
জাকির
হোসেন কখনো কখনো পরিহাস ছলে নিজেকে কুমিল্লার কুট্টি বলতেন।এতে তাঁর মাঝে
একধরণের প্রচ্ছন্ন গর্ববোধ লক্ষ্য করতাম। অবশ্য এমনটি হবার কারণও ছিলো।
যেমন-তাঁর বাবার বাড়ি কুমিল্লা সীমান্ত সংলগ্ন অরণ্যপুর গ্রামে।
জন্মেছিলেন
নানার বাড়ি কুমিল্লার দক্ষিণ চর্থার মাস্টার বাড়িতে। মায়ের পূর্বপুরুষ
রহিমুদ্দীন মাস্টারের নামে পরিচিত কুমিল্লার এই বাড়িটিতে পরমানন্দে কেটেছিল
তার শৈশব।সমবয়সীদের সাথে খেলাধুলা,হৈ চৈ, পুকুরে সাঁতার কাটা,সঙ্গীত
অনুরাগী নানা আনছার আলী সাহেবের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে কুমিল্লা বিমানবন্দর
দেখতে যাওয়া, সবই ছিল তাঁর এই বাড়ি কেন্দ্রিক। এ ছাড়া মহাত্মা গান্ধীর
স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক অভয় আশ্রমে ভর্তি হয়ে সেখানকার চরকায় সুতা কাটা ও
ব্রতচারী নৃত্যের অনুশীলন প্রত্যক্ষ করা, স্বদেশী আন্দোলনের অনুসারী পরিমল
দত্তের গান শোনে রবীন্দ্র সঙ্গীতের অনুরাগী হওয়া,দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে
রাজনীতির সবক নেওয়া, এবং পরবর্তীতে দেশ সেবায় নিজেকে সঁপে দেয়া সবই ছিলো
তাঁর কুমিল্লা কেন্দ্রিক।
অগ্রজ খালাতো বোন রওশন আরা ফিরোজ উনার
স্মৃতিচারণে বলছেন-‘খালুর বদলীজনিত সরকারী চাকরির কারণে দেশের
বিভিন্নস্কুলে পাঠ গ্রহণ শেষে মাগুড়ার মোহাম্মদপুর হাইস্কুল থেকে ১৯৬৫ সনে
এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জাকির হোসেনের পুনরাগমণ ঘটেছিল কুমিল্লায়
ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তির মাধ্যমে।’ সতীর্থ মুশতাক আহমেদ হেলালের
ভাষ্যমতে–‘প্রথম দিন ক্লাসের বেঞ্চে একজন সুদর্শন নাদুস-নুদুস তরুণ এসে
আমাকে সালাম দিয়ে সামনে দাঁড়ালেন।গায়ে সাদা সিল্কের ফুলশার্ট,পরনে গিয়ে
রঙের গ্যাবাডিনের প্যান্ট,পায়ে ডিমের কুসুম রঙের এলবার্ট সু,গলায় লকেটসহ
চেইন। নাম জাকির হোসেন।’
জাকির হোসেন কি করে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন‘ছাত্র ইউনিয়ন’এর সাথে সম্পৃক্ত হলেন সেকথাও বলেছেন তিনি তাঁর স্মৃতিকথায়।
‘আমাদের
পাড়ার মহিউদ্দিন ভাই ছাত্র ইউনিয়ন করতেন।তিনি একদিন আমাকে ক্লাশ ছুটির পর
বিকেলে কলেজের পুকুর পাড়ে,পশ্চিম প্রান্তে,এক জমায়েতে আমন্ত্রণ জানালেন।
ক্লাস শেষে সেখানে গিয়ে আমি বেশ কয়েকজনকে পেলাম। অন্যদের মধ্যে ছিলেন শফিক
ভাই এবং রাজু ভাই। আমাদের ব্যাচেরও বারোজন ছাত্র উপস্থিত ছিল। অন্যান্যদের
মাঝে জাকির হোসেনকেও দেখতে পেলাম,এটা ছিল তাঁর সাথে আমার দ্বিতীয়
সাক্ষাৎ।’
তিনি বলছেন-‘সেই দিন থেকে শুরু হয়ে গেল প্রগতির পথে জাকির
হোসেনের নিরন্তর পথচলা।কোটবাড়ি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্র ইউনিয়নের কমিটি
করা যাচ্ছেনা একথা জেনে ভিক্টোরিয়া কলেজ ছেড়ে জাকির হোসেন ভর্তি হলেন
