
অন্যান্য
বছরের মতো এবারও ১৫ মার্চ বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস ২০২৬ বাংলাদেশসহ পুরো
বিশ্বে উদ্যাপিত হলো। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে ‘ভোক্তাবাদ’ আন্দোলন
জোরদার হয়। ১৯৬২ সালের ১৫ মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি কর্তৃক
মার্কিন কংগ্রেসে ক্রেতা-ভোক্তা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ঐতিহাসিক
দিনটির স্মরণে প্রতি বছরের ১৫ মার্চ বিশ্বজুড়ে দিবসটি বিশ্ব ভোক্তা অধিকার
দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ক্রেতা-ভোক্তা আন্দোলনে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন
ভোক্তা সংগঠনগুলো নানামুখী কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বে ভোক্তা আন্দোলনের মূল
প্রবক্তা মার্কিন সিনেটর ও মাল্টিন্যাশনাল মনিটর পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা
রাল্ফ নাদের। ক্রেতা-ভোক্তাদের আর্ন্তজাতিক সংগঠন কনজুমারস ইন্টারন্যাশনাল
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ভোক্তা আন্দোলনে নেতৃত্বদানও এ আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে
যাচ্ছে। ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় এসব সংগঠন প্রয়োজনীয় কর্মসূচি চালিয়ে
যাচ্ছে। ক্রেতা-ভোক্তাদের অধিকার কতটুকু সংরক্ষিত হচ্ছে সেটা আজও এক বড়
ধরনের প্রশ্ন। একই সঙ্গে ভোক্তা বা ক্রেতা হিসেবে অধিকার ও কর্তব্য
সম্পর্কে আমরা কতটুকু সচেতন ও কার্যকর করতে পেরেছি বা করেছি এ প্রশ্নের
উত্তর ইতিবাচক নয়।
১৫ মার্চ বিশ্ব ক্রেতা-ভোক্তা অধিকার দিবসটি ১৯৮৩
সালের থেকে যথাযোগ্য মর্যাদায় বিশ্বের দেশে দেশে পালিত হয়ে আসছে। সারা
বিশ্বের ভোক্তা সংগঠনগুলোর ফেডারেশন ঈড়হংঁসবৎ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ (ঈও) ভোক্তা
অধিকার প্রচারণার একমাত্র সম্মিলিত কণ্ঠস্বর বা দাবি আদায়ের বিশ্বব্যাপী
নেটওয়ার্ক। সারা বিশ্বের ১১৫টি দেশের ২২০টিরও বেশি সংগঠন এর সদস্য।
বাংলাদেশের একমাত্র ও শীর্ষস্থানীয় ভোক্তা সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব
বাংলাদেশ (ক্যাব) কনজুমার ইন্টারন্যাশনাল এর পূর্ণাঙ্গ সদস্য। বিশ্ব ভোক্তা
অধিকার দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য: ঝধভব চৎড়ফঁপঃং, ঈড়হভরফবহঃ ঈড়হংঁসবৎং!।
বাংলাদেশে বিষয়টি দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা
হয়েছে ‘নিরাপদ পণ্য নিশ্চিত করি, ভোক্তার আস্থা গড়ে তুলি’। বিষয়টি আমাদের
সবার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভোক্তা অধিকার রাষ্ট্র, সমাজ,
ব্যবসায়ী, উৎপাদক, প্রশাসন-আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সবাই ভোক্তা হলেও
ভোক্তার করণীয় ও দায়িত্ব সম্পর্কে যেরকম ধারাণায় অভাব রয়েছে, তেমনি
ব্যবসায়ীদের আচার-আচরণ, নীতি-নৈতিকতার কারণে মানহীন, ভেজাল পণ্য
বাজারজাতকরণ, আমদানি ও উৎপাদনে আমরা পিছিয়ে নেই।
‘ভোক্তা’ শব্দের সঙ্গে
আমরা সবাই পরিচিত। ভোক্তার ইংরেজি শব্দ কনজুমার; যার অর্থ ভোগকারী। অর্থাৎ
কেউ কোনো পণ্য, খাদ্য, পানীয় দ্রব্য বা সেবা প্রদানকারীর সেবা গ্রহণ করে
অর্থাৎ যারা ভোগ করে তাদের ভোক্তা বলে। দেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ২০০৯ এর
আওতায় ভোক্তা হলেন ‘তিনিই যিনি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ব্যতীত, সম্পূর্ণ মূল্য
পরিশোধ করে বা সম্পূর্ণ বাকিতে পণ্য বা সেবা ক্রয় করেন, অথবা কিস্তিতে
পণ্য বা সেবা ক্রয় করেন’। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ কোনো না কোনোভাবে একজন
ভোক্তা। আবার অনেকে বলে থাকেন ‘মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে যেসব অধিকার ও
সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্র ও জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত’ এগুলোই ভোক্তা অধিকারের
