
উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের মেয়েটির
মুখশ্রী বড্ড মায়াকাড়া। করুন বিষণ্ন দুটি চোখ। ওরা অনেক কথা বলতে চায়।
কিন্তু বলতে পারেনা। ঐ দুটি চোখের দিকে তাকিয়ে দীপনের মনটা ও কেমন যেন
বিষণ্ন হয়ে যায়। প্রায় বারোদিন হল মেয়েটি এসেছে ওদের বাসায়। দীপনের মায়ের
মামাতো বোন মাজেদার মেয়ে। এখানে থেকে কলেজে পড়বে। ওর নাম রুনু। রুনুর বাবা
নেই। মাজেদার কথা উপেক্ষা করতে পারেননি দীপনের মা সালেহা বেগম। কিন্তু
দীপনের বাবা কামরুজ্জামান বড্ড রেগে গেছেন। টাকা পয়সা বুঝি খোলামকুচি।
রাখবার জায়গা পাওনা। তাই মানুষ ধরে ধরে আনছো। আশ্রয় দিচ্ছো। আমাকে একবার
জিজ্ঞেস করবারও প্রয়োজন মনে করোনি। গজগজ করেছিলেন তিনি। বেশ উচুস্বরেই
বলছিলেন। পাশের ঘর থেকে রুনু সবই শুনতে পাচ্ছিলো। দীপনের এতো খারাপ
লাগছিলো। বাসা থেকে চলে যেতে ইচ্ছে করছিলো। সালেহা বেগম ব্যাকুল হয়ে
স্বামীকে থামাতে চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কামরুজ্জামান একগুয়ে প্রকৃতির লোক।
বাধা পেয়ে আরো চিৎকার করছিলেন। এসব রুনু যখন সদ্য এসেছে তখনকার কথা। বড্ড
শান্ত মেয়েটি। আশ্রুভরা দুটি চোখে টলটল করছিলো। মুখোমুখি ঘর। দীপন সবই
দেখতে পাচ্ছিলো। রুনুর মা রুনুকে রেখে তখন চলে গেছেন। গ্রামের বাড়িতে থাকেন
তিনি। বাড়ি খালি। তাই তাঁকে সাত তাড়াতাড়ি চলে যেতে হয়েছে। কামরুজ্জামান
তখন অফিসে। বাসায় ফিরে সব শুনে তিনি গর্জন করে উঠেছেন। অত্যন্ত হিসেবী
মানুষ তিনি। প্রতিটি পাই পয়সার হিসেব রাখেন। সালেহা আশঙ্কায় কন্টকিত ছিলেন।
কিন্তু তবু মাজেদাকে ফেরাতে পারেননি তিনি। রুনু মেধাবী ছাত্রী। গ্রামের
স্কুল থেকে খুব ভালো রেজাল্ট করে ম্যাট্রিক পাশ করেছে। কাছাকাছি কোন কলেজ
নেই। মেয়ের পড়বার খুব ইচ্ছে। সাত পাঁচ ভেবে শেষ পর্যন্ত তিনি সালেহার কাছে
এসেছেন। লজ্জা তাঁরও হচ্ছিলো। রুনুরও হচ্ছিলো। কিন্তু হোস্টেলে রেখে পড়াবার
মত সঙ্গতি তাঁর ছিলনা। সালেহা অত্যন্ত কোমল মনের মানুষ। আশঙ্কা থাকা
সত্বেও তিনি মাজেদাকে ফিরিয়ে দিতে পারেননি। দীপন কলেজ থেকে ফিরে মায়ের মুখে
সব শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো। নিজের বাবাকে সে ভালো করেই চেনে। বাড়িতে
অতিথি অভ্যাগত এলেও তিনি রেগে যান। তাই জল কতদূর গড়াবে সে বুঝতে পারছিলোনা।
