
সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে জন-আকাক্সক্ষা অনেক। বর্তমান বিপর্যস্ত অর্থনীতি থেকে উত্তরণে সরকার কতটা জন-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারবে, তা নিয়ে অর্থনীতির বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন। আগামী বাজেটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, জ্বালানিসংকট ও বিনিয়োগে স্থবিরতা দূর করার চাপ আছে। প্রত্যেক মানুষের কথা মাথায় রেখে বাজেট করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা এবং রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা বাজেটে নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেটা কীভাবে সফল করা হবে, তা নির্ধারণ করে কার্যকর করা। গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন করা হয়। এরপর বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেন। এবার প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
এবারের বাজেটের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ হয়েছে গণতান্ত্রিক, মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘সীমিত সম্পদের মানুষকে স্বস্তি দিতেই এবারের বাজেট।’ প্রস্তাবিত বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তথ্যমতে, আগামী অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনা ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
এবারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ১০ বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিষয়গুলো হলো সবার জন্য উন্নয়ন, মানসম্পন্ন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগনির্ভর কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি বিনিয়ন্ত্রণকরণ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ, প্রযুক্তির বিকাশ, প্রকৃতি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছ-দক্ষ জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
এখন নতুন সরকারের কাছে চাওয়া–প্রথম বাজেটে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী সরকার অর্থনীতির নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করবে। দেশে বেশ কিছু বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। তাই অবাস্তব ও অতি উচ্চাভিলাষী বাজেটের পরিবর্তে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে আগামী বাজেট হতে হবে জনবান্ধব। যদিও সরকার এবারের বাজেটে চাল, ডাল, লবণ, চিনি, হাঁস, মুরগি, তেলসহ ৬০টি পণ্যের দাম কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত কখনোই শতভাগ বাজেট বাস্তবায়নের রেকর্ড নেই। বড় বাজেট ঘোষণা করা হলেও অনেক সময় দেখা যায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবছরই নানা ধরনের কাঠামোগত, আর্থিক ও প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়ে সরকার। তাই বছরের শুরু থেকেই আগামী বাজেট বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে। বিভিন্ন খাতে যে বরাদ্দ থাকে, সেগুলো দেখা যায় বছরের শেষ দিকে অতিমাত্রায় বাস্তবায়নে তৎপরতা দেখানো হয়, ফলে কোনো