
দেশে মশার উপদ্রব অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। শহর, নগর, গ্রাম সবখানেই মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ মানুষ। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা মশার কামড়ে বহুতল ভবনের ওপরের তলাগুলোয় বসবাসরতরাও রেহাই পাচ্ছেন না। মশার কামড়ে ত্বক ফুলে যাওয়া, তীব্র চুলকানি ও অস্বস্তি এখন নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী। বাসিন্দাদের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর উদাসীনতা এবং মাঠপর্যায়ের দৃশ্যমান মশক নিধন কার্যক্রম না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। কয়েল, অ্যারোসল, বৈদ্যুতিক ব্যাট কিংবা মশারি ব্যবহার করেও পুরোপুরি সুরক্ষা মিলছে না। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। এটি এখন গুরুতর জনস্বাস্থ্যসংকটে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মশা সাধারণ মানুষকে এতটা অতিষ্ঠ করেছে যে, তা গড়িয়েছে হাইকোর্ট পর্যন্ত। সাত দিনে ব্যবস্থা না নিলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ঢাকার জজকোর্টের আইনজীবী ডাকযোগে লিখিত নোটিশ পাঠিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রিট আবেদন করা হবে। নোটিশে মশা নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তাকে প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও দায়িত্বে গাফিলতি হিসেবে উল্লেখ করে একে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিস মশার প্রকোপ কিছুটা কমলেও কিউলেক্স মশার দাপট বাড়ছে। নতুন বছরের শুরুতেই কিউলেক্সের আধিক্য বাড়তে শুরু করেছে, যা মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, ৫৪টি ওয়ার্ডে চলতি অর্থবছরে মশা নিধনে প্রায় ১১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে, যার মধ্যে ৬৫ কোটি টাকা কীটনাশক কেনায় ব্যয় করার কথা। অন্যদিকে ডিএসসিসি বরাদ্দ রেখেছে ৪৪ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে সেই বরাদ্দের কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নাগরিকরা। এদিকে ডিএসসিসি জানিয়েছে এডিস ও কিউলেক্স নিয়ন্ত্রণে বছরব্যাপী কর্মসূচি রয়েছে এবং বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ফগিং নয়, লার্ভা ধ্বংস, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। সামনে ডেঙ্গুর মৌসুম। আগেভাগে সমন্বিত প্রস্তুতি না নিলে আবারও ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগ পর্যন্ত মশক নিধন কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। তবে প্রশাসনিক পরিবর্তন ও জনপ্রতিনিধিদের অব্যাহতির পর তদারকিতে শৈথিল্য আসে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার দুর্বল প্রশাসনিক জটলার প্রভাব নাগরিক সেবাকেও দুর্বল করে তোলে। নির্বাচনের পর ও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। অনেক ওয়ার্ডে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। অর্থ ছাড় না হওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আটকে আছে। নিয়মিত নাগরিক সেবার খাতগুলোতে তদারকি কমে গেছে। মশার উপদ্রব বাড়লেও কোনো কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ে তদারকি করছেন না বলে অভিযোগ করছেন এলাকাবাসী।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, জনপ্রতিনিধি না থাকায় সাধারণ মানুষ অভিযোগ জানানোর কার্যকর পথ পাচ্ছেন না। অনেক অভিযোগ নগর ভবন পর্যন্ত পৌঁছায় না। প্রশাসক নিয়োগ দিলেও ওয়ার্ড পর্যায়ে কার্যকর তদারকি নেই। মশক নিধনে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হচ্ছে, কিন্তু জনগণ সুফল পাচ্ছে না। এজন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। না হলে জনগণের অর্থ ব্যয় হলেও কার্যকর প্রতিকার মিলবে না। দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার ওপরও এই পরিকল্পনাবিদ জোর দেন।
মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করতে সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বর্তমানে এ সমস্যা শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, দেশব্যাপী বিস্তার লাভ করেছে। তাই মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। সম্প্রতি সিটি করপোরেশনে নতুন প্রশাসক দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আশা করছি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সঠিক ও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সংকটের কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।