আওতায়। জাতিসংঘ স্বীকৃত ভোক্তা অধিকারগুলোর মধ্যে ‘অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা,
চিকিৎসা ও বাসস্থানের মৌলিক চাহিদা পূরণের অধিকার’, ‘নিরাপদ পণ্য ও সেবা
পাওয়ার অধিকার’, ‘পণ্যের উপাদান, ব্যবহারবিধি, পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া
ইত্যাদির তথ্য জানার অধিকার’, ‘যাচাইবাছাই করে ন্যায্যমূল্যে সঠিক পণ্য ও
সেবা পাওয়ার অধিকার’, ‘কোনো পণ্য বা সেবা ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত হলে
ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার’, ‘অভিযোগ করার ও প্রতিনিধিত্বের অধিকার’,
‘ক্রেতা-ভোক্তা হিসেবে অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা লাভের অধিকার’,
‘স্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ ও বসবাস করার অধিকার’ অন্যতম। তবে অধিকারের
পাশাপাশি কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কেও বলা হলেও এ বিষয়গুলো সম্পর্কে
আমাদের উদাসীনতা একেবারেই কম নয়। বিষয়গুলো হলো- পণ্য বা সেবার মান ও
গুণাগুণ সম্পর্কে সচেতন ও জিজ্ঞাসু হোন, দরদাম করে সঠিক পণ্যটি বাছাই করুন,
আপনার আচরণে অন্য ক্রেতা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে ব্যাপারে সচেতন থাকুন,
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সচেতন ও সক্রিয় হোন, ক্রেতা-ভোক্তা হিসেবে
অধিকার সংরক্ষণে সোচ্ছার ও সংগঠিত হোন।
বিশ্বের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ
অর্থনৈতিক গোষ্ঠী ভোক্তাদের স্বার্থ চিন্তা করে প্রতি বছর ১৫ মার্চ বিশ্ব
ভোক্তা অধিকার দিবস পালন করা হয়ে আসছে। যেখানে বিশ্বব্যাপী ভোক্তা সুরক্ষার
মূল বিষয়গুলো তুলে ধরে এবং শক্তিশালী ভোক্তা অধিকারের পক্ষে কথা বলে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, ভোক্তারা প্রতিনিয়ত প্রতি পদে ভোক্তা
অধিকার নিয়ে ঠকছে, প্রতারিত হচ্ছে। সেখানে নিরাপদ পণ্য পাওয়া অনেকটাই
স্বপ্ন। সে কারণে এবার ২০২৬ সালে, বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবসের প্রতিপাদ্য
বিষয় হলো, ‘নিরাপদ পণ্য নিশ্চিত করি, ভোক্তার আস্থা গড়ে তুলি’ যা উৎপাদক,
বিতরণকারী, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাসহ সবার কাছে একটি সমন্বিত আহ্বান, যা সবার
জন্য নিরাপদ ও টেকসই পণ্য নিশ্চিত করা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সবার
সম-অভিগম্যতা নিশ্চিত করে।
পুরো বিশ্বের ভোক্তারা এখনো অনিরাপদ, মানহীন,
নকল বা নিম্নমানের পণ্যের বাজারজাত করা হচ্ছে, যেখানে শিশুদের খেলনা এবং
গৃহস্থালির ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে ওষুধ এবং দৈনন্দিন ভোগ্য পণ্য থেকে
কোন পণ্য বাদ নেই। এর কারণে বিপুল জীবনহানি, স্বাস্থ্যের পক্ষে মারাত্মক
ক্ষতিকর এবং পণ্যের মান সম্পর্কে বিশ্বাসহীনতা সৃষ্টি করে।
প্রতিনিয়তই
যেমনটি বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন বিস্তৃত হচ্ছে এবং ঠিক একইভাবে বাস্তবতার কারণে
অনলাইন ব্যবসা বাড়ছে, বিপজ্জনক পণ্যগুলো দ্রুত এবং আরও দূর এগিয়ে যাচ্ছে।
২১টি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ঙঊঈউ) দেশের মধ্যে ই-কমার্স
সাইটের একটি পর্যালোচনা দেখিয়েছে যে, প্রত্যাহার বা নিষিদ্ধ করা পণ্যের ৮৭
শতাংশ এখনো কেনার জন্য উপলব্ধ ছিল, এবং জাতিসংঘ ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট
(টঘঈঞঅউ) দেশের খেলার অংশ। চিলির পরিবেশ মন্ত্রী, মাইসা রোহাস, ২০২৫ সালের
বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবসের জন্য আরও টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে ভোক্তার পছন্দের
শক্তি গুরুত্বারোপ করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৪৪ শতাংশ জাতিসংঘের সদস্য
দেশগুলোতে শক্তিশালী পণ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ নেই, যার ফলে নিম্ন এবং মধ্য
