শপথের
মঞ্চে আজ নতুন সরকার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বের সরকার।
গণ-আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত ইতিহাসের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে
জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই সরকার আজ দায়িত্ব গ্রহণ করছে। সারা দেশের মানুষ
তাকিয়ে আছে নতুন সরকারের দিকে। তবে তাদের দৃষ্টিকেবল শপথের আনুষ্ঠানিকতায়
নয়; তারা তাকিয়ে আছে রাজনীতির আচরণের দিকে, রাষ্ট্রের আচরণের দিকে।
নির্বাচন
ক্ষমতার পালাবদল ঘটায়, ইতিহাস বদলায় আচরণ। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে
সরকার গঠন করা দলের সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-তারা ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার
করবে? কারণ, এই জনরায় উদযাপনের অনুমতি নয়; এটি শর্তযুক্ত আস্থা। জনগণ
সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু সেই সুযোগের সঙ্গে প্রত্যাশাও বেঁধে দিয়েছে।
এই
বিজয়কে যদি কেবল দলীয় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়, তবে তার অর্থ ছোট হয়ে যাবে।
মানুষ সরকার বদলাতে ভোট দেয়নি; তারা রাজনীতির চরিত্র বদলাতে ভোট দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে কিছু শব্দ স্থায়ীভাবে জুড়ে
গেছে-দলীয়করণ, দখলদারিত্ব, টেন্ডার সিন্ডিকেট, প্রশাসনিক পক্ষপাত,
মতপ্রকাশের সংকোচন। নাগরিক অভিজ্ঞতা বলছে, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন যত বেড়েছে,
জবাবদিহি তত কমেছে। এবারের ভোট যে সত্য স্পষ্ট করেছে তা হলো, জনগণ দীর্ঘ
সময় নীরব থাকতে পারে, কিন্তু অসহায় নয়। সুযোগ পেলে তারা বার্তা দেয়। এই
বার্তাই নতুন সরকারের জন্য একই সঙ্গে সতর্ক সংকেত এবং বিরল সুযোগ।
নতুন
সরকারের প্রথম কাজ প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করা নয়; নিজেদের ভেতরের দুর্বলতার
মুখোমুখি হওয়া। অতীতের অনভিপ্রেত চর্চা-চাঁদাবাজি, দখলবাজি, প্রভাব খাটিয়ে
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, সহিংসতা-যদি নতুন সময়েও অব্যাহত থাকে, তবে জনরায় দ্রুত
হতাশায় পরিণত হবে। তাই এই সরকারকে শুরুতেই একটি স্পষ্ট নীতি ঘোষণা জরুরি যা
পরিপালন করতে হবে: দলীয় পরিচয় কোনও অপরাধের ঢাল নয়।
সাধারণত ক্ষমতা
গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনই জনগণের কাছে সরকারের চরিত্র নির্ধারিত হয়। এই সময়ে
নতুন সরকারের জন্য কয়েকটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ জনতার আস্থার ভিত্তি গড়ে তুলতে
পারে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও দখলসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন কমিশন, পুলিশ
প্রশাসনে পদায়ন ও বদলির স্বচ্ছ নীতিমালা এবং রাজনৈতিক মামলাগুলোর নিরপেক্ষ
পর্যালোচনা-এসব বাস্তবায়িত হলে মানুষ বুঝবে পরিবর্তন কথায় নয়, কাজে রূপ
নিয়েছে।
নতুন সরকারের জন্য ছাত্ররাজনীতির প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান
অপরিহার্য। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সহিংসতা ও হল দখলের অভিযোগে
আলোচিত। নতুন প্রজন্ম রাজনীতিকে ভয়ের পরিবেশে নয়, নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্র
হিসেবে দেখতে চায়। অস্ত্রমুক্ত ক্যাম্পাস, নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং
প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে সেটি শুধু শিক্ষাঙ্গন নয়-জাতীয়
