পৃথিবীতে আমাদের
ক্ষণস্থায়ী জীবনে শুধু একটি বিষয়েরই শতভাগ নিশ্চয়তা রয়েছে, আর তা হলো
মৃত্যু। মৃত্যু এমন এক বাস্তব সত্য, যা থেকে পালানোর কোনো পথ মানুষের নেই।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর
স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে। অন্য
আয়াতে এসেছে, তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদের স্পর্শ করবেই;
এমনকি তোমরা যদি সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গের ভেতরেও অবস্থান করো।
প্রশ্ন উঠতে
পারে, জীবন-মৃত্যু ও পুনরুত্থানের এই অন্তহীন চক্রের উদ্দেশ্য কী? যুগের পর
যুগ ধরে বড় বড় দার্শনিকদের মনে এই প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছে। তবে মানুষের
বুদ্ধিমত্তা দিয়ে অদৃশ্যের এই রহস্য ভেদ করা অসম্ভব। এর উত্তর শুধু তিনিই
দিতে পারেন, যার কাছে অদৃশ্যের চাবিকাঠি রয়েছে।
সূরা মুলক-এ আল্লাহ
বলছেন, যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন
যে, তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে কে সবচেয়ে উত্তম। আর তিনি পরাক্রমশালী,
ক্ষমাশীল।
ধরা যাক, আমরা যদি মাত্র কয়েক দিনের জন্য কোনো বিদেশি
রাষ্ট্রে সফরে যাই, তবে তার প্রস্তুতি নিতেই আমাদের সপ্তাহখানেক লেগে যায়।
কেনাকাটা, ব্যাগ গোছানো এবং প্রয়োজনীয় রসদ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন তোড়জোড় চলে।
তাহলে আমাদের যে চূড়ান্ত ও চিরস্থায়ী যাত্রার টিকিট নিশ্চিত হয়ে আছে, তার
জন্য আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু? এই যাত্রার সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো, আমরা
কেউই জানি না আমাদের কখন আসবে। এটা যেকোনো মুহূর্তে, এমনকি এখনই হতে পারে।
দুনিয়ার
জীবন ক্ষণস্থায়ী আর পরকাল চিরস্থায়ী। জান্নাতের অসীম নিয়ামত কিংবা
জাহান্নামের কঠিন শাস্তি—সবকিছুই হবে অনন্তকাল ধরে, যেখান থেকে ফিরে আসার
আর কোনো পথ থাকবে না। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো বর্তমান সময়কে কাজে লাগানো
এবং আজ থেকেই পরকালের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
কেয়ামতের দিনের অন্যতম একটি
নাম হলো ইয়াওমুল হাসরাহ, যার অর্থ অনুতাপ বা আফসোসের দিন। কখনো কি ভেবে
দেখেছেন, সেদিন যদি জান্নাতে যাওয়ার জন্য মাত্র একটি নেক আমল কম পড়ে, তবে
কেমন হবে সেই পরিস্থিতি? তখন হয়তো আমাদের আফসোস করে বলতে হবে, ইশ! যদি
ফজরের ঘুমের চেয়ে নামাজকে প্রাধান্য দিতাম, কিংবা যদি সেই ছোট গুনাহটি না
করতাম! শুধু এই ভাবনাটুকুই অন্তরকে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
অনেক
সময় আমাদের ইমান যখন খুব চাঙ্গা থাকে, তখন আমরা একসঙ্গে অনেক বেশি ভালো কাজ
করার চেষ্টা করি। তবে সামর্থ্যের অতিরিক্ত করতে গিয়ে একসময় আমরা হাঁপিয়ে
উঠি এবং পরে অলসতার কারণে ফরজ কাজগুলোও ঠিকঠাক করতে পারি না। এই পরিস্থিতি
এড়াতে আলেমরা তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন।
প্রথমত, নিজের নামাজকে ঠিক
করা। সময়মতো এবং নিয়মিত নামাজ পড়ার পাশাপাশি অন্তরে প্রশান্তি বা খুশু-খুজু
তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। সফল তো তারাই, যারা নিজেদের নামাজে বিনয়ী ও
নম্র।
দ্বিতীয়ত, একসঙ্গে অনেক ভালো কাজ করতে গিয়ে ক্লান্ত না হয়ে,
ভেতরকার খারাপ অভ্যাসগুলো একে একে দূর করা। একটি খারাপ অভ্যাসকে একটি ভালো
অভ্যাস দিয়ে প্রতিস্থাপন করা উচিত; যেমন লোভের জায়গায় দানশীলতা তৈরি করা।
তৃতীয়ত, সবসময় সৎ ও ভালো বন্ধুদের সাহচর্যে থাকা। কারণ মানুষ সাধারণত তার বন্ধুর আদর্শ দ্বারাই প্রভাবিত হয়।
একজন
প্রকৃত মুমিনের মূল লক্ষ্য থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। আল্লাহ যা
ভালোবাসেন, তা ভালোবাসা এবং আল্লাহ যা অপছন্দ করেন, তা থেকে দূরে থাকাই
ইমানের মূল ভিত্তি। আল্লাহর প্রতি এই ভালোবাসা তৈরি হয় আশা এবং ভয়ের
সমন্বয়ে।
বিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত ইবনুল কাইয়িম ইমানকে একটি পাখির সঙ্গে
তুলনা করেছেন, যার মাথা হলো ভালোবাসা আর দুই ডানা হলো আশা ও ভয়। একটি ডানা
ভেঙে গেলে বা ভারী হয়ে গেলে পাখি যেমন উড়তে পারে না, তেমনি আশা ও ভয়ের
ভারসাম্য না থাকলে মুমিনও তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না।
আল্লাহর প্রতি
ভালোবাসার গভীরতা নিয়ে শায়খ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ বলেছেন, আল্লাহর ভালোবাসা
হলো স্বয়ং জীবন, যা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অর্থ হলো এক ভয়ানক মৃত্যু। এটি এমন
এক আলো, যা ছাড়া মানুষ অন্ধকারের সমুদ্রে হারিয়ে যাবে। এটি অন্তরের সমস্ত
রোগের একমাত্র নিরাময় এবং এটিই ইমানের মূল নির্যাস। এই ভালোবাসা ছাড়া মানুষ
কখনো জান্নাতে পৌঁছাতে পারবে না।
আমাদের এই সীমিত সময়কে কাজে লাগিয়ে পরকালের চিরস্থায়ী আবাস সুন্দর করার এবং আল্লাহর প্রকৃত ভালোবাসা পাওয়ার তাওফিক দান করুন।
