বিবাহ ও অবিবাহিত জীবন প্রসঙ্গে
ফ্রান্সিস বেকন

অনুবাদ: আলমগীর মোহাম্মদ ।।
যে ব্যক্তির স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে, সে যেন ভাগ্যের কাছে নিজেকে বন্ধক রেখেছে; কারণ তারা মহৎ কর্মোদ্যোগের পথে বাধা স্বরূপ, তা সে পুণ্য কাজই হোক বা অশুভ কোনো কর্ম। প্রকৃতপক্ষে জনহিতকর সর্বোত্তম ও সবচেয়ে গৌরবময় কাজগুলো অবিবাহিত বা নিঃসন্তান ব্যক্তিদের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে; যারা অনুরাগে এবং সামর্থ্যে—উভয় দিক থেকেই সমাজকে আপন করে নিয়েছেন এবং জনকল্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন। তবুও যুক্তির খাতিরে এটি বলা সংগত যে, যাদের সন্তান আছে, ভবিষ্যৎ সময়ের প্রতি তাদের অধিক যত্নশীল হওয়া উচিত; কারণ তারা জানে যে তাদের সবচেয়ে প্রিয় আমানতগুলো (সন্তানদের) ভবিষ্যতের হাতেই সঁপে দিয়ে যেতে হবে।
কিছু মানুষ এমন আছেন, যারা অবিবাহিত জীবন যাপন করলেও তাদের সমস্ত ভাবনা কেবল নিজেদের ঘিরেই সমাপ্ত হয় এবং ভবিষ্যৎ সময়কে তারা তুচ্ছ জ্ঞান করেন। আবার কেউ কেউ স্ত্রী-সন্তানকে নিছক খরচের বোঝা মনে করেন। এমনকি কিছু নির্বোধ, ধনী ও লোভী ব্যক্তি সন্তান না থাকাকে গর্বের বিষয় মনে করেন, যাতে লোকে তাদের আরও বেশি ধনী ভাবে। হয়তো তারা কাউকে বলতে শুনেছেন, "অমুক ব্যক্তি তো বিশাল ধনী," এবং অন্য কাউকে তার উত্তরে বলতে শুনেছেন, "হ্যাঁ, কিন্তু তার তো পালের মতো এক গাদা সন্তান রয়েছে;" যেন সন্তান থাকাটা তার সম্পদের জন্য এক বড় ঘাটতি।
তবে অবিবাহিত থাকার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো স্বাধীনতা—বিশেষ করে এমন কিছু আত্মতৃপ্ত ও খামখেয়ালি মনের মানুষের ক্ষেত্রে, যারা যেকোনো প্রকার শাসনে এতই বিচলিত হন যে, নারীর পোশাকের সামান্য বন্ধনীকেও তারা শেকল বা বেড়ি বলে মনে করেন। অবিবাহিত পুরুষেরা শ্রেষ্ঠ বন্ধু, শ্রেষ্ঠ মালিক এবং শ্রেষ্ঠ সেবক হয়ে থাকেন; কিন্তু তারা সর্বদা শ্রেষ্ঠ প্রজা হন না; কারণ পলায়ন করা তাদের জন্য সহজ এবং প্রায় সব পলায়নপর ব্যক্তিই এই অবিবাহিত শ্রেণির।
ধর্মযাজকদের জন্য অবিবাহিত জীবন মঙ্গলকর। কারণ যে দাক্ষিণ্যের জল আগে নিজের ঘরের চৌবাচ্চা পূর্ণ করতে হয়, তা দিয়ে বাইরের তৃষ্ণার্ত ভূমিকে সিঞ্চিত করা কঠিন। বিচারক এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষেত্রে এটি নিরপেক্ষ বিষয়; কারণ তারা যদি আপসকামী ও দুর্নীতিগ্রস্ত হন, তবে স্ত্রীর চেয়ে পাঁচ গুণ অধম দাসের মতো আচরণ তারা করবেন। সৈনিকদের ক্ষেত্রে আমি দেখেছি যে, সেনাপতিরা সাধারণত রণক্লান্ত সেনাদের তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের কথা মনে করিয়ে দিয়ে উৎসাহিত করেন; আর আমার মনে হয় তুর্কিদের মধ্যে বিবাহের প্রতি অবজ্ঞা সাধারণ সৈনিকদের আরও নীচ বা হীনবল করে তোলে।