সালেহা হাঁস মুরগি পালেন। তাঁর নিজের গোপন পুঁজি আছে। বেশি ঠেকে গেলে সেই
পুঁজিতে হাত পড়ে। দীপন ইঞ্জিনিয়ারিং এ শেষ বর্ষে পড়ে। সে কলেজ থেকে ফিরে
খাওয়া দাওয়া সেরে নিজের ঘরে শুয়েছিলো। খোলা জানালা দিয়ে উঠোনের দিকে চোখ
গেলো। দেখতে পেলো রুনু বাড়িতে ঢুকছে। চৈত্র মাসের কড়া রোদে সে প্রচণ্ড ঘেমে
গেছে। মুখ লাল। দীপন তাকিয়ে রইলো। সে মায়ের মুখে শুনেছে রুনু দুটি টিউশনি
নিয়েছে। তার খুব মায়া হচ্ছিলো। এইটুকু বয়সে জীবনযুদ্ধ নেমে পড়তে হয়েছে
রুনুকে। রুনুর মুখ থেকে সে চোখ সরাতে পারছিলোনা। এই সময়ে রুনুর চোখ পড়লো
দীপনের দিকে। সে লজ্জিত মুখে দ্রুতপায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। শুক্রবার
ছুটির দিন। রুনু ভোরে উঠে নামাজ পড়ে চা নাশতা বানাতে গেল। সালেহা বললেন,
‘রুনু, তুমি এতো সকালে উঠেছো কেন। আজ ছুটির দিন। আজ এককটু রেস্ট নাও।
প্রত্যেকদিন তো অনেক পরিশ্রম কর।’ রুনু বললো, ‘খালাম্মা, আজ আমি নাশতা
বানাব। প্রত্যেকদিন তো কলেজে যেতে হয়। কোন কাজ করতে পারিনা। সব কাজ আপনি
একা করেন। আমার খুব খারাপ লাগে।’ সালেহা বললেন, শোন মেয়ের কথা। চারজন
মানুষের এমন কিইবা কাজ। ভূনির মাতো ঘর ঝাঁট দিয়া মোছা, কাপড় কাচা থালা বাসন
ধোয়া সব কাজ করে দেয়। এই খুন্তি নাড়াটাও আমি করতে পারবনা ?’ রুনু বললো ‘তা
হোক’ আজকে ছুটির দিনটায় আপনি একটু বিশ্রাম নিন। রান্নাবান্না সব আজ আমি
করব।’ নিজের ঘর থেকে দীপন সব শুনতে পায়। মেয়েটিকে সে যত দেখছে, ততই একটা
অপূর্ব ভালো লাগায় তার মনটা ভরে যাচ্ছে। বাড়িতে যতক্ষণ থাকে, শুয়ে বসে
থাকেনা। বিকেলে চা বানায়, বাইরে শুকুতে দেয়া কাপড় ভাঁজ করে ঘরে আনে,
ফার্ণিচার মোছে, সব ঘরের বিছানা সব সময় পরিপাটি করে রাখে। মায়ের লাগানো
গাছগুলিতে প্রতিদিন পানি দেয়। মোটকথা, একটা না একটা কাজে এসে ব্যস্ত। অনেক
রাত পর্যন্ত সে পড়াশোনা করে। তবুও ভোরে উঠে পড়ে। মাকে সাহায্য করে। দীপন
বুঝতে পারছে, দিন দিন মা রুনুকে খুব বেশি ভালোবেসে ফেলছেন। আসলে ভালোবাসা
কেড়ে নেবার মত মেয়েই রুনু। বাবা কিন্তু তাঁর জায়গা থেকে একচুলও নড়ছেননা।
আগের মত তর্জন গর্জন করছেন না বটে। তবে রুনু তাঁর সামনে চায়ের কাপটা দিলে
গম্ভীর মুখে চা খান। রুনুর সঙ্গে কোন কথা বলেননা। তার দিকে তাকাননা
