
দেশের
বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা একটু বেশি। যদিও
সাধারণ জনগণের যে ধরনের প্রত্যাশা থাকে সেগুলোর শতভাগ বাস্তবায়ন কোনোভাবেই
কোনো সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়া কিংবা প্রত্যাশার
কোনো সীমা নেই। এ কারণে কোনোভাবেই একজন ব্যক্তির চাওয়ার-পাওয়ার হিসাব
যথাযথভাবে পূরণ করা সম্ভব হয় না। ফলে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের অনেকের মনেই
সরকারবিরোধী একটি মানসিকতা গড়ে উঠতে শুরু করে।
সঙ্গত কারণেই বলা যায়,
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের
সামনে রয়েছে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ। একটা লম্বা সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা,
নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক, অর্থনৈতিক চাপ এবং জনআকাক্সক্ষার পাহাড়- সব মিলিয়ে
নতুন সরকারের সামনে প্রত্যাশা যেমন বিপুল, তেমনি ব্যর্থতার ঝুঁকিও সমানভাবে
রয়েছে।
সবার আগে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, তা হলো অর্থনীতি।
উচ্চমূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে নাকাল করে তুলেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয়
পণ্যের দাম, কর্মসংস্থানের সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ব্যাংক খাতের
অনিয়ম- সবকিছু একসঙ্গে সামাল দেওয়া কোনো সহজ কাজ নয়। বিএনপি সরকারকে এমন
নীতি নিতে হবে, যাতে একদিকে বাজারে স্বস্তি ফিরে আসে, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও
উৎপাদন বাড়ে। কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে নয়, বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক
সংস্কারের মাধ্যমেই জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে।
একই সঙ্গে
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে। দীর্ঘ
রাজনৈতিক সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি দমননীতির কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর
প্রতি মানুষের আস্থা অনেকাংশে কমেছে। এখন জনগণ চায় এমন একটি শাসনব্যবস্থা,
যেখানে আইন সবার জন্য সমান হবে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ বিশেষ সুবিধা
বা নিপীড়নের শিকার হবে না। পুলিশ ও প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবের বাইরে এনে
পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে দাঁড় করানো বিএনপি সরকারের জন্য একটি
কঠিন কিন্তু অনিবার্য চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সরকারকে অত্যন্ত
সতর্কভাবে এগোতে হবে। প্রতিপক্ষকে দমন করার রাজনীতি নয়, বরং সহনশীলতা ও
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রত্যাশা এখন জনগণের বড়
অংশের। বিরোধী দল, ভিন্নমত ও নাগরিক সমাজকে জায়গা না দিলে গণতন্ত্র
কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তা অর্থহীন হয়ে পড়ে। বিএনপি যদি অতীতের
প্রতিশোধমূলক রাজনীতির পথে হাঁটে, তবে তারা খুব দ্রুতই সেই সমালোচনার মুখে
পড়বে, যেটির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তারা ক্ষমতায় এসেছে।
তরুণ প্রজন্মের
প্রত্যাশাও নতুন সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষিত কিন্তু বেকার
তরুণরা এখন শুধু চাকরি নয়, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা চায়। ডিজিটাল
সুযোগ, আধুনিক শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির পরিবেশ না তৈরি
হলে তরুণদের হতাশা দ্রুত সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। বিএনপি সরকারকে
বুঝতে হবে, তরুণদের শুধু রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের
অংশীদার হিসেবে যুক্ত করা সময়ের দাবি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সরকারের
পথচলা সহজ হবে না। আঞ্চলিক রাজনীতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, কূটনৈতিক
ভারসাম্য- সবকিছু মিলিয়ে পররাষ্ট্রনীতিতে পরিমিতি ও বাস্তববাদ জরুরি। কোনো
একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নয়, বরং বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ
কূটনীতি গ্রহণ করাই হবে টেকসই পথ। একই সঙ্গে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের
প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এড়ানোর সুযোগ নেই।
সবশেষে বলা যায়,
বিএনপি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। জনগণ এবার
শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, শাসনের চরিত্র পরিবর্তন দেখতে চায়। প্রতিশ্রুতি ও
বাস্তবতার ব্যবধান যদি কমানো না যায়, তবে জনপ্রত্যাশা খুব দ্রুত হতাশায় রূপ
নেবে। এ সরকার ইতিহাসে কীভাবে স্মরণীয় হবে, তা নির্ভর করবে তারা ক্ষমতাকে
কতটা দায়িত্ব হিসেবে নিতে পারে, আর কতটা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে
রাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দেয় তার ওপর।
একজন নাগরিক নিজের জীবন বাজি রেখে
পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচনে বিজয়ী করার চেষ্টা করেন। ফলে তার দাবিদাওয়া
কিংবা চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি পূরণ না হলে তার মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হওয়াটা
অস্বাভাবিক কিছু নয়। একজন সাধারণ ভোটার কিংবা দলীয় সমর্থক বা কর্মী যিনি
সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যের সরাসরি পরিচিত নাও হতে পারেন। যেকোনো সমস্যা
কিংবা আপদে-বিপদে কোনো ব্যক্তি যদি সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের কাছে সরাসরি
পৌঁছাতে না পারেন কিংবা দেখা না পান তাহলেও তার মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভের
সঞ্চার হতে পারে। আমাদের দেশে প্রায়শই যে সমস্যাটি লক্ষ করা যায় সেটি হলো-
নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্বাচন-পরবর্তী তাদের আচরণ এবং ভূমিকা কিছুটা
পরিবর্তন করেন। নির্বাচনের অব্যবহিত আগে যে ধরনের আচরণ এবং প্রতিশ্রুতি
দিয়ে থাকেন জনগণের সামনে, ঠিক সে ধরনের আচরণ এবং প্রতিশ্রুতির ব্যত্যয়
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। আর এ বিষয়ের প্রভাব মোটাদাগে সরকারের ওপর
পড়ে।
উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন
মূলত একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে হয়। সেখানে রাজনীতি ব্যক্তি
বা দলের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর সংসদ,
স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সক্রিয় গণমাধ্যম এবং সচেতন নাগরিক সমাজের সম্মিলিত
চাপ রাজনীতিকদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বাধ্য করে। কোনো দল নির্বাচনে যে
ইশতেহার দেয়, তা পরবর্তী সময়ে সংসদীয় বিতর্ক, বাজেট পরিকল্পনা ও
নীতিনির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কী
বাস্তবায়িত হলো আর কী হলো না- তা নিয়মিতভাবে জনসমক্ষে আসে। ফলে প্রতিশ্রুতি
ভঙ্গ করলে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়, কখনো নির্বাচনে পরাজয়, কখনো দলীয় সংকট,
আবার কখনো আইনি জবাবদিহির মাধ্যমে।
ক্ষমতায় যাওয়ার পর নির্বাচনি
প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রসঙ্গটি জনপ্রতিনিধিরা বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ
করে না। কারণ সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর চাপ সৃষ্টি করার মতো
প্রতিষ্ঠান দুর্বল। সংসদ কার্যত দলীয় আনুগত্যের জায়গায় পরিণত হওয়ায় সরকারের
নীতি বা প্রতিশ্রুতি নিয়ে গঠনমূলক প্রশ্ন ওঠে না। বিরোধী দল দুর্বল বা
অনুপস্থিত থাকলে জবাবদিহির সংস্কৃতি আরও ক্ষীণ হয়ে যায়। কিন্তু এর প্রভাব
সরকারের ভাবমূর্তির ওপর স্থায়ীভাবে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
বাংলাদেশে
দুর্নীতি ও দলীয়করণ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা। উন্নত রাষ্ট্রে
রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও নজরদারি থাকায় উন্নয়ন প্রকল্প বা
সামাজিক প্রতিশ্রুতি নির্দিষ্ট লক্ষ্যেই ব্যয় হয়। বাংলাদেশে সে জায়গায়
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেক
প্রতিশ্রুতি পথেই হারিয়ে যায়। জনগণের জন্য ঘোষিত কর্মসূচি অনেক সময়ই দলীয়
স্বার্থ বা ব্যক্তিগত লাভের যন্ত্রে পরিণত হয়। ফলে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের
বদলে তৈরি হয় আস্থাহীনতা। কাজেই নতুন এ সরকারকে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ
মোকবিলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