রাজনীতির ভবিষ্যৎ সংস্কৃতির সূচনা হবে।
ছাত্ররাজনীতি থাকবে, তবে তা হবে যুক্তি ও নীতির; পেশিশক্তির নয়।
বাংলাদেশের
গণতন্ত্রের বড় দুর্বলতা ছিল দল ও রাষ্ট্রের সীমারেখা মুছে যাওয়া। প্রশাসন,
পুলিশ ও বিচার বিভাগ দলীয় প্রভাবমুক্ত না হলে নির্বাচন যতই
প্রতিযোগিতামূলক হোক, গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল থাকে। বিরোধী দলের সভা
নির্বিঘ্নে হওয়া, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা
এবং আদালতের রায়ে নিরপেক্ষতার প্রতিফলন-এসবই হবে সরকারের রাজনৈতিক
পরিপক্বতার প্রকৃত মানদণ্ড। সহনশীল ক্ষমতাই টেকসই ক্ষমতা।
অর্থনৈতিক
বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই নতুন সরকারের কাছে। দ্রব্যমূল্যের চাপ,
বাজারে সিন্ডিকেট প্রভাব এবং কর্মসংস্থানের সংকট মানুষের জীবনের কেন্দ্রীয়
উদ্বেগ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত অর্থনৈতিক স্বস্তি। বাজার
ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, প্রতিযোগিতা কমিশনের কার্যকারিতা
বৃদ্ধি এবং কর নীতির দ্রুত সমন্বয় জরুরি।
শিল্পাঞ্চলভিত্তিক কারিগরি
প্রশিক্ষণ, স্টার্টআপ সহায়তা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণ নিশ্চিত না
হলে তরুণদের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। সরকারের সাফল্য বক্তৃতায়
নয়-মূল্যস্ফীতি কমল কিনা, কর্মসংস্থান বাড়লো কিনা- এই সূচকেই পরিমাপ হবে।
মত
প্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে দ্ব্যর্থহীন অবস্থান নিতে
হবে এই সরকারকে। সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে। যে
সরকার সমালোচনা যত বেশি সহ্য করতে পারে, তার স্থায়িত্ব তত বেশি হয়।
গণমাধ্যমের নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার এবং নাগরিক স্বাধীনতার
নিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য নয়-অভ্যন্তরীণ আস্থার ভিত্তির জন্য
জরুরি।
আজকের বাংলাদেশ আর আগের মতো নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে
অন্যায় গোপন থাকে না, প্রত্যাশা দ্রুত প্রকাশ পায়। জনগণ এখন ক্ষমতার অলংকার
নয়; অংশীদার হতে চায়। তারা দেখতে চায়-সরকার মানে দখল নয়, দায়িত্ব; রাজনীতি
মানে প্রতিশোধ নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠা।
নতুন সরকারের সামনে দুটি পথ খোলা।
একটি প্রচলিত ক্ষমতার স্বল্পমেয়াদি সুবিধা, যার পরিণতি দীর্ঘমেয়াদি
অস্থিরতা। অন্যটি সংস্কারের পথ: প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি, আইনের সমান প্রয়োগ
এবং নৈতিক মানদণ্ডের প্রতিষ্ঠা। দ্বিতীয় পথটি কঠিন, কিন্তু টেকসই।
যদি
প্রমাণ করা যায় যে নিজ দলের অপরাধীও আইনের মুখোমুখি হবে, প্রশাসন দলীয়করণের
বাইরে থাকবে, ছাত্ররাজনীতি সহিংসতামুক্ত হবে এবং অর্থনীতি মানুষের স্বস্তি
ফিরিয়ে দেবে-তবে এই সরকার কেবল একটি প্রশাসন হবে না; একটি রাজনৈতিক
সংস্কৃতির পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে।
আজ শপথের দিনে
প্রকৃত অর্থে এখন থেকেই শুরু হলো জবাবদিহির সময়। জনতার আদালত নীরব, কিন্তু
স্থায়ী। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়- বিশ্বাসই আসল রায়। ক্ষমতা আজ তাদের
হাতে; ইতিহাসের কলমও তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এখন দেখার বিষয় তারা ক্ষমতাকে
ভোগের সম্পদ বানায়, নাকি জনগণের আমানত হিসেবে রক্ষা করে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট
