আবদুল
মমিন। দুই সন্তানের জনক। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী
অবহেলিত সাতঘড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা। ভ্যান চালিয়ে সংসারের ব্যয় নির্বাহ
করেন। জন্মের পর থেকে তাঁর দুই চোখে সমস্যা। গত বছরের বন্যায় তাঁর টিনসেড
ঘর ভেঙে বসবাস অনুপযোগী হয়ে পড়ে। কিন্তু সামর্থ না থাকায় ঘর মেরামত বা নতুন
করে নির্মাণ করতে পারেনি। আশ-পাশের বাসিন্দারাও অসহায় হওয়ায় তার ঘর
নির্মাণে কেউ সহযোগিতা করেনি। এক পর্যায়ে অসহায় ভ্যানচালক আবদুল মমিন
স্বপ্নপূরণ ফাউন্ডেশনের কাছে আবেদন করেন। স্বপ্নপূরণ ফাউন্ডেশনের
প্রতিষ্ঠাতা মোশাররফ হোসেন ফাউন্ডেশনের সাথে জড়িত শিক্ষাবীদ, সাংবাদিক ও
সামাজিক সংগঠনের তরুণদের সাথে আলাপ এবং সরেজমিন পরিদর্শন করে চার মাস আগে
নতুন ঘর নির্মাণ করে দেন। এছাড়া ঘরের বৈদ্যুতিক কাজ ও খাটসহ প্রয়োজনীয়
মালামাল দেয়া হয়। এতে খুশি অসহায় ভ্যানচালক আবদুল মমিন, তাঁর পরিবারসহ
আশ-পাশের বাসিন্দারাও।
আবদুল মমিনের মতো হাজার হাজার অসহায় মানুষের
সেবা ও জনকল্যাণে স্বপ্নপূরণ ফাউন্ডেশন অসাধারণ অবদান রাখছে। এ ফাউন্ডেশন
চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত গত সাত বছরে ১৪৪টি ইভেন্ট সম্পন্ন করেছে।
শতভাগ স্বচ্ছ হিসাব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় সকলের কাছেই
গ্রহণযোগ্য ফাউন্ডেশনটি। এ ফাউন্ডেশনের অধিকাংশ অর্থই প্রবাসীরা দান করে।
জনকল্যাণে ও স্বপ্নপূরণে অসহায় মানুষের সাথী হলেও স্বপ্নপূরণ ফাউন্ডেশনের
মত অনেক প্রতিষ্ঠানই রয়েছে সরকারের উৎসাহের বাইরে। সরকারের উচিত, তৃণমূল
পর্যায়ে সমাজকল্যাণ ও অসহায় মানুষের কল্যাণে যে সকল ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা
সংগঠন কাজ করে তাদেরকে উৎসাহ দেয়া এবং সম্মানিত করা। গণঅভ্যুত্থানের আগে
১৭ বছরে সমাজকল্যাণে কাজ করে এমন সংগঠন ছিল সরকারের আক্রোশের শিকার। বিএনপি
নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিয়ে
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে পুরস্কৃত করে আরও
জনসম্পৃক্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক
কাজী শেখ ফরিদ। তিনি বলেন, স্বপ্নপূরণ ফাউন্ডেশনের কয়েকটি ইভেন্টে সরাসরি
অংশহণের সুযোগ হয়েছে। সমাজসেবা ও জনকল্যাণে কাজ করে এমন সংগঠন দেশে খুবই কম
পাওয়া যায়। ইতোমধ্যে সারাদেশেই সংগঠনটি সুনাম অর্জন করেছে। এখানে স্বচ্ছ
হিসাবই সকলকে আকৃষ্ট করে। এছাড়া প্রকৃত ব্যক্তিদেরই স্বপ্নপূরণে অংশীদার হয়
স্বপ্নপূরণ ফাউন্ডেশন।
স্বপ্নপূরণ ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, মানবতার
কল্যাণে স্বপ্ন পূরণের দৃঢ় অঙ্গীকার-এ স্লোগানকে ধারন করে ২০১৯ সালে
প্রতিষ্ঠিত হয় স্বপ্নপূরণ ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে চলতি বছরের ২৭
ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত চৌদ্দগ্রাম পৌরসভাসহ উপজেলার তের ইউনিয়ন ছাড়াও দেশের
বিভিন্নস্থানে ১৪৪টি ইভেন্ট সম্পন্ন হয়েছে। সমাজসেবা ও জনকল্যাণ এমন কোন
কাজ বাদ নেই যা স্বপ্নপূরণ ফাউন্ডেশন করেনি। ইভেন্টগুলো বাস্তবায়ন করতে