আয়ের দেশগুলোতে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকা ভোক্তারা সবচেয়ে বেশি
ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
পণ্যের মান ও নিরাপত্তা কেবল একটি নিয়ন্ত্রক সমস্যা
নয়, এটি জীবন, স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তার মানবাধিকার রক্ষা করার জন্য
অপরিহার্য। যখন নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথভাবে কাজ করে না, তখন ভোক্তারা
প্রতারিত হন, আর্থিক ক্ষতির শিকার, পরিবেশগত ক্ষতি এবং এমনকি জীবনহানিসহ
ক্ষতির বোঝা বহন করে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সীমান্ত পার নিয়ে সমন্বিত
ব্যবস্থা, শক্তিশালী প্রয়োগ, এবং সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ভোক্তা
সংস্থাগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন।
বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস
২০২৬ আমাদের বৈশ্বিক আন্দোলনকে এ জরুরি আহ্বানের পেছনে একত্রিত করে।
প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের ভোগ্যপণ্য নিরাপত্তার নীতিমালা স্থাপন করে, আমরা
ভোক্তাদের মুখোমুখি থাকা বাস্তবতা তুলে ধরব এবং এমন সমাধান সমর্থন করব যা
নিশ্চিত করে যে প্রতিটি ব্যক্তি নিরাপদ পণ্যের ওপর নির্ভর করতে পারে।
ভৌত
পণ্যগুলো হলো প্রতিদিনের গৃহস্থালির উপকরণ, পণ্য এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী যা
মানুষের ওপর নির্ভরশীল, তবুও এগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত নেই। একটি পণ্য
ডিজাইন করা থেকে শুরু করে যখন এটি ভোক্তার হাতে পৌঁছায়, অসংখ্য সিদ্ধান্ত
নির্ধারণ করে তা নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং উদ্দেশ্য অনুযায়ী উপযুক্ত কি না।
ভৌত পণ্য প্রত্যেককে প্রভাবিত করে, সংযোগের ওপরে নির্ভর না করে যা এই
মনোনিবেশকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বিশ্বব্যাপী প্রাসঙ্গিক করে তোলে।
তাই
বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবসে আমরা নিরাপদ পণ্য এবং ভোক্তার আস্থা অর্জনের
আহ্বান জানাই। এটি সরকার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা অধিকার গ্রুপগুলোর মধ্যে
সমন্বিত কর্মের দাবি রাখে। এর মানে হলো টহংধভব পণ্য শনাক্ত করা, সংশোধন
করা, ট্র্যাক করা এবং অনুসরণ করার জন্য কার্যকর যন্ত্রণা স্থাপন করা; এমন
শক্তিশালী আইন যা প্রথম দিকে বাজারে টহংধভব পণ্য প্রবেশকে প্রতিরোধ করে;
এবং ব্যবসাগুলো উদাহরণের মাধ্যমে নেতৃত্ব দেয়।
অনিরাপদ পণ্য জীবনকে
হুমকি দেয় এবং মৌলিক মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করে। গৃহস্থালির যন্ত্রপাতি থেকে
শুরু করে শিশুদের খেলনা পর্যন্ত, ভোক্তারা এখনো এমন পণ্য পাই যা তাদের
স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলে। ওইসিডি দেশের ২১টি ই-কমার্স সাইটের
একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, প্রত্যাহার করা বা নিষিদ্ধ পণ্যের ৮৭ শতাংশ
এখনো অনলাইনে উপলব্ধ রয়েছে, যা তদারকি এবং বাজার প্রয়োগে বিপজ্জনক ফাঁক
নির্দেশ করে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ফাঁক ভোক্তাদের অরক্ষিত রেখেছে। টঘঈঞঅউ
আনুমানিক করেছে যে ৪৪ শতাংশ টঘ সদস্য রাষ্ট্রের এখনো পর্যাপ্ত পণ্য
নিরাপত্তা কাঠামো নেই, যা টহংধভব বা নিম্নমানের পণ্যগুলোকে বিস্তৃতভাবে
বাজারে প্রচলিত হতে দেয়। আইন, মান এবং প্রয়োগ শক্তিশালী করা সব ভোক্তাকে
সুরক্ষিত করতে অপরিহার্য সর্বত্র।
ভোক্তা সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত ঝুঁকি
প্রকাশ করে এবং জবাবদিহি বাড়ানোর চাপ দেন। মান পরীক্ষা করে এবং নিরাপদ নয়
এমন পণ্য উন্মোচন করে, সাধারণ মানুষকে শিক্ষা ও সচেতন করে এবং নিয়ন্ত্রকদের
সহায়তা করে। তাদের প্রমাণ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা এমন ব্যবস্থা ডিজাইন করতে
খুবই গুরুত্বপূর্ণ যা বাস্তব ভোক্তার চাহিদাকে প্রতিফলিত করে এবং ভোক্তা