নিশ্চয়ই স্ত্রী ও সন্তান হলো মানবিকতার এক প্রকার পাঠ বা শৃঙ্খলা; অবিবাহিত পুরুষেরা যদিও অনেক সময় অধিক দানশীল হন (যেহেতু তাদের সম্পদ কম ব্যয় হয়), তবুও অন্যদিকে তারা অধিক নিষ্ঠুর ও কঠোর হৃদয়ের হয়ে থাকেন। কারণ তাদের কোমল অনুভূতিগুলো সচরাচর জাগ্রত করার প্রয়োজন পড়ে না। গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ, যারা প্রথা দ্বারা চালিত এবং স্বভাবে স্থির, তারা সাধারণত প্রেমময় স্বামী হয়ে থাকেন; যেমনটি ইউলিসিস সম্পর্কে বলা হয়েছিল-াবঃঁষধস ংঁধস ঢ়ৎধবঃঁষরঃ রসসড়ৎঃধষরঃধঃর [তিনি অমরত্বের চেয়ে তাঁর বৃদ্ধা স্ত্রীকেই অধিক পছন্দ করেছিলেন]।
সতী মহিলারা অনেক সময় অহংকারী ও অবাধ্য হন, কারণ তারা তাদের সতীত্বের গুণ নিয়ে গর্ববোধ করেন। স্ত্রীর সতীত্ব ও আনুগত্য বজায় রাখার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায় হলো স্বামীর বিজ্ঞতা; স্ত্রী যদি স্বামীকে ঈর্ষাপরায়ণ মনে করে, তবে সে কখনো তাঁকে জ্ঞানী বলে মান্য করবে না। স্ত্রী হলো তরু বয়সে প্রেমিকা, মাঝবয়সে সঙ্গিনী এবং বৃদ্ধ বয়সে সেবিকা। সুতরাং একজন মানুষ যখনই ইচ্ছা বিবাহ করার একটি অজুহাত খুঁজে পেতে পারেন। তবুও সেই জ্ঞানীদের মধ্যে একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন, যিনি এই প্রশ্নের উত্তরে-কখন একজন মানুষের বিবাহ করা উচিত—বলেছিলেন: "তরুণদের জন্য এখনই নয়, আর বৃদ্ধদের জন্য একদমই নয়।"
প্রায়ই দেখা যায় যে, লম্পট বা মন্দ স্বামীদের স্ত্রীরা খুব ভালো চরিত্রের হন; এটি কি এই কারণে যে স্বামীর কদাচিৎ দেখানো দয়া বা সদয় ব্যবহারের মূল্য তাদের কাছে বেড়ে যায়, নাকি ওই স্ত্রীরা তাদের ধৈর্যের প্রতি এক প্রকার গর্ব অনুভব করেন? তবে এই বিষয়টি কখনো ব্যর্থ হয় না যদি ওই মন্দ স্বামীরা তাদের নিজেদের পছন্দের হয় (বন্ধুবান্ধবের অমতে নির্বাচিত); কারণ তখন তারা নিজেদের সেই বোকামিকে সঠিক প্রমাণ করতেই আপ্রাণ চেষ্টা করেন।
অদৃশ্য আবরণ
আরিফুজ্জামান চৌধুরী ।।