কোটবাড়ি পলিটেকনিকে।এমনই ছিল তাঁর এডভেঞ্চার।’
মুশতাক আহমেদ হেলাল আরো
জানিয়েছেন- ‘ছাত্র ইউনিয়নে যোগদানের পর থেকেই ক্রমশ পাল্টে যেতে থাকেন
জাকির হোসেন।চলন-বলন,পোশাক- আশাক,জামা-জুতো, খাদ্যাভ্যাস, যাপিত জীবন সব
কিছুই বদলে গিয়েছিল তাঁর। সিল্কের জামার পরিবর্তে শরীরে উঠেছিল
কটন-খদ্দর।জুতোর পরিবর্তে চপ্পল।
সংগঠনের কাজে দিনভর ছোটাছুটি করতে
করতে গায়ের রং হয়ে গেছিল তামাটে। গলার স্বর্ণের লকেট চেইন কোথায় পড়ে রইলো
সেদিকে নজর দেবার আর ফুরসত থাকলোনা জাকির হোসেনের।’
এইভাবে সময়ের
প্রয়োজনে,দেশের প্রয়োজনে এবং আদর্শের প্রয়োজনে নিজেকে ছাড়িয়ে গিয়ে জাকির
হোসেন রূপান্তরিত হয়ে গেছিলেন অন্য এক জাকির হোসেনে। যাকে বলে
শ্রেণীচ্যুত। কমিউনিস্টরা যাকে বলেন ‘ ডি-ক্লাসড’। তদুপরি- ধর্ম-কর্ম-
সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা দার্শনিক রাজনীতিক ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর
আহমদের সাহচর্য তাঁর মনে যে আগুনের পরশমণি ছুঁইয়ে দিয়েছিল,সে আগুনে তাঁর
সকল অহংকার,বিলাস-ব্যসন,ভোগতৃষ্ণা কামনা-বাসনা জ্বলেপুড়ে নিঃশেষ হয়ে
গিয়েছিল। তাঁর আর হারাবার কিছু অবশিষ্ট
ছিলোনা।পড়াশোনা,চাকরি-বাকরি,আয়-রোজগার, আরাম-আয়েশ সববিসর্জন দিয়ে তিনি তাঁর
ভোগের ঘরে তালা মেরে দিয়েছিলন। যে কারণে একসময় ন্যাপের প্রদীপের তেল
তলানিতে এসে ঠেকলেও জাকির হোসেন ঠিকই আলো দিয়ে আলো জ্বেলে গেছেন। আপন আলোয়
পথ চিনেছেন। জাকির হোসেন বাংলাদেশের গরীব মেহনতি মানুষের সুখী-সুন্দর
জীবনের স্বপ্নদেখতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন স্বপ্নথেকেই সঞ্জাত হয় অঙ্গীকার।
অঙ্গীকার থেকে আলোড়ন, আলোড়ন থেকে আসে বিপ্লব। তাই কোন ব্যক্তিগত লোভ
ক্ষণিকের জন্যেও তার কলুষ নিঃশ্বাসের ছোঁয়ায় জাকির হোসেনের আদর্শকে অনুচিত
করতে পারেনি। রাজনীতির হাটে আসর জমাতে গেলে যে পাটোয়ারী বুদ্ধি লাগে সেটি
তাঁর ছিলোনা। জার্মান ভাষায় যাকে বলে ‘রিয়েল পলিটিকার’ অর্থাৎ বাস্তব
রাজনীতির পাটোয়ারী,সেটি তিনি ছিলেননা। রাজনীতিতে টিকে থাকতে গেলে যে নোংরা
ঘাটতে হয় সে নোংরা ঘাটার প্রবৃত্তি তাঁর ছিলোনা। তবে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের
ঘোরপ্যাচ সম্পর্কে তাঁর সম্যক ধারণা ছিল বলে ন্যাপের নেতা, কর্মীদের মাঝে
তাঁর একটা আলাদা ভাবমূর্তি ছিল।

দান-ধ্যানে,মন-মননে,ত্যাগ-তিতিক্ষায় ও
জীবনাচরণে সমকালীন ন্যাপের নেতা কর্মীদের মধ্যে তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল
ঈর্ষণীয়। তিনি মনে করতেন লড়াইয়ে জিততে হলে সারাক্ষণ লড়াই চালিয়ে যেতে
হয়।নচেৎ নিঃশেষ হয়ে যেতে হয়। মৃত্যুর ছায়া তাঁকে মানুষের মন থেকে আড়াল করতে
পারেনি। তাইতো জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের সহযাত্রী বশীর
