এক টুকরো
মেঘলা আকাশ। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে ব্রাহ্মণপাড়া বাজারের এক কোণে
বসে আছেন ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে কোনো অবুঝ শিশু।
কিন্তু নিয়তির অমোঘ নিয়মে ২০ ইঞ্চির এক ছোট্ট শরীরে বন্দী হয়ে আছে এক লড়াকু
যুবকের অদম্য প্রাণ। তার নাম কামাল হোসেন।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যার
জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে এঁকে দিয়েছে সীমাহীন বাঁধা, সেই কামালই আজ টানছেন
এক পুরো পরিবারের চাকা। এটি কেবল বেঁচে থাকার লড়াই নয়, এটি এক বুক ভাঙা
আত্মসম্মান আর টিকে থাকার গল্প।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার
দুলালপুর ইউনিয়নের গোপালনগর গ্রামের হাসেম মৌলভী বাড়ির কৃষক আনোয়ার হোসেনের
ছেলে কামাল। ৩ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে কামাল অন্যতম। সমবয়সী আর দশটা ছেলের
মতো কামালও চেয়েছিল পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যেতে, পড়াশোনা করে বাবা-মায়ের
মুখ উজ্জ্বল করতে। কিন্তু বিধাতা তার পায়ে সেই শক্তি দেননি।
নিজে একা
দাঁড়াতে পারেন না কামাল। অন্যের সাহায্য ছাড়া একচুল নড়ার উপায় নেই। ঘরের
ভেতর খুব বেশি তাড়া থাকলে দু'হাতে ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিতে হয় তাকে। যে বয়সে
মাঠে ফুটবল নিয়ে মেতে ওঠার কথা, সেই বয়সে কামালের পৃথিবীটা থমকে গেছে মাত্র
২০ ইঞ্চির এক ছোট্ট অবয়বে।
কামালের বাবা আনোয়ার হোসেন একজন প্রান্তিক
কৃষক। রোদে পুড়ে, ঘাম ঝরিয়ে মাঠে যা ফলান, তা দিয়ে সাত জনের সংসারের
ভরণপোষণ চালাতেই হিমশিম খেতে হয় তাকে। ছেলের এই করুণ দশা দেখেও অর্থের
অভাবে উন্নত চিকিৎসা করাতে না পারার হাহাকার লুকিয়ে আছে তার চোখে-মুখে।
অশ্রুভেজা
চোখে কামালের বাবা বলেন "আমাদের তো কোনো রকমে খেয়ে-দেয়ে বেঁচে থাকতেই কষ্ট
হয়, ছেলের চিকিৎসা করাবো কোথা থেকে? যদি কিছু টাকা জোগাড় করতে পারতাম, তবে
ওকে শহরে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারতাম। কিন্তু সেই সামর্থ্য বা সুযোগ
কোনোদিন আমাদের হয়ে ওঠেনি।"
শারীরিক অক্ষমতা কামালকে পঙ্গু করতে পারলেও
তার ভেতরের লড়াকু মনটাকে দমাতে পারেনি। পরিবারের ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চান না
তিনি। তাই প্রতিদিন এক বুক কষ্ট আর লজ্জা চেপে ঘর থেকে বের হন কামাল।
নিজের
করুণ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে কামাল বলেন,"প্রতিদিন একটা রিকশা ভাড়া করে বাড়ি
থেকে ব্রাহ্মণপাড়া সদরে আসি। মানুষের কাছে হাত পেতে যা কিছু সাহায্য পাই,
তা নিয়ে দুপুর বা বিকেলে বাড়ি ফিরি। এই টাকাটা দিয়েই আমার পরিবার আর আমি
কোনো রকমে চলি। কিন্তু দিনগুলো সবসময় একরকম যায় না। মেঘ-বৃষ্টি বা বৈরী
আবহাওয়া থাকলে ঘর থেকে বের হতে পারি না। সেদিন ঘরে উনুন জ্বলবে কি না, তা
নিয়ে শঙ্কায় থাকতে হয়।"
কামালের এই কষ্টের জীবনে এক চিলতে আলোর মতো
এসেছিল একটি সরকারি প্রতিবন্ধী কার্ড। তবে তা কামালের এই বিশাল লড়াইয়ের
তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।
এ বিষয়ে দুলালপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি)
চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান ভূঁইয়া রিপন বলেন, "কামাল আমার ইউনিয়নেরই ছেলে,
তাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। গত বছর আমি নিজেই উদ্যোগী হয়ে তাকে একটি
প্রতিবন্ধী কার্ড করে দিয়েছি।" তবে কার্ডের সামান্য ভাতায় কামালের চিকিৎসা
বা সংসারের ব্যয়ভার বহন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।