বিকেলের তপ্ত রোদ যখন মরে আসছে, তখন নীরবপুর গ্রামের ধুলোমাখা রাস্তায় এসে নামল আরিব। তার পরনে শহরের দামী পোশাক, চোখে দামী সানগ্লাস। তার চেহারায় এক ধরণের তাচ্ছিল্যের হাসি মাখানো। আরিবের কাছে পৃথিবীটা খুব সহজ—এখানে যার বুদ্ধিবেশি, জয় তারই। আর বুদ্ধি মানেই হলো অন্যকে ঘোল খাইয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়া। গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোকে ‘বিনিয়োগ’ আর ‘উন্নয়নের’ নাম করে এক বিশাল প্রতারণার জালে ফেলতে এসেছে সে।
বাসস্ট্যান্ডের পাশে একটা প্রাচীন বটগাছ। সেই গাছের নিচে এক বৃদ্ধ বসে ছিলেন, যার নাম হাকিম রওশন। লোকটা যেন মাটির সাথে মিশে আছেন। আরিব যখন পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল, বৃদ্ধ হঠাত বলে উঠলেন, “বড্ড ভারি হয়ে এসেছ তো বাবা! এই বয়সে এত ওজন তো সহ্য হওয়ার কথা নয়।”
আরিব থমকে দাঁড়িয়ে নিজের ব্যাগের দিকে তাকালো। “ভারি মানে? ব্যাগে মোটে কয়েকটা জামা আর ল্যাপটপ। আপনার বয়স হয়েছে, চোখের মাথা খেয়েছেন বোধহয়।”
হাকিম রওশন হাসলেন না। তার স্বচ্ছ নীল চোখ দুটো যেন আরিবের ভেতরে থাকা কুৎসিত সত্তাটাকে দেখতে পাচ্ছিল। তিনি শান্ত গলায় বললেন, “আমি তোমার পিঠের ব্যাগের কথা বলছি না বাবা। আমি বলছি তোমার চারপাশের ওই কালো ধোঁয়াটার কথা। প্রতিটি মিথ্যে আজ আঠার মতো তোমার শরীরে লেপ্টে আছে। তুমি যত হাঁটছ, চারপাশের বাতাসকে তত বিষাক্ত করছ।”
আরিব বিড়বিড় করে ‘পাগল’ বলে গটগট করে মেম্বার বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। কিন্তু তার অবচেতনে কোথাও একটা খচখচানি শুরু হলো। সত্যিই কি বাতাসটা ভারি? সে যখন মেম্বার লতিফ মিয়ার সাথে কথা বলছিল, বারবার তার মনে হচ্ছিল তার ঘাড়ের কাছে কেউ যেন অদৃশ্য এক দলা কাদা লেপে দিয়েছে। লতিফ মিয়া লোভী মানুষ, আরিবের ‘ডাবল মুনাফার’ গল্প শুনে সে গদগদ হয়ে উঠল। গ্রামের লোকদের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা যখন পাকা হচ্ছিল, আরিবের ঘরের আয়নায় এক অদ্ভুত ছায়া পড়ল। সে দেখল তার চেহারার চারপাশে একটা কালচে কুয়াশা। হাত দিয়ে মুছতে গেল সে, কিন্তু হাতটা যেন এক অদৃশ্য আঠালো দেয়ালে আটকে গেল।
পরদিন সকালে আরিব যখন গ্রামের বাজারে কৃষকদের বোঝাচ্ছিল কীভাবে তাদের সঞ্চয় দ্বিগুণ হবে, তখন সে লক্ষ্য করল মেম্বারের ছোট্ট মেয়ে টুনী তার দিকে তাকিয়ে কাঁদছে। আরিব অবাক হয়ে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে টুনী? কাঁদছো কেন?”
টুনী ভয়ার্ত চোখে আরিবের কাঁধের ওপরের শূন্যস্থানের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার পিঠে ওটা কী ভাইয়া? একটা কালো দৈত্য আপনার গলা জড়িয়ে ধরে আছে। ওটা আপনাকে কামড় দিচ্ছে!”