রেমিটেন্সযোদ্ধাদের অবদান অপরীসিম। এছাড়া দেশে থাকা শিক্ষাবীদ, সাংবাদিক ও
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের দায়িত্বরত তরুণদের সুন্দর পরামর্শে সকল কাজ করা
হয়েছে। এরমধ্যে শুধু চলতি বছর জানুয়ারী ও ফেব্রুয়ারী মাসে দশটি ইভেন্ট
সম্পন্ন হয়েছে। ইভেন্টগুলো হলো; বাতিসা ইউনিয়নের চাঁন্দকরা গ্রামের অসহায়
শেফালী বেগম, ডলবা গ্রামের দিনমুজুর জাহিদ হাসান মাহমুদ, কালিকাপুর
ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের বিধবা মোসাঃ মাফিয়া বেগম, জগন্নাথদিঘী ইউনিয়নের
বিজয়করা গ্রামের দিনমুজুর নজরুল ইসলাম, ঘোলপাশা ইউনিয়নের গুজরা গ্রামের
বিধবা আনোয়ারা বেগমের জন্য পৃথক নতুন ঘর নির্মাণ, একজন যুবকের চিকিৎসার
জন্য আর্থিক অনুদান প্রদান। কনকাপৈত ইউনিয়নের করপাটি গ্রামের এইচএসসি
একশিক্ষার্থীর জন্যবই প্রদান। চৌদ্দগ্রাম পৌরসভায় গোমারবাড়ী পূর্বপাড়া
পলোয়ান বাড়ী মসজিদের বারান্দায় লোহার গিরিল প্রদান। নজমিয়া মাদ্রাসার একজন
ছাত্রের জন্য পাঞ্জাবী, পাজামা ও ব্যাগ প্রদান। এরআগে ২০২৫ সালে ১৯টি, ২০২৪
সালের ২১টি, ২০২৩ সালের ২০টি, ২০২২ সালের ২৫টি, ২০২১ সালে ১৩টি, ২০২০
সালে ২২টি ও ২০১৯ সালে ১৫টি ইভেন্ট সহ মোট ১৪৪টি ইভেন্ট সম্পন্ন হয়েছে।
শুক্রবার
বিকেলে বিজয়করা গ্রামের অসহায় নজরুল ইসলাম নতুন ঘর উপহার পেয়ে স্বপ্নপূরণ
ফাউন্ডেশনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
তারেক রহমান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মোঃ জাহিদ হোসেন, যুব ও ক্রিড়া
প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট স্বপ্নপূরণ
ফাউন্ডেশনের মতো সংগঠনগুলোকে পুরস্কৃত করার আহবান জানাচ্ছি। এতে তারা
সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক কাজে আরও উৎসাহিত হবে।
স্বপ্নপূরণ ফাউন্ডেশনের
প্রতিষ্ঠাতা মোশাররফ হোসেন বলেন, প্রবাসী ও দেশে থাকা মানবিক মানুষদের
অনুদানে পরিচালিত হচ্ছে স্বপ্নপূরণ ফাউন্ডেশন। সব মানবিক মানুষই এ সংগঠনের
অভিভাবক। আমরা প্রতিটি ইভেন্টে প্রকৃত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি এবং
শতভাগ স্বচ্ছ হিসাবের মাধ্যমে সংগঠন পরিচালনা করছি। মানবিক কাজে সারাদেশের
এরকম সংগঠনগুলোকে সরকারের উৎসাহ দেয়াসহ সার্বিক সহযোগিতা করার দাবি
জানাচ্ছি।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ সাহিদুর রহমান
বলেন, ‘স্বপ্নপূরণ ফাউন্ডেশন গত সাত বছর ধরে বিভিন্নস্থানে সমাজসেবা ও
জনকল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি অসহায় মানুষের কল্যাণে
স্বপ্নপূরণ ফাউন্ডেশনের মতো অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসা
উচিত’।
উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মোঃ সফিকুর রহমান বলেন,
‘স্বপ্নপূরণ ফাউন্ডেশন নামের সংগঠনটি অসহায় যুবকদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি
সমাজসেবা ও জনকল্যাণে কাজ করছে। বিশেষ করে বন্যার পর উপজেলাজুড়ে জ্যেষ্ঠ ও
অসহায় মানুষের কল্যাণে সংগঠনটির বিভিন্ন কর্মসূচি ছিল প্রশংসনীয়’।
