রাজধানীর
গ্রিনরোড এলাকার বাসিন্দা মোকাররম হোসেন। তিন সন্তান আর স্ত্রী নিয়ে
সংসার। নিজে একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ইদানীং তার দুশ্চিন্তার
কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস সংকট আর সিলিন্ডার গ্যাসের বাড়তি দাম। তার
ভাষ্য, বাসায় লাইনের গ্যাস সব সময় থাকে না। এজন্য বিকল্প উপায় হিসেবে
এলপিজি সিলিন্ডার রাখতে হয়। এতে বাড়তি খরচ গুনতে হয় তাকে। তার এই বাড়তি খরচ
আরও বেড়ে গেছে এলপিজির লাগামহীন দামে।
মোকাররম বলেন, প্রতি মাসে লাইনের
গ্যাস বিল তো দিতে হয়। বাসায় ছোট বাচ্চা, ওদের জন্য হুটহাট খাবার রেডি
করতে হয়। এখন গ্যাস তো আর সব সময় থাকে না, এজন্য বাধ্য হয়ে বিকল্প হিসেবে
সিলিন্ডার রেখেছি, যাতে যে কোনো সময় অন্তত খাবার রান্না করা যায়। এখন দেখছি
এটাও বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, সিলিন্ডার সরকারি দামে কিনতে পারি
না। এই মাসেও ১৯শ টাকা দিয়ে কিনেছি। এমনিতেই জিনিসপত্রের দাম বেশি। তার
ওপর গ্যাসের জন্য বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে। মধ্যবিত্তের সংসারে আমরা এক-দুইশ
টাকাও হিসাব করে খরচ করি।
শুধু মোকাররম নন, রাজধানীতে পরিবার নিয়ে
কোনোভাবে টিকে আছেন এমন অনেকেই লাইনের গ্যাস না থাকা ও এলপিজির বাড়তি দামে
বেশ বিড়ম্বনায় আছেন। বাসাবাড়িতে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবহার বেশি।
এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
সেই দামের তোয়াক্কা করে না কেউ। কখনো কৃত্রিম সংকট আবার কখনো অসাধু
ব্যবসায়ীরা মুনাফার লোভে বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রি করছেন।
১২ কেজি
সিলিন্ডারের সরকারি মূল্য ১ হাজার ৩৪১ টাকা। তবে বাজারে সেই দামে কোথাও
মিলছে না সিলিন্ডার। ভোক্তাদের অভিযোগ, অধিকাংশ বিক্রয়কেন্দ্রে নির্ধারিত
দামের চেয়ে বাড়তি টাকা গুনেই এলপিজি কিনতে হচ্ছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত
পরিবারগুলো পড়েছে চাপে।
এদিকে এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার ভ্যাট
কমিয়েছে। ফলে সরকার নির্ধারিত বিক্রয়মূল্য কিছুটা কমলেও বাজারে তার
প্রতিফলন নেই। খুচরা পর্যায়ে বিক্রেতারা পরিবহন খরচ, ডিলার কমিশন ও সরবরাহ
সংকটের অজুহাতে অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন।
টঙ্গীর এলপিজি সিলিন্ডার
ব্যবসায়ী মিঠু বলেন, ‘সিলিন্ডার আছে, দাম ১৯শ টাকা।’ দাম এত বেশি কেন জানতে
চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা তো কিনতে পারি না। ফেসবুকের দামের হিসাব কইরা লাভ
নাই। অন্য জায়গায় কম দামে পাইলে সেইখান থেইক্যা ন্যান।’
লালবাগের
বাসিন্দা ফাতেমা আক্তার বলেন, ‘১৮শ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনছি। কোথাও কম
দামে পাইলাম না। শুধু শুনি যে সরকার দাম কমাইছে। বাজারে কিনতে গেলে তো পাই
না।’
ধানমন্ডির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রেতা জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের
খরচা হয় বেশি। অনেকের বাসায় নিয়ে ডেলিভারি দিয়ে আসতে হয়। পরিবহন খরচ আছে।
কেনা পড়ে বেশি টাকায়। বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করব কীভাবে! এজন্য
সরকারি দামে বিক্রি করতে পারি না।
ভ্যাট কমার প্রভাব নেই সিলিন্ডারের দামে
বাজার
স্থিতিশীল রাখা ও ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটি
রাখতে সরকার তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ওপর সামগ্রিক ভ্যাট
কমিয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক সংবাদ
বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। এতে বলা হয়, বিদ্যমান ব্যবস্থায় এলপিজির স্থানীয়
উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রযোজ্য
ছিল এবং আমদানি পর্যায়ে ২ শতাংশ অগ্রিম কর (এটি) পরিশোধ করতে হতো।
শিল্পকারখানা
ও গৃহস্থালি- উভয় ক্ষেত্রেই এলপিজিকে একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে
বিবেচনা করে জনস্বার্থে কর কাঠামো যৌক্তিক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
গত
১৬ ফেব্রুয়ারি আলাদা দুটি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, স্থানীয় উৎপাদন ও বিপণন
পর্যায়ের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং আমদানি পর্যায়ের ২ শতাংশ অগ্রিম কর
প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর পরিবর্তে এলপিজির আমদানি পর্যায়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ
ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত এটা কার্যকর থাকবে।
এই
পুনর্বিন্যাসের ফলে আমদানির পর স্থানীয় উৎপাদন ও বিতরণ পর্যায়ে মূল্য
সংযোজনের ওপর আর কোনো ভ্যাট প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ, সরবরাহ শৃঙ্খলের
বিভিন্ন স্তরে একাধিকবার ভ্যাট আরোপের পরিবর্তে এখন কেবল আমদানি পর্যায়েই
একবার কর আদায় করা হবে।
এনবিআর জানায়, এসআরও কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে
আগের কাঠামোর তুলনায় ভোক্তাদের ওপর সামগ্রিক ভ্যাটের চাপ প্রায় ২০ শতাংশ
কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে দাম কমার পরেও বাড়তি দাম দিয়ে ভোক্তাদের
সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।