পর্যন্ত। দীপন বুঝতে পারে, রুনু খুবই অপমানি বোধ করে। কিন্তু মুখে কিছুই
বলেনা। মলিন মুখে সরে যায়। দীপনের বুকে কাঁটা বেঁধে। সে নিজের কাছে
অস্বীকার করতে পারবেনা যে রুনুকে তার খুব বেশি ভালো লেগে গেছে। বাবার এই
ব্যবহারে সে মরমে মরে যায়। কিন্তু কিছুই করার নেই। সালেহা অবিশ্যি
কামরুজ্জামানকে বোঝাবার চেষ্টা করছেন নিরন্তর। রুনু পড়াশোনায় এতো ভালো।
এদিকে ঘরের কাজেও এতটুকু গাফিলতি নেই। যেই ঘরে যাবে, সেই ঘরই আলো করবে।
বাড়িতে থাকলে সে একমুহূর্ত ও বসে থাকেনা। সালেহাকে কোন কাজই করতে দেয়না।
কামরুজ্জামান গম্ভীর মুখে সব শোনেন। কোন মন্তব্য করেননা। তিনি বাড়িতে ফিরলে
তাঁর ছাড়া কাপড় রুনু বাইরের তারে নিয়ে মেলে দেয়। ঘাম শুকুলে আবার ঘরে এনে
ভাঁজ করে রাখে। দীপনের জামা কাপড় ও আজকাল ঝকঝকে। পরিপাটি। ভুনির মা
তাড়াহুড়া করে ধোয়। অনেক সময় ঠিকমত পরিষ্কার হয়না। এসব দিকে তার তীক্ষè
দৃষ্টি। দীপনের একদিকে ভালো লাগে। অন্যদিকে রুনুর জন্য কষ্ট হয়। কলেজে
ক্লাশ করে। টিউশনি করে। আবার ঘরের কাজও এতো নিখুঁতভাবে করে। এইটুকু একটা
মেয়ে। কি করে এতো খাটে দীপন বুঝতে পারেনা। দীপনের সঙ্গে আজকাল একটু ফ্রি
হয়েছে রুনু। দীপন মাঝে মাঝে বলে, ‘ তোমার কি একটু বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে করে
না ? রুনু হাসে বলে, আমার কাজ করতে ভাল লাগে। খালাম্মা কে কাজ করতে দেখলে
আমার খুব খারাপ লাগে। মাজেদা দেশের বাড়ি থেকে এক বস্তা চাল, কিছু তরিতরকারি
পাঠিয়েছেন। মাজেদা জানেন সালেহা তাঁর কাছ থেকে কিছুতেই টাকা নেবেননা।
কিন্তু তাই বলে মাজেদা তো নিশ্চিন্ত থাকতে পারেননা। বাড়ি থেকে গ্রামের কোন
লোক শহরে এলেই তার মারফত তিনি কিছু না কিছু পাঠাবেনই। সালেহা অনুযোগ কররেন,
‘এতো কিছু পাঠাবার কি দরকার ? আমরা কি পর ? আমার কাছে মেয়ে আছে বলে সে কি
পানিতে পড়েছে ?’ মাজেদা বলেন ‘ছি ছি বুবু, তুমি এসব কি বলছো ? এতো কিইবা
দিতে পারি। তুমি ওকে যেই আদরে রেখেছো। আজকাল বাজার যেমন আগুন। সব কিছুইতো
তোমাদের কিনে খেতে হয়। রুনুর কাছে শুনি তো সব। মোবাইলে প্রতিদিন মেয়ের
সঙ্গে কথা বলেন মাজেদা। সালেহার সঙ্গেও কথা হয় তাঁর। সালেহা বলেন, ‘আমি
তোকে নিষেধ করছি মাজেদা। তোকে কিছু পাঠাতে হবেনা। তোর মেয়ে কি আমার কেউ নয় ?