আরিব শিউরে উঠল। সে নিজের কাঁধে হাত দিল, কিন্তু সেখানে কিছুই নেই। অথচ টুনীর চোখে যে আতঙ্ক, তা কোনো মিথ্যা হতে পারে না। সে বুঝতে পারল, হাকিম রওশন যা বলেছিলেন তা কোনো পাগলামি নয়। মানুষের প্রতিটি অসৎ চিন্তা, প্রতিটি কু-পরিকল্পনা তার শরীরের চারপাশে এক একটি আবরণ তৈরি করে। ভালো মানুষের আবরণ হয় স্বচ্ছ এবং হালকা, যা তাদের মনে শান্তি দেয়। আর আরিবের মতো মানুষদের আবরণ হয় আলকাতরার মতো কালো এবং সিসার মতো ভারি।
দিনের পর দিন যেতে লাগল। আরিবের প্রজেক্টে প্রচুর টাকা জমা হতে লাগল। কিন্তু আরিবের অবস্থা করুণ হতে শুরু করল। সে এখন ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারে না। তার মনে হয় তার চারপাশের বাতাসটা জমে পাথর হয়ে গেছে। সে যখন খেতে বসে, মনে হয় খাবারের প্রতিটি দানা বালি হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের কুকুরগুলো তাকে দেখলে এমনভাবে চিৎকার করে যেন কোনো অভিশপ্ত আত্মাকে দেখছে। আরিব আয়নায় নিজের দিকে তাকাতে ভয় পায়। তার সুশ্রী চেহারাটা এখন সেই অদৃশ্য কালচে আবরণের নিচে ঢাকা পড়ে গেছে। সে যত মিথ্যে বলছে, সেই আবরণ তত পুরু হচ্ছে।
একদিন রাতে আরিব সহ্য করতে না পেরে হাকিম রওশনের কুটিরে গিয়ে হাজির হলো। সে পা জড়িয়ে ধরল বৃদ্ধের। “বাঁচান আমাকে! আমি আর এই ভার সইতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে এক পাহাড় পাথর আমার বুকে চেপে বসেছে।”
হাকিম রওশন তাকে তুলে বসালেন। বললেন, “এই আবরণ তোমার নিজের তৈরি আরিব। তুমি যাদের ঠকিয়েছ, তাদের দীর্ঘশ্বাস আর তোমার নিজের পাপ মিলে এই কারাগার বানিয়েছে। একে কাটানোর কোনো মন্ত্র আমার কাছে নেই।”
“তাহলে আমি কী করব? আমি কি এভাবেই মরে যাব?” আরিবের কণ্ঠে হাহাকার।
রওশন সাহেব ইশারায় আকাশের দিকে দেখালেন। “একমাত্র সত্য এবং অনুশোচনা পারে এই আবরণকে গলিয়ে দিতে। তুমি যা কেড়ে নিয়েছ, তা ফিরিয়ে দাও। যে অন্ধকার তুমি ছড়িয়েছ, সেখানে আলো জ্বালো। প্রতিটি ভালো কাজ তোমার এই আস্তরণকে পাতলা করবে।”
পরদিন ভোরে আরিব এক অভাবনীয় কাজ করল। সে মেম্বারকে ডেকে বলল সে আর এই কাজ করবে না। গ্রামের সব মানুষকে ডেকে সে সত্যটা কবুল করল। সে যে তাদের টাকা মেরে দেওয়ার ফন্দি এঁটেছিল, তা খোলাখুলি বলে দিল। মানুষের ভিড় থেকে ধিক্কার এল, মেম্বার লতিফ তাকে অপমান করে গ্রাম থেকে বের করে দিল। আরিব তার সব জমানো টাকা মানুষের হাতে ফিরিয়ে দিল। এমনকি নিজের দামী ল্যাপটপ আর ঘড়িটা পর্যন্ত গ্রামের এতিমখানার জন্য দিয়ে দিল।
সে যখন গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে আসছে, তার পকেটে একটা টাকাও নেই। কিন্তু অদ্ভুত এক হালকা অনুভূতি তার শরীরে। সে দেখল তার হাতের সেই চটচটে ভাবটা নেই। সে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারছে। বাতাসের গন্ধটা আজ কত মিষ্ট!
