো, হত্যা, আহত বা মারধরের ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে সম্মত হয়েছে।
অপরদিকে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক পুশইন কার্যক্রম বাংলাদেশে সীমান্তবর্তী নাগরিকদের জীবনে আতঙ্ক ও ভীতি সৃষ্টি করেছে। যদিও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) পুশইন বিষয়টি অস্বীকার করে বলছে, বাংলাদেশি নাগরিক যারা স্বেচ্ছায় তাদের দেশে ফিরতে চাচ্ছে শুধু তাদের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে যাদের পাঠানো হচ্ছে তারা অধিকাংশ বহু বছর ধরে ভারতে বসবাস করে আসছিল। ভারতের একতরফা পদক্ষেপ স্বীকৃত প্রত্যাবাসন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির লঙ্ঘন।
ফলে সীমান্তে অস্থিতিশীল অবস্থা বিদ্যমান। এ ছাড়া সীমান্ত দিয়ে লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া বা পুশইন অব্যাহত রেখেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। 
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে এ ধরনের পুশইন অগ্রহণযোগ্য এবং তা পরিহার করা উচিত। গণমাধ্যমে জানা যায়, যাদের বাংলাদেশ ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, এদের মধ্যে অধিকাংশই বাংলাদেশি হলেও বহু বছর ধরে তারা ভারতে বসবাস করে আসছে, ভারতে তারা নিবন্ধিত এবং তাদের পরিচয়পত্রও রয়েছে। ভারতের এ ধরনের আচরণ মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
ভারত বারবার প্রতিশ্রæতি দিলেও সীমান্তে বিএসফএফের কর্মকাÐে বাংলাদেশি সীমান্তে বসবাসরত নাগরিকরা বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সীমান্তে হতাহতের ঘটনা কমে আসবে। অপরদিকে সরকার থেকে পুশইনের বিষয়ে প্রতিবাদ করা সত্তে¡ও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আশাব্যাঞ্জক প্রতিকার হচ্ছে না। সীমান্তে এ ধরনের ঘটনা কখনোই কাম্য হতে পারে না।
ধর্মীয় সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান মাজার ও আখড়ায় আক্রমণ করা হয়েছে। যা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুভ‚তির প্রতি অবমাননাকর। যদিও অন্তর্র্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে দেশে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা এবং সুফি মাজারে হামলাকারীদের দ্রæত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার কথা জানানো হয়েছিল। কার্যত এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। মাজার ও আখড়ায় হামলা মুক্তচিন্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব বহন করে, যা বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের অন্তরায়। 
মাজার শুধু কোনো ধর্মীয় স্থাপনা নয়, মাজার বা বাউল সংস্কৃতি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এসব স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুর বা বাউল সংস্কৃতিতে আক্রমণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে অন্তর্র্বর্তী সরকার স্থায়ীভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে মাজার ও লালন সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে রক্ষা করবে, এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
লেখক: সাবেক তত্ত¡াবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মানবাধিকার কর্মী













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
দেশে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী
চীন থেকে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
হামের প্রাণহানি ৭০০ ছাড়াল
শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তারেক রহমানের শুভেচ্ছা বিনিময়
সম্পর্ক উন্নয়‌নে ভার‌তের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ কী বার্তা দি‌চ্ছে?
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
কুমিল্লাকে যানজটমুক্ত করতে কুসিকের উচ্ছেদ অভিযান
কুমিল্লায় দুর্ঘটনার কবলে দুই ট্রেন
কুমিল্লা সীমান্তের অর্ধশতাধিক এলাকা দিয়ে ঢুকছে মাদক
কাটাবিলে মাদক ব্যবসায়ীদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ চলাকালে ষষ্ঠ শ্রেণিরশিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ
কুমিল্লার মুরাদনগরে হত্যা মামলার আসামির স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২