ইরান
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় বিশ্বের প্রথম দেশ
হিসেবে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশ। এমন শঙ্কা
প্রকাশ করেই বুধবার (১ এপ্রিল) সংবাদ প্রচার করেছে প্রভাবশালী ব্রিটিশ
সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
প্রতিদিন কাজের জন্য ২২ কিলোমিটার যাতায়াত
করেন মাজিদ আলী। মোটরসাইকেলের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি পেতে তাকে দুই ঘণ্টা
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তিনি বাংলাদেশের লাখো মানুষের একজন, যারা ঢাকাসহ
দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত ফিলিং স্টেশনের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। এর
পেছনে কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক মাসব্যাপী ইরান যুদ্ধ,
যার প্রভাবে দেশের জ্বালানি মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে।
মোটরসাইকেল চালক ও
বিভিন্ন পরিবহনের চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সারা রাত
অপেক্ষা করতে হচ্ছে সীমিত পরিমাণ জ্বালানি পাওয়ার জন্য। অনেক ফিলিং স্টেশন
জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার পর বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে গেট বন্ধ করে দিয়েছে।
কোথাও কোথাও জ্বালানি সরবরাহ যন্ত্র নীল প্লাস্টিক দিয়ে মুড়ে বেঁধে রাখা
হয়েছে, যা সরবরাহ সংকটের তীব্রতা নির্দেশ করে বলে দাবি করেছে ব্রিটিশ
বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
৩৩ বছর বয়সী বেসরকারি চাকরিজীবী মাজিদ আলী বলেন,
এই মোটরসাইকেলই আমার যাতায়াতের একমাত্র সুবিধাজনক উপায়, কিন্তু অকটেন ছাড়া
আমি কীভাবে চলব? তিনি ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেন, আমি ভাগ্যবান যে তেল পেয়েছি।
আমার পেছনে থাকা ডজনখানেক চালককে খালি হাতে ফিরে যেতে হয়েছে, কারণ পাম্পে
জ্বালানি শেষ হয়ে যায়।
বর্তমানে রাজধানী ঢাকার স্বাভাবিকভাবে যানজটে ভরা
সড়কগুলোতে আগের তুলনায় কম যানবাহন দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর বাইরে পরিস্থিতি
আরও গুরুতর। সেখানে এক থেকে দুই লিটার করে ছোট প্লাস্টিক বোতলে বেশি দামে
অনানুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি বিক্রি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফেব্রুয়ারির
শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পারস্য
উপসাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি
অধিকাংশ জাহাজের জন্য বন্ধ রয়েছে কি না- এ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই জ্বালানির
দাম বেড়ে গেছে। এশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই প্রণালি দিয়েই
পরিবাহিত হয়।
১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশ বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
নবনির্বাচিত
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার, যার নেতৃত্বে রয়েছেন
তারেক রহমান, এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং জ্বালানি
ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কার মধ্যে সরকার চরম চাপে রয়েছে।
সংবাদমাধ্যমটির
প্রতিবেদনে বলা হয়ছে, 'দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড'-এর তথ্য অনুযায়ী, ৪
মার্চের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ডিজেল মজুত কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার
৪৭৩ টনে, যা প্রায় নয় দিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। অন্যদিকে, অকটেনের মজুত
কমে ২৮ হাজার ১৫২ টনে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় দুই সপ্তাহের চাহিদা পূরণ করতে
পারবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এপ্রিল মাসে ভারতের নুমালিগড়
রিফাইনারি থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি করতে যাচ্ছে, যা মার্চ
মাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও গ্যাস আমদানির জন্য বাংলাদেশ ২৫০ কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক সহায়তা খুঁজছে।
যুদ্ধের
কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায় নতুন সরকার এরই
মধ্যে যানবাহনের জন্য জ্বালানি রেশনিং, ডিজেল বিক্রিতে বিধিনিষেধ আরোপ ও
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসের শেষ দিকে
দেশের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রায় ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুত ছিল, যা
দিয়ে মাত্র দুই সপ্তাহের কিছু বেশি সময় চাহিদা পূরণ সম্ভব। ডিজেলের মজুতও
একইভাবে চাপে রয়েছে।
এখন সরকার সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া,
আজারবাইজান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি
বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে। তাছাড়া ভারতের মতো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে
নিষেধাজ্ঞা শিথিলতার আওতায় অস্থায়ী ছাড় চেয়েছে বাংলাদেশ, যাতে রাশিয়া থেকে
ডিজেল আমদানি করা যায়।
বাংলাদেশ সরকারের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না
করার শর্তে বলেন, পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। স্পট বাজার থেকে কেনাকাটা আমাদের
রিজার্ভ খালি করে দিচ্ছে, কিন্তু সরকারের কোনো উপায় নেই। আমাদের কাছে ১০