গ্রামের সীমানায় আবার সেই বটগাছ। হাকিম রওশন সেখানেই বসে ছিলেন। আরিব যখন তার সামনে দাঁড়াল, বৃদ্ধ এক গাল হাসলেন। “এখন অনেক স্বচ্ছ লাগছে তোমাকে। তোমার চারপাশের আবরণটা এখন আর কালো নেই, বরং ভোরের আলোর মতো উজ্জ্বল হতে শুরু করেছে। মনে রেখো আরিব, আমরা যা দিই, পৃথিবী আমাদের তাই ফিরিয়ে দেয়।”
আরিব মাথা নিচু করে বিদায় নিল। সে শহরের দিকে হাঁটছে না, সে হাঁটছে এক নতুন জীবনের দিকে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে একটা বাস এসে থামল নীরবপুর স্ট্যান্ডে। বাস থেকে নামল এক যুবক, ঠিক যেমনটা আরিব নেমেছিল কয়েক সপ্তাহ আগে। তার চোখেও সেই একই শিকারী দৃষ্টি, ঠোঁটে সেই একই অহংকারী হাসি।
আরিব বৃদ্ধের দিকে তাকাতেই দেখলেন, হাকিম রওশন ম্লান হাসছেন। তিনি নতুন আসা যুবকের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, “বড্ড ভারি হয়ে এসেছ তো বাবা! হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে না?”
চক্রটি আবার শুরু হলো। আরিব দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের স্বচ্ছ আবরণের হালকা আমেজ নিয়ে অজানার পথে পা বাড়াল। সে এখন জানে, মানুষের আসল পোশাক তার কাপড় নয়, বরং তার চিন্তার সেই অদৃশ্য আবরণ।
বিমূর্ত সময়ের বিধুরতা
সফিকুল বোরহান ।।
শীতের সকালগুলোতে আলো একটু ভিন্নরকম হয়- নরম, সংযত, যেন তাড়াহুড়ো নেই কোথাও।
খুলনার রূপসা ঘাটে সেইরকম এক সকালে দাঁড়িয়েছিল মুমু। নদীর জলে আলো ভেঙে ভেঙেপড়ছে, কুয়াশার আবরণ এখনও পুরোপুরি সরে যায়নি।হালকা নীল শাড়িতে তাকে দূর থেকে যেন স্থির এক ছবির মতো লাগছিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরেসে স্থির ছিল না। দীর্ঘ কর্মজীবন তাকে দিয়েছে প্রতিষ্ঠা, সম্মান, পরিচিতি- কিন্তু সেইপ্রাপ্তির আড়ালে কোথাও যেন জমে ছিল অদৃশ্য এক শূন্যতা।তার পাশেই দাঁড়িয়ে পলাশ। সময়ের ব্যবধানে বদলে যাওয়া এক পরিচিত মুখ। বিশ্ববিদ্যালয়েরসেই উদাসী ছেলেটি আজ পরিণত, প্রতিষ্ঠিত একজন প্রকৌশলী। দুজনের জীবন আলাদাস্রোতে বয়ে গেছে, কিন্তু আজ তারা আবার এসে দাঁড়িয়েছে একই তীরে- বিশ বছর পর,একসাথে সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে।
‘কি ভাবছো?’ পলাশের কণ্ঠে মৃদু সুর।মুমু তাকাল না। নদীর দিকেই চোখ রেখে বলল, ‘ভাবছি, সময় কেমন নিঃশব্দে বদলে দেয়সবকিছু। আমরা টেরও পাই না।’
ভ্রমণতরী ছেড়ে দিল। নদী ধীরে ধীরে তাদের আপন করে নিল। পশুর নদীর জলে সূর্যের আলোঝিকমিক করছে। দুই পাশে সবুজের ঘনত্ব, মাঝে মাঝে জেলেদের নৌকা- সব মিলিয়ে একঅচেনা, অথচ গভীরভাবে আপন পৃথিবী।