আমার ঘর আলো করে রেখেছে ও। এমন একটি লক্ষ্মী মেয়ে যে ঘরে যাবে, সেই ঘরই
আলো করে রাখবে।’ মাজেদা বললেন, ‘বুবু, দোয়া কোরো। তুমি না থাকলে আমার
সাধ্যি ছিলোনা ওকে পড়াবার। মেট্রিকে এতো ভালো রেজাল্ট করলো। কলেজে পড়বার
শখ। কিন্তু ধারে কাছে কোন কলেজ নেই। মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। কিন্তু
করতে করতে তোমার কথা মনে হল। জানিতো, তোমার মনটা চিরকালই বড্ড নরম। কিন্তু
তবুও মন কিছুতেই সায় দেয়না। শেষ পর্যন্ত আর কোন উপায় না দেখে তোমার উপরই ভর
করলাম। তুমি তো এক কথাতেই রাজী। বুকের উপর থেকে যেন একটা পাষাণভার নেমে
গেল। বুবু, তোমাকে একটা কথা বলি। কথটা কিন্তু রাখতেই হবে। সামনের ছুটিতে
তোমরা সবাই আমার এখানে বেড়াতে আসবে। তিন চারদিন থাকবে। সালেহা সশব্দে হেসে
উঠলেন। ‘পাগল হয়েছিস? দীপনের বাবা কিছুতেই রাজী হবেনা।’ মাজেদা বললেন,
‘তাকে রাজি করবার ভার আমার।’ শেষ পর্যন্ত কামরুজ্জামান রাজী হলেন। সালেহা
পিঠা পায়েস তৈরী করে নিলেন। দোকান থেকে খুব ভালো কেক কিনে নিলেন। রুনু অনেক
বাধা দিলো। কিন্তু তিনি কিছুতেই শুনলেন না। মাজেদার বাড়িতে এসে দীপন মুগ্ধ
হয়ে গেল। পাখি ডাকা, ছায়ায় ঢাকা গ্রাম একই বলে। একতলা দালান। বাড়িটা ঘিরে
প্রচুর গাছ গাছালি। উঠোনটা ঝক ঝক করছে। বাড়িটা যদি ও পুরনো, তবুও অসুন্দর
নয়। চারটি ঘর। প্রতিটি ঘরে মাজেদার সযত্ন হাতের স্পর্শ। বাড়ির ভেতরের দিকে
একটা পুকুরও আছে। ঝিরি ঝিরি বাতাসে সেই পুকুরের ঘাটে বসে থাকতে কি আরাম।
স্নিগ্ধ মায়াময় একটা পরিবেশ। মাজেদার স্বামী বেঁচে থাকতে তাঁদের আর্থিক
অবস্থা বেশ ভালই ছিল। বেশ কিছু জমি ছিলো। তাদের দিন হেসে খেলে ভালোই কেটে
যেতো কিন্তু হঠাৎ মাজেদার স্বামীর ক্যানসার ধরা পড়লো। তাঁর চিকিৎসায় সব জমি
বিক্রি হয়ে গেছে। এখন সামান্য কিছু জমি আছে। আর আছে এই ভিটেবাড়িটুকু। এতেই
কোনমতে চলে যায় মা মেয়ের দিন। মাজেদা অত্যন্ত হিসেবী। হাঁস মুরগি গরু ছাগল
পালেন। একটি লোক রেখেছেন। নিজেও অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। দুদিন থাকবেন ভেবে
গিয়েছিলেন সালেহা কামরুজ্জামান। কিন্তু মাজেদার সঙ্গে কিছুতেই পেরে
উঠলেননা। দুদিনের জায়গায় চারদিন থাকতে হল। আসলে পরিবেশটা সকলেরই এতো ভালো
লেগে গিয়েছিলো যে, মাজেদার কথা পেলতে পারলেননা। আর মাজেদার অপূর্ব রান্না।
নানা রকম মজাদার রান্না করে খাইয়ে তাদের মেরে ফেলবার জোগাড়। মায়ের সঙ্গে
রুনু ও সারাক্ষণ ছুটোছুটি করে সাহায্য করছিলো। সবাই পুকুরে গোসল করেছে। এতে
টলটলে স্বচ্ছ জল। এতে গোসল করতে কি যে আরাম। কাপড় ছাড়ার জন্য পুকুরের পাড়ে