ক্ষতি প্রতিরোধ করে। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ৬০ জনের মধ্যে ৩৬ জন
রেসপন্ডেন্ট পণ্যের নিরাপত্তাকে এমন একটি ক্ষেত্র হিসেবে শনাক্ত করেছেন
যেখানে তারা গত পাঁচ বছরে জনসচেতনতা অভিযান বা পদক্ষেপের মাধ্যমে সাফল্যের
সঙ্গে প্রভাব ফেলেছেন।
সরকার, ব্যবসায়ী এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে
সহযোগিতা অপরিহার্য। পণ্যের নিরাপত্তা পুরো জীবনচক্র থাকা উচিত যেখানে নকশা
এবং উৎপাদন থেকে শুরু করে বিক্রি, ব্যবহার এবং নিষ্পত্তি পর্যন্ত নিশ্চিত
করে। সমন্বিত রিকল, ভাগ করা পরীক্ষা এবং সীমান্ত-পার তথ্য ব্যবস্থা কার্যকর
বৈশ্বিক সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপত্তা কোনো বিশেষাধিকার হওয়া
উচিত নয়। দুর্বল পরিস্থিতিতে থাকা ভোক্তা এবং নিম্ন-আয়ের দেশগুলো নিরাপদ নয়
এমন পণ্য থেকে সর্বাধিক ঝুঁকির মুখোমুখি হয়। নিরাপদ, বিশ্বাসযোগ্য পণ্যের
প্রবেশাধিকারের বিষয়টি সর্বজনীন অধিকার হতে হবে, যা ভৌগোলিক অবস্থান, আয় বা
পরিস্থিতি দ্বারা নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়।
আমাদের দেশের ভোক্তারা এখনো
স্বাধীনভাবে পণ্য পছন্দ করা ও ক্রয় করতে পারে না। তারা বিক্রয় প্রতিনিধি,
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার প্রচারণা, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে
বিজ্ঞাপনের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
(ক্যাব) পণ্য লেবেলিংয়ে স্বচ্ছতার পক্ষে এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য দাবির জন্য
ব্যবসায়ীকে জবাবদিহি করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যার
কারণে একটি পরিপূর্ণ লেবেলিং আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,
বাজার ও কমিউনিটি গ্রুপভিত্তিক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন
পেশাজীবী ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আচার অনুষ্ঠানগুলোতে ভোক্তা শিক্ষার
সম্প্রসারণ করে সাধারণ ভোক্তাদের এ বিষয়ে আরও বেশি অবহিত করা, নিজেদের
পছন্দ অনুযায়ী পণ্য ও সেবা ক্রয় করতে পারে কি না সে বিষয়ে আরও ক্ষমতায়িত
করতে হবে।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও ভোক্তাবান্ধব করা, করপোরেট সামাজিক
দায়বদ্ধতা (সিএসআর) প্রসার করে সঠিক পণ্য বাছাইয়ে ভোক্তা সচেতনতা বিকাশে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তৃণমূলে জনসচেতনতামূলক প্রোগ্রামগুলো
চালানোর জন্য বড় বড় করপোরেট গ্রুপ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এবং বেসরকারি উন্নয়ন
সংগঠন (এনজিও) গুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়ানো যেতে পারে।
যেহেতু পুরো
বিশ্ব এখন একটি নিরাপদ পণ্য নিয়ে শঙ্কিত, মানহীন, নিম্নমানে ও ভেজাল পণ্যের
অতি প্রসারের কারণে মানুষ প্রতিনিয়তই প্রতারণার শিকার হচ্ছে। যার সর্বশেষ
পরিণতি হচ্ছে জীবনহানি, নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও জীবন-জীবিকার ব্যয়
বৃদ্ধি ও পণ্যের আস্থার সংকট। ফলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তাই সমাজে ন্যায্য ব্যবসা প্রসারে ও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের প্রতি আস্থা ফেরাতে
ব্যবসা-বাণিজ্যের অংশীজন-ভোক্তা, ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক এবং বিভিন্ন
সম্প্রদায়ের নেতাকে অবশ্যই তাদের ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ ১৮
কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে ভোক্তা। আর যিনি একটি পণ্য বিক্রি করছেন, তাকে
আরও ১০টি পণ্য কিনতে হচ্ছে। তাই কাউকে বাদ রেখে কোনোভাবে সমাজে ন্যায্য
ব্যবসা এগোতে পারে না। তাই সমাধানগুলো অবশ্যই সমন্বিত ও অর্থনৈতিক এবং
পরিবেশগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, সে প্রত্যাশা সবার।
লেখক: ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