পলাশ আবার বলল, ‘মনে আছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো?’মুমুর ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। ‘তুমি বলতে, একদিন পৃথিবীর সব সুন্দর জায়গাঘুরে দেখবে।’
‘আর তুমি বলতে, শিক্ষকতা করবে- মানুষকে আলো দেখাবে।’স্মৃতিগুলো যেন হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠল। সময় তাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু মুছেফেলতে পারেনি।
সুন্দরবনের ভেতরে প্রবেশ করতেই পৃথিবীর রং বদলে গেল। মাথার উপর সবুজের ছায়া, পানিরউপর শ্বাসমূলের নীরব বিস্তার, বাতাসে লবণাক্ততার গন্ধ- সব মিলিয়ে এক আদিম, অনাবিল অনুভূতি।
‘দেখো!’ মুমুর কণ্ঠে হঠাৎ শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস। ‘ওখানে চিত্রা হরিণ!’
পলাশ তাকিয়ে রইল তার দিকে। এত বছর পরও এই উচ্ছ্বাস অমলিন- এটাই কি তাকে আলাদা করে?
প্রথম দিন কটকা বিচে কাটল। লাল কাঁকড়ার অবিরাম চলাচল, ডুবন্ত সূর্যের রঙে রাঙা
আকাশ-প্রকৃতি যেন নিজেই এক দীর্ঘ কবিতা আবৃত্তি করছিল।
রাতে, নিস্তব্ধতার মধ্যে, চায়ের কাপ হাতে মুমু হঠাৎ বলল, ‘পলাশ, কখনও মনে হয় না- আমরাবেঁচে আছি’।
প্রশ্নটা হালকা ছিল না। পলাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
‘তুমি এখনও স্বপ্ন দেখো?’ জিজ্ঞেস করল।মুমু উত্তর দিল না। হয়তো উত্তরটা সে নিজেও জানত না।
দ্বিতীয় দিনের সকাল তাদের নিয়ে গেল হিরণ পয়েন্টে। সামনে বিস্তৃত সমুদ্র- অসীম,অবাধ, অনিশ্চিত।
পলাশ ধীরে বলল, ‘একটা কথা বলব?’
মুমু তাকাল।
‘আমি সবসময় তোমাকে ভালোবেসেছি।’
শব্দগুলো খুব জোরে বলা হয়নি, তবু তাদের ভারিক্কি ছিল অনেক।
মুমু চোখ সরিয়ে নিল। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। তারপর বলল, ‘আমিজানতাম। আমিও... কিন্তু তখন মনে হয়েছিল, আমাদের পথ আলাদা। প্রেম হয়তো আমাদেরআটকে দেবে।’
পলাশের কণ্ঠে নিঃশ্বাসের মতো নরম প্রশ্ন-
‘এখনও কি তাই মনে হয়?’
মুমু এবার তার দিকে তাকাল।
‘এখন মনে হয়, আমরা অনেক কিছু পেয়েছি- কিন্তু কিছু একটা ফেলে এসেছি।’
সেদিন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কিন্তু তাদের নীরবতা বদলে গিয়েছিল- অপরিচিত দ্বিধাথেকে পরিচিত স্বীকারোক্তিতে।
তৃতীয় দিন দুবলার চর। জেলেদের সহজ জীবন, প্রকৃতির সাথে মিশে থাকা তাদেরঅস্তিত্ব- সবকিছুই যেন প্রশ্ন তুলে দেয় শহুরে জটিলতার বিরুদ্ধে। রাতে, নৌকার ডেকেবসে তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। শহরের আলোহীন সেই আকাশে তারারা যেন অনেককাছাকাছি।
মুমু ধীরে বলল, ‘আমি আর অপেক্ষা করতে চাই না।’
পলাশ কিছু বলল না।
‘আমরা কি নতুন করে শুরু করতে পারি?’
