কুমিল্লায়
৩ জুন বিশ্ব ক্লাবফুট বা ‘মুগুর পা’ দিবসকে কেন্দ্র করে আক্রান্ত শিশুদের
শারীরিক ও সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির
লক্ষ্যে ১০ জুন বুধবার কুমিল্লার হাউজিং এস্টেট এলাকায় এক র্যালি ও অর্ক
কেয়ার সেন্টারের সভাকক্ষে সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন
সংস্থা ইউনাইটেড পারপাস-এর বাস্তবায়নে, মিরাকেলফিট-এর আর্থিক সহযোগিতায়
এবং অর্ক কেয়ার সেন্টারের সার্বিক সহায়তায় এই উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা হয়।
সকাল
১১টায় স্থানীয় যুব সমাজের প্রতিনিধি ও ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশুদের
অভিভাবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই আয়োজন সম্পন্ন হয়। এই দিনটি পালনের
অন্যতম আরেকটি উদ্দেশ্য হলো পরিবারগুলোর মধ্যে আশার বার্তা পৌঁছে দেওয়া,
কারণ ক্লাবফুট হলে ভয় নয়, সঠিক সময়ে চিকিৎসায় সম্পূর্ণ ভালো হয়।
সকালে
নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকায় র্যালিটি বের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ
করে। র্যালি শেষে সেন্টারের সভাকক্ষে ‘ওয়াক ফর লাইফ’ প্রকল্পের আওতায় একটি
বিশেষ সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে সরকারি ও বেসরকারি
পর্যায়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য কর্মী এবং স্থানীয় গণ্যমান্য
ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা ক্লাবফুট নিয়ে সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন
ভুল ধারণা ভেঙে সঠিক সময়ে চিকিৎসার ওপর জোর দেন।
আঞ্চলিক জনসংখ্যা
প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (আরপিটিআই), কুমিল্লা এর অধ্যক্ষ এবং সভার প্রধান
অতিথি মো. রিয়াজুল হক তার বক্তব্যে বলেন, "সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি
ইউনাইটেড পারপাস ও অর্ক কেয়ার সেন্টারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন সম্মিলিত
প্রয়াস জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে একটি বড় মাইলফলক। একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে
ওঠা নিশ্চিত করা আমাদের সবার সামাজিক দায়বদ্ধতা। তৃণমূল পর্যায়ে এ ধরনের
সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে কোনো শিশুই আর চিকিৎসার অভাবে পিছিয়ে
থাকবে না।"
সভার বিশেষ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের মেডিকেল অফিসার
(রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. প্রসেনজিৎ বিশ্বাস বলেন, "চিকিৎসক হিসেবে আমি
অভিভাবকদের দৃঢ়ভাবে আশ্বস্ত করতে চাই—মুগুর পা কোনো অভিশাপ নয়, এবং এটি
নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ারও কিছু নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন অনেক উন্নত। সচেতনতার
অভাবে অনেক শিশু সঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছায় না। অথচ একটু দ্রুত সঠিক
চিকিৎসা শুরু করলে এই শিশুরাও অন্য দশজন স্বাভাবিক শিশুর মতোই দৌড়ঝাঁপ করে
বেড়ে উঠতে সক্ষম হবে।"
ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর, ইউনাইটেড পারপাস এবং সভার
প্রধান ফ্যাসিলিটেটর সুমিত বণিক বলেন, "কুসংস্কার আর অজ্ঞতাই মূলত ক্লাবফুট
আক্রান্ত শিশুদের স্বাভাবিক জীবনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। আমাদের মূল লক্ষ্য
হলো কমিউনিটির একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে যুক্ত করে এই ভুল
ধারণাগুলো ভেঙে দেওয়া। অভিভাবক ও যুবসমাজ যখন একসাথে কাজ করবে, তখনই আমরা
একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বাধাহীন সমাজ গড়ে তুলতে পারবো।"
অর্ক কেয়ার
সেন্টারের পনসেটি প্র্যাকটিশনার ও ফিজিওথেরাপিস্ট মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন,
"ক্লাবফুট কোনো স্থায়ী পঙ্গুত্ব নয়। অনেকেই জানেন না যে, জন্মের পরপরই
'পনসেটি' নামক বিশ্বস্বীকৃত পদ্ধতির মাধ্যমে কোনো বড় অপারেশন ছাড়াই এর
সম্পূর্ণ ও নিরাপদ নিরাময় সম্ভব। আমাদের এই সেন্টারে আমরা প্রতিনিয়ত
শিশুদের এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুস্থ করে তুলছি। প্রয়োজন শুধু অভিভাবকদের
সঠিক সময়ে আমাদের কাছে আসা এবং ধৈর্য ধরে চিকিৎসা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন
করা।"
সভা শেষে অংশগ্রহণকারী অভিভাবকরা ক্লাবফুট সম্পর্কে অনেক অজানা
তথ্য জানতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেন। স্থানীয় যুব সমাজের প্রতিনিধি ও
অভিভাবকরাও আগামীতে তাদের নিজ নিজ এলাকায় এই সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার
ব্যক্ত করেন। 'ওয়াক ফর লাইফ' প্রকল্পের এমন উদ্যোগ কুমিল্লা অঞ্চলের
ক্লাবফুট নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সংশ্লিষ্টরা
আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