একটা বাথরুম করা হয়েছে। অবাধ, মুক্ত এই পরিবেশে এসে কামরুজ্জামানের
খিটখিটে মেজাজও ভালো হয়ে গেল। তাঁর গম্ভীর মুখে এখন হাসি আর ধরেনা। ফিরে
যাবার সময় সকলেরই মন খারাপ। দীপনের তো রীতিমত কষ্ট হচ্ছিলো। শহরের ইটকাঠের
বাড়িতে যেন কোন প্রাণ নেই। দীপনের মনে হচ্ছিলো কবি ঠিকই বলেছেন, ইটের পরে
ইট। মাঝে মানুষ কীট। নাইকো ভালোবাসা। তার পরের লাইনটা আর কিছুতেই মনে করতে
পারলোনা। এই কদিন বাঁধনছাড়া এই মুক্ত পরিবেশে যত্রতত্র সে ঘুরে বেড়িয়েছে
অবাধ আনন্দে। এই কদিন রুনুর সঙ্গ খুব বেশি পেয়েছে। শহরের বাসায় রুনুকে তো
কাছেই পাওয়া যায় না। সে থাকে কলেজে। টিউশনে। বাসায় থাকলেও ব্যস্ত থাকে নানা
কাজে। রান্নাঘরে। তাই এই কটা দিন দীপন যেন কোন স্বর্গলোকে বিচরণ করছিলো।
বাবাকে দেখে ও সে অবাক চিরকালের হাড়িমুখ বাবার কি প্রাণবন্ত হাসি। কোন
যাদুর কাঠিতে যেন সেই খিটখিটে তিরিক্ষি মেজাজের কামরুজ্জামানের মধ্যে
প্রাণসঞ্চার হয়েছে। এই কদিন প্রাণখুলে হেসেছেন। গল্প করেছেন। আবার সেই বদ্ধ
পরিবেশে ফিরে যেতে হবে। আবার সেই খাঁচায় গিয়ে ঢোকা। মাজেদাও খুব বিষণ্ন
হয়ে গেলেন। বললেন, আবার আমি যেই একা সেই একা। সালেহা বললেন, তোকেও আমাদের
বাসায় গিয়ে কটাদিন বেরিয়ে আসতে হবে। মাজেদা বললেন ক্ষেপেছো ? আমার এই গরু
ছাগল হাঁস মুরগি ফেলে তো মরবারও ফুরসত নেই। সবাই হেসে উঠলো।.... দীপনের
ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষার ফাইনাল হয়ে গেছে। পরীক্ষা বেশ ভালো হয়েছে। রুনুরও
সামনে আইএসসি ফাইনাল পরীক্ষা। দীপনের খুব খারাপ লাগে। একই বাসায় থেকেও
রুনুর সঙ্গে তার দেখা হয়ইনা বলতে গেলে। একসময়ে রুনুর পরীক্ষা ও শেষ হল।
কয়েকদিনের মধ্যে সে বাড়িতে চলে যাবে। এই সময়ে কামরুজ্জামান একদিন সালেহাকে
ডেকে বললেন দীপনের জন্য তিনি পাত্রী ঠিক করেছেন। তাঁর বন্ধু আবদুল আউয়ালের
মেয়ে তসলিমা। সে এখন বিএ প্রথম বর্ষে পড়ছে। দেখতে ভালো। বসচেয়ে বড় কথা
আবদুল আউয়াল ব্যবসায়ী। প্রচুর টাকা তাঁর। মেয়ের বিয়েতে কোন কার্পণ্য
করবেননা। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো দীপনের। সালেহাও অস্থির হয়ে পড়লেন। তিনি
স্বামীকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে, বড়লোকের মেয়েরা বউ হিসেবে ভালো হয় না।
এদের মন থাকে বাইরে। খালি শপিং এর ধান্দায় থাকে এরা। কিন্তু কামরুজ্জামানকে
বোঝায় সাধ্যি কার। টাকার গন্ধে তিনি ব্যাকুল। আবদুল আউয়াল নিজের মুখে
বলেছেন, জামাইকে দেয়া থোয়ায় তিনি কোন কমতি রাখবেননা। তিনি জানেন সালেহা
ছেলের বউ হিসেবে রুনুকে পেতে চান। তিনি নিজেও জানেন, রুনু মেয়েটি বেশ ভালো।