দিনেরও কম জ্বালানি মজুত আছে।
দেশটি অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখতে
ব্যয়বহুল স্পট বাজার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উচ্চ দামে কিনছে। টানা
দুই দিনের প্রচেষ্টার পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা বুধবার (২৫
মার্চ) দুই চালান গ্যাস কিনতে সক্ষম হয়েছে, যার দাম ১ মার্চের তুলনায় প্রায়
আড়াই গুণ বেশি।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন
তিনটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল পাচ্ছে
এবং চলতি মাসে আরও ৯০ হাজার মেট্রিক টন আসার কথা রয়েছে বলে রয়টার্সকে
জানিয়েছেন দুই জ্বালানি কর্মকর্তা।
বিশ্বব্যাপী গবেষণা প্রতিষ্ঠান
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের
জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর
অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ এশিয়ার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হতে
পারে।
টেলিগ্রাফ এক বাংলাদেশি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, যুদ্ধ
দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কার্যত স্থবির হয়ে পড়তে
পারে।
তবে সরকার দাবি করছে, হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ থাকা সত্ত্বেও দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই।
দেশটির
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, স্পষ্ট করে বলতে চাই, এই
মুহূর্তে বাংলাদেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। বরং গত বছরের তুলনায় সরবরাহ
বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনানুষ্ঠানিক সিন্ডিকেটও সংকটকে আরও বাড়িয়ে
তুলছে, যারা সরবরাহ সরিয়ে নিচ্ছে এবং বাজারে জ্বালানি আটকে রাখছে। আবার
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তার
পুনরাবৃত্তির আশঙ্কায় মানুষ আতঙ্কে জ্বালানি কিনে মজুত করছে, যা
পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির যুগ্ম
আহ্বায়ক মিজনুর রহমান রতন বলেন, আমরা সীমিত সরবরাহ পাচ্ছি, যার ফলে ফিলিং
স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। পাম্পে এত বিশৃঙ্খলা যে জ্বালানি না
পেয়ে ফিরে যাওয়া ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের হাতে আমাদের কর্মীরা হামলার শিকার
হচ্ছেন। মানুষকে মজুত বন্ধ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি চালককে
সীমিত পরিমাণ জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে। ফলে তারা মোটরসাইকেলের ট্যাংক খালি করে
আবার লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। আমরা পাম্প ও কর্মীদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিতে
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছি।
জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন,
সরকার অত্যন্ত উচ্চ দামে জ্বালানি আমদানি করছে, যা ভর্তুকির চাপ ব্যাপকভাবে
বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ তার প্রাথমিক জ্বালানির ৬২ শতাংশের বেশি আমদানির
ওপর নির্ভরশীল। তাই কোনো বিঘ্ন ঘটলেই পুরো ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ে।
তিনি
আরও জানান, স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস
আমদানি বাড়িয়েছে। বিদ্যুৎখাত অত্যন্ত ভর্তুকিনির্ভর, তার ওপর এই ব্যয়বহুল
জ্বালানি যুক্ত হওয়ায় আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।
শফিকুল আলম সতর্ক করে বলেন,
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে উচ্চ দামে জ্বালানি
কিনতে হবে অথবা গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ সীমিত করতে হবে, যা শিল্প খাতে
সংকট ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করবে। তিনি আরও বলেন, সরকারকে জ্বালানি
সাশ্রয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যেমন করোনা মহমারির সময়ে যেসব
প্রতিষ্ঠানে সরাসরি লেনদেন হয় না সেখানে বাসা থেকে কাজের ব্যবস্থা চালু করা
হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বাংলাদেশি সংবাদপত্র
ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সব সংস্থাকে প্রস্তাব
তৈরি করতে বলা হয়েছে, যার মধ্যে তিন মাসের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা এবং মধ্য
ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে
সরকারি ছুটির দিন বাড়ানো, বাসা থেকে কাজ চালু, কর্মদিবস কমানো ও নাগরিকদের
কম সময় গোসল করার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে জ্বালানি সাশ্রয় করা যায়।
চলতি
বছর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকটের
মধ্যেই দায়িত্ব নেয়। এর কিছুদিনের মধ্যেই ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে
আরও জটিল করে তোলে।
শফিকুল আলম বলেন, ২০২২ সালের রাশিয়া যুদ্ধের সময় বড়
ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লেও বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেয়নি। এখন
তারেক রহমানের সরকারের উচিত, জ্বালানি খাত নিয়ে নতুনভাবে ভাবা ও পরিষ্কার
জ্বালানির (পানি, বায়ু ও সৌর বিদ্যুৎ কিংবা বায়োগ্যাস) দিকে দ্রুত অগ্রসর
হওয়া। রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের পর যে ঘাটতি ছিল, তা পূরণ করা হয়নি। এখন
সরকারকে দ্রুত জ্বালানি রূপান্তরের দিকে এগোতে হবে।