বলেন- জাকির ভাইয়ের কবরের পাশে যেন তাঁকে কবর দেয়া হয়। তাইতো-
“এই পৃথিবীর সব আলো একদিন নিভে যাবে যবে
বেঁচে রবে বশীরের অমর কাব্য পৃথিবীর পরে।”
বশীর
হোসেনের ন্যায় আরো কতোজন যে জাকির হোসেনের সম্মোহনী ব্যক্তিত্বে মোহিত হয়ে
ঘর সংসার ত্যাজি মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন কবিতার সুলতান’
সৈয়দ আহমাদ তারেক সে ছবিও এঁকেছেন তাঁর কবিতায়-
‘দুনিয়ার মজলুম জনতার শোভাযাত্রায়,
রক্তক্ষরণে নিকোটিনের টানে
ডালভাত রাজনীতির মাঠে তোমাকে দেখি কমরেড।’
অনুজ সহোদর ওয়ালী হোসেন জানিয়েছেন-
‘ডাল
ভাতের রাজনীতি তথা সমাজতন্ত্রের সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে জাকির হোসেন পার্টির
বৃত্তের বাইরে গিয়ে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন-উদীচী,খেলাঘর,
শিল্পকলা একাডেমী, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, কুমিল্লা বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তনের সাথে।
সুতাকল
শ্রমিক ও রিক্সা শ্রমিকদের আন্দোলনের সাথেও ছিলো তাঁর গভীর
সম্পৃক্ততা।পাকিস্তান আমলে নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির গোপন সেলের
সদস্যও ছিলেন জাকির হোসেন।’
দুর্ভাগ্যক্রমে পার্টির উপরমহলের
নেতা-কর্মীদের পেটি-বুর্জোয়া সুলভ আচার আচরণের কারণে আধা সামন্ত
-তান্ত্রিক,আধা পুঁজিবাদী গোলক ধাঁধা তাঁকে সেদিন ওপথে এগোতে না দিয়ে পিছু
টেনে ধরেছে,এ ব্যর্থতার বোঝা আমরণ বয়ে গেছেন জাকির হোসেন।
বাংলাদেশ
ব্যাংকের সাবেক পরিচালক আফতাব উল ইসলাম মঞ্জু যখন বলেন- ‘রাজনীতিতে
সততা,একনিষ্ঠতা, হৃদয় দিয়ে মানুষকে কাছে নেয়ার যে মানসিকতা এর পুরোটাই
বিদ্যমান ছিলো জাকির হোসেনের মাঝে’- তখন যথার্থই বলেন। তাঁর দল ন্যাপ যখন
ভাঙনের মুখে তখন স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা জাকির হোসেনের মাঝে
ক্যাসাবিয়াঙ্কার প্রতিচ্ছবি দেখতেন কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি
বীর মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল হক দুলাল।
এখানেই জাকির হোসেন অনন্য।
ভিক্টোরিয়া কলেজের সাবেক অধ্যাপক,বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক শান্তি রঞ্জন ভৌমিকও
তেমনটি মনে করেন। তিনি বলেন,’সেদিনের কুমিল্লায় আদর্শবাদী রাজনীতির চর্চা
করে গেছেন একমাত্র জাকির হোসেন।’ ভিক্টোরিয়া কলেজের সাবেক ভিপি জাকির
হোসেনের বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বী খ্যাতনামা বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজমুল হাসান
পাখীও যখন তাঁকে রাজনীতি জ্ঞানসমৃদ্ধ সহজ জীবনাচরণের মানুষ বলেন, তখন বুঝতে
বাকি থাকেনা কেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জননেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য জাকির