ইদানিং রুনুর সঙ্গে তিনি বেশ ভালো ব্যবহার করেন। কিন্তু তাই বলে ছেলের বউ
করবেন এটা ভাবতে পারেন না। ভালো মেয়ে কি ধুয়ে খাবেন। তাদের যে মূলেই গলদ।
এক পয়সা পাওয়ার আশা নেই এখানে। দীপন মাকে জানিয়ে দিলো রুনুকে ছাড়া আর কাউকে
সে বিয়ে করবেনা। সালেহাও তো তাই চান। রুনুকে ছাড়া অন্য কাউকে তিনি ছেলের
বউ হিসেবে মেনে নিতে পারবেন না। তাদের একটি মাত্র ছেলে। তাদের তো এতো টাকার
দরকার নেই। ছেলে যাকে নিয়ে সুখী হবে, তিনিও তাতেই সুখী। বউ নিয়ে ঘর করবে
ছেলে। কাজেই তার মতেরই প্রাধান্য দিতে হবে। দীপন টাকা পয়সা ধন দৌলত চায়না।
দীপন মায়ের ঘরে ঢুকে দেখলো রুনু বসে আছে মায়ের পাশে। তাকে ঢুকতে দেখে
তাকালো। তার চোখ দুটি টকটকে লাল। বোঝা যায় প্রচুর কেঁদেছে। দীপন
উদভ্রান্তের মতন মায়ের সামনেই বললো, তুমি কেন কাঁদছো খামাখা ? আমি তোমাকে
ছাড়া কাউকেই বিয়ে করবোনা। বাবা যদি বেশি জোর করেন, আমরা দুজন বাসা ছেড়ে চলে
যাব।’ সালেহা বললেন, ঠিক বলেছিস। এছাড়া আর কোন উপায় নেই। বিকেলে
কামরুজ্জামান বাসায় ফিরলেন গম্ভীরভাবে। স্বভাবতই তিনি গম্ভীর মেজাজের।
কিন্তু আজ তাঁর মুখের অবস্থা ভয়াবহ। কারো সঙ্গে কোন কথা বললেননা। সালেহা
এলেন চা নিয়ে কোন কথা না বলে চা টুকু খেয়ে শুয়ে পড়লেন। সালেহা ভয়ে ভয়ে
জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি শরীর খারাপ ?’ তিনি কোন জবাব দিলেন না। সন্ধ্যার
পর বাইরে বেরুবে বলে দীপন তৈরী হচ্ছিলো। রুনু ঢুকলো ঘরে। সুন্দর মুখটা
বিষণ্ন। দীপন কাছে এসে রুনুর মুখটা দুহাতে তুলে ধরে বললো, এ্যাই বোকা মেয়ে।
তুমি জানোনা আমি কেমন ছেলে ? আমাকে দিয়ে কখ্খনো যা খুশী করানো যায়না।
বুঝলে ? রুনু তেমনি বিষণ্ন ভঙ্গীতে বললো, কাল তো আমি বাড়িতে চলে যাচ্ছি।’
দীপন বললো, তাতে কি। এটা মোবাইলের যুগ। প্রতিমুহূর্তে খবর পাবে।’ দীপন
বেরুলো। পথে কামরুজ্জামানের অফিসের একজন অফিসারের সঙ্গে দেখা হল।
কামরুজ্জামানের সঙ্গে ওনার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা। মাঝে মাঝে দীপনদের বাসায় আসেন।
রিকশা থামিয়ে দীপনকে কাছে ডাকলেন। বললেন, তোমার বাবার কি অবস্থা ?’ দীপন
বললো, বাবা আজ ভয়ঙ্কর গম্ভীর। আমাদের কারো সঙ্গে কোন কথা বলছেননা। কাকু, কি
হয়েছে আপনি কিছু জানেন ?’ উনি বললেন, তোমার বিয়ে যেখানে ঠিক হয়েছিলো, ওরা
বিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছে। বড়লোক এবং প্রতিষ্ঠিত পাত্র পেয়েছে। সেখানেই মেয়ের
বিয়ে দেবে। উনি চলে গেলেন। একটা ভয়ঙ্কর উল্লাসে দীপন যেন ফেটে পড়বে। সে
দ্রুতপদে বাসার দিকে চললো। এক্ষুণি মাকে, রুনুকে খবরটা দিতে হবে।
