
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে আবার একধরনের উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্রাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে ভারতের দিল্লিতে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। পরে তিনি প্রবেশের অনুমতি পেলেও দিল্লি বিমানবন্দর থেকে ঢাকায় ফিরে এসেছেন। তার ফিরে আসার এ ঘটনায় বাংলাদেশে তুমুল আলোচনার জন্ম হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এ ঘটনাকে দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পাওয়ান বাঢ়েকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে। ঘটনা প্রসঙ্গে, অর্থাৎ ঘটনার এক দিন পর জাহেদ উর রহমান সাংবাদিকদের কাছে তার ফিরে আসাকে ‘ইন্সট্যান্ট’ বা তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ বলে উল্লেখ করেছেন।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জাহেদ উর রহমানের দিল্লি যাওয়ার বিষয়টি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নোট ভার্বাল দিয়ে জানানো হয়েছিল। দিল্লি বিমানবন্দরে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহও উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার পরিচয় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের অবহিত করেন। কিন্তু হাসিনা সরকারের পতনের আগে তার ইউটিউব চ্যানেল ভারতে নিষিদ্ধ করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ভারতবিরোধী বক্তব্যের কারণে তার পাসপোর্ট ব্ল্যাকলিস্টেড করে ভারত। তিনি কূটনৈতিক পাসপোর্ট না নিয়ে দিল্লি গিয়েছিলেন। কালো তালিকাভুক্ত করার কারণে তাকে দিল্লি বিমানবন্দরে বসিয়ে রাখা হয়। পরে খোঁজখবর নিয়ে দিল্লি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেয়। কিন্তু তিনি পাসপোর্ট ফেরত নিয়ে শ্রীলঙ্কার কলম্বো হয়ে দেশে ফিরে আসেন।
এ ঘটনা প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে দিল্লিতে কেন কূটনৈতিক পাসপোর্ট না নিয়ে গেলেন। যদি আমরা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাই, তাহলে এ নিয়ে উত্তেজনা না বাড়িয়ে কী কারণে এটা ঘটেছে, সেটা কথা বলে মিটিয়ে নেওয়া ভালো। দেশের স্বার্থকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া উচিত।
বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত নিঃসন্দেহে। প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার উপদেষ্টার ভারতে ঢুকতে না পারাটা উভয় দেশেরই কূটনৈতিক ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়। বিগত অনির্বাচিত অন্তর্র্বতী সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। বাংলাদেশের নির্বাচিত নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। ভারতের দিক থেকেও উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরলা শোক জানাতে ঢাকা এসেছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও কয়েকবার দিল্লি গেছেন। কূটনৈতিক পর্যায়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টাও রয়েছে। কিন্তু এ ঘটনাটি এমন একসময়ে ঘটল, যখন ভারত থেকে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে কথিত বাংলাদেশিদের পুশইনের খবর আসছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী ও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে এ সমস্যা নিয়ে বৈঠকও হয়েছে, কিন্তু উত্তেজনা প্রশমন ঘটেনি।
পরিস্থিতি যা-ই হোক, অনাকাক্সিক্ষত এসব ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে, সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে। ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কে যেমন সংবেদনশীল, তেমনি আমাদেরও কূটনৈতিক সমাধান খুঁজতে হবে। এর প্রধান উপায় হচ্ছে আলাপ-আলোচনা করা। সামনে দুই দেশের মধ্যকার আরও কিছু সমস্যার সমাধান করার বিষয় রয়েছে। সেসব সমস্যা যাতে সমাধান করা যায়, সে ব্যাপারে উভয় দেশকেই সতর্ক থেকে এগিয়ে আসতে হবে। উত্তেজনা না বাড়িয়ে পরস্পরের স্বার্থে সমমর্যাদা নিয়ে সমাধানের পথ বের করতে হবে। ভারতীয়দের যেমন অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হওয়া ঠিক হবে না, তেমনি আমাদেরও যৌক্তিক ও স্বীকৃত কূটনৈতিক পথে অগ্রসর হতে হবে।