হোসেনকে কুমিল্লার জনগণের অন্যতম জনগণমন অধিনায়ক গণ্য করতেন। ভারতের
দেরাদুন ক্যাম্পে মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষক,আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা
সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ আহমাদ ফারুখের মতে জাকির হোসেন ছিলেন ভোগ-ব্যসনে
নির্লিপ্ত,বৈষয়িক বিষয়সম্পদের প্রতি ভীষণ রকম উদাসীন।পরের কারণে মরণেও সুখ
এমন দর্শনে বিশ্বাসী।
ভিক্টোরিয়া কলেজের স্বনামধন্য ভিপি, কুমিল্লা
জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান,বীর মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক সহযোদ্ধা জাকির
হোসেনের মৃত্যুকে রাজনীতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি আখ্যায়িত করে নিজের
মর্মবেদনা প্রকাশ করেছেন তাঁর স্মৃতি কথায়। জাকির হোসেন ছিলেন আজন্ম
রাজনীতিবিদ,কোন বাঁধা তাঁকে রাজনীতি থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি,লেখক-গবেষক
এডভোকেট গোলাম ফারুকের এহেন কথা প্রতিধ্বনিত হয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকারের
কৃষি,খাদ্য,মৎস্য ও পশু সম্পদ বিষয়ক মন্ত্রী আমিনুর রশীদ ইয়াসিনের
জবানীতেও। তিনি বলেন, ‘কোটবাড়ি পলিটেকনিকে জাকির হোসেন কেবল আমার বড় ভাই
হাতেমুর রশীদের ছাত্র রাজনীতির হাতেখড়িই দেননি,কুমিল্লার স্থানীয় রাজনীতি
সম্পর্কে আমারও প্রাথমিক ধারণা হয়েছিল জাকির হোসেনের সাহচর্যে এসে।’
বীরমুক্তিযোদ্ধা নাছিরুল ইসলাম চৌধুরী জুয়েলও দীক্ষাগুরু সম্বোধন করতেন
জাকির হোসেনকে। ডাকসাইটে জমিদার পরিবারের সন্তান জুয়েল চৌধুরী জানাচ্ছেন,
‘চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সময় উনারা দুজনেই মেসে নুন ভাত খেয়ে দিন কাটাতেন’।
তিনি
বলছেন,’যেদিন ডাল দিয়ে ভাত রান্না হতো সেদিনের খুশির কথা আজো ভুলিনি’।
চাইলে তাদের পক্ষে ভালো খাবারের আয়োজন করা কোন ব্যাপার ছিলোনা। কিন্তু ঐ যে
তাঁর দীক্ষাগুরু জাকির হোসেন-যিনি কিনা সেদিনের দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের
মুখে খাবার দিয়ে তবে নিজে খাবার গ্রহণ করতেন,তাঁর জন্যে সেটি সম্ভব হতো
না। ভাবা যায়! মানুষের জন্য কতটা নিবেদিতপ্রাণ হলে কারো পক্ষে এমনটি করা
সম্ভব?
এমন কতো শত স্মৃতি কথায় ভরপুর ‘তুমি রবে নীরবে সরবে’ জাকির হোসেনের স্মারকগ্রন্থখানি।
আমার
এ ক্ষুদ্র জীবনে মনন প্রজ্ঞায় উজ্জ্বল যেসব মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি
তাঁদের তালিকাটি বেশ দীর্ঘ হলেও এই তালিকায় জাকির হোসেনদের সংখ্যা অতি
নগণ্য। কারণ,বছরে বছরে জাকির হোসেনদের জন্ম হয়না,যুগের পর যুগ চলে গেলে
পরে দু’একজন জাকির হোসেনের জন্ম হয়। জয়তু জাকির হোসেন।
লেখকঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা,প্রেসিডিয়াম সদস্য,ন্যাপ কেন্দ্রীয় কমিটি।