পলাশ এবার তার হাত ধরল। ‘আমি তো সেই অপেক্ষাতেই ছিলাম।’
নদী তখনও বয়ে চলছিল- নিঃশব্দ সাক্ষীর মতো।
ফিরে আসার পর জীবন বদলাল, কিন্তু হঠাৎ নয়- ধীরে, স্বাভাবিক ছন্দে।
মুমু খুলনায় বদলি নিল। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ- তবু এবার তার ভেতরে এক অদ্ভুতস্থিরতা।
পলাশও তার ব্যস্ততার ভেতর ফাঁক তৈরি করল- যেখানে সময় থাকবে, সম্পর্ক থাকবে।
ছয় মাস পর, শীতের এক নরম বিকেলে, তাদের বিয়ে হল। জাঁকজমক ছিল না, ছিল না
আনুষ্ঠানিকতার ভার- শুধু ছিল আন্তরিকতা আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার স্বীকৃতি।
পরদিন ভোরে তারা নদীর ধারে হাঁটতে গেল। সূর্য তখন ধীরে ধীরে উঠছে।
মুমু বলল, ‘আজ মনে হচ্ছে, এতদিন আমরা জীবনকে দেখেছি। আজ থেকে আমরা তারভেতরে বাস করব।’
এক বছর পর তারা আবার ফিরে এল সুন্দরবনে। হিরণ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে মুমু অনেকক্ষণ চুপকরে রইল। তারপর বলল, ‘একসময় মনে হয়েছিল, জীবন অসম্পূর্ণ।’
পলাশ তাকাল।
‘এখন মনে হয়, অসম্পূর্ণতাই হয়তো আমাদের এগিয়ে নিয়ে এসেছে।’
পলাশ হেসে বলল, ‘পূর্ণতা মানে তো থেমে যাওয়া নয়। আমাদের এখনও পথ বাকি।’
‘যেমন?’
‘আমরা যদি এখানে একটা স্কুল করি- যেখানে প্রকৃতিই হবে শিক্ষক?’
মুমুর চোখে আবার সেই আলো ফিরে এল।
‘তাহলে আমরা শুধু নিজেদের জন্য বাঁচব না- অন্যদের জন্যও কিছু রেখে যাব।’
শুরুটা ছিল খুব ছোট। কয়েকজন শিশু, একটি সাধারণ ঘর, আর দুইজন মানুষের অদম্য
ইচ্ছা। মুমু তাদের পড়াত- কিন্তু বইয়ের বাইরে গিয়ে, প্রকৃতির ভেতর থেকে। পলাশ গড়ে তুলত
কাঠামো- কিন্তু কংক্রিটের নয়, টেকসই স্বপ্নের।
বছর কেটে গেল। ছোট সেই উদ্যোগ একসময় পরিচিত হয়ে উঠল- একটি স্বপ্নের বাস্তবরূপ হিসেবে।
অনেক বছর পর, এক সন্ধ্যায়, তারা আবার নদীর ধারে বসে। চুলে সময়ের ছাপ, চোখেপ্রশান্তি।
মুমু ধীরে বলল,
‘এখন আর কোনো শূন্যতা নেই।’
পলাশ তার হাত ধরল। ‘কারণ আমরা শুধু সময় পার করিনি- আমরা তাকে অর্থবোধক করতেপেরেছি।’
দূরে একটি পানকৌড়ি উড়ে গেল। নদী তার নিজস্ব ছন্দে বয়ে চলল। সুন্দরবনের মতোই তাদেরপ্রেম- নীরব, গভীর, এবং সময়ের সাথে আরও দৃঢ়।
লেখক: কথাসাহিত্যিক
অন্বেষা, রানির দিঘির পূর্ব পাড়, কুমিল্লা