
২০০৬
সালের ২৮ মে দেশের ২৬তম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি)। ছয়টি অনুষদের অধীনে বর্তমানে ১৯টি বিভাগ
নিয়ে পরিচালিত এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই দশক পার করলেও
আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে এখনো স্থান করে নিতে পারেনি।
গবেষণা, শিক্ষকসংখ্যা ও আন্তর্জাতিকীকরণে ঘাটতিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে
দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বায়নের যুগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল দেশীয়
প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে অবস্থান একটি
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সক্ষমতা, শিক্ষার মান ও বৈশ্বিক সংযোগের
গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই), কিউএস
ও সাংহাই র্যাংকিংয়ের মতো আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের একাধিক
বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা পেলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই তালিকায়।
সম্প্রতি
কোয়াকোয়ারেলি সাইমন্ডস (কিউএস) প্রকাশিত এশিয়া ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংয়ে
দেশের ৪৬টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেলেও সেখানে ছিল না কুবি। একইভাবে টিএইচই
প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৬’-এ দেশের ২৮টি
বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা করে নিলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় বাদ পড়েছে।
আন্তর্জাতিক
প্রতিযোগিতায় কেন পিছিয়ে কুবি, কি ঘাটতি রয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে
এবং এই সংকট কাটিয়ে উঠতে কি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি এসব বিষয় নিয়ে শিক্ষক ও
গবেষকদের সাথে কথা বলে বেশকিছু কারণ জানা গেছে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ও গবেষণায় ঘাটতি:
বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর
অনুপাত প্রায় ১:৩৫, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আদর্শ অনুপাত ১:২০।
পাশাপাশি নেই কোনো বিদেশি শিক্ষক বা শিক্ষার্থী। অফিসিয়াল ওয়েবসাইটেও তথ্য
হালনাগাদের ঘাটতি রয়েছে।
বিশ্বের শীর্ষ দুই শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায়
স্থান পাওয়া কুবির একমাত্র শিক্ষক, সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শফিউল্যাহ
বলেন, 'আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে গবেষণা, শিক্ষার গুণগত মান, আন্তর্জাতিক
অবস্থান ও গবেষণার প্রভাব বিবেচনা করা হয়। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায়
শিক্ষকসংখ্যা কম, ফলে গবেষণা প্রকাশনাও কম। অনেক সূচকে শূন্য নম্বর পাওয়ায়
র্যাংকিংয়ে এগোনো কঠিন হয়ে পড়ে।'
তিনি আরও বলেন, 'গবেষণা পেপার প্রকাশ
এখন ব্যয়বহুল হলেও পর্যাপ্ত ফান্ডিং নেই। কিছু প্রণোদনা দেওয়া হলেও তা
সীমিত। গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানো গেলে অগ্রগতি সম্ভব।'
গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ:
গবেষণা
ও সম্প্রসারণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন বলেন,
'বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কার্যক্রম ধীরে ধীরে উন্নতির পথে। শিক্ষক ও
শিক্ষার্থীদের গবেষণায় প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে এবং শর্ত হিসেবে স্কোপাস বা
ওয়েব অব সায়েন্সে প্রকাশনার কথা বলা হচ্ছে। এ বছর পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু
হওয়ায় গবেষণার পরিমাণ বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে তিনি জানান,
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ও আন্তর্জাতিক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সংখ্যা
বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। আসনসংখ্যা কমানোর মাধ্যমে অনুপাত
উন্নয়নের চেষ্টা চলছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দপ্তর, তবে জনবল সংকট:
গত
২৯ অক্টোবর প্রথমবারের মতো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল
অ্যাফেয়ার্স’ দপ্তর চালু করা হয়। এরই মধ্যে তুরস্কের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের
সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
তবে উক্ত দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক
প্রভাষক মশিউর রহমান কিছু উন্নতির কথা উল্লেখ করে বলেন, 'আন্তর্জাতিক
র্যাংকিংয়ে আসতে হলে গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ওয়েবসাইটের মান ও
শিক্ষকসংখ্যাসহ সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন দরকার। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব
আইআরবি না থাকলেও এখন সেটি পাওয়া গেছে, যা ইতিবাচক দিক।'
তিনি বলেন,
'গবেষণার জন্য নির্দিষ্ট স্থান নেই, শিক্ষার্থীদের থিসিস সংরক্ষণের
ব্যবস্থাও দুর্বল। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দপ্তরে জনবল সংকট রয়েছে।
এসব ঘাটতি কাটাতে পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।'
প্রশাসনের আশ্বাস:
বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং প্রশাসনিকভাবে বিভিন্ন কাজ শুরু হলেও এটি সময়সাপেক্ষ বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।
এই
বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হায়দার আলী বলেন, 'আমরা
র্যাংকিং নিয়ে কাজ করতেছি৷ এত বছর ধরে এইদিকে কেউ নজর দেয়নি৷ এখন আমরা
আগের চেয়ে একটু হলেও এগিয়েছি। গবেষণাসহ বিভিন্ন সেক্টর নিয়ে কাজ করতেছি,
তবে এটাতো আর এক-দুই দিনে সম্ভব হবে না।''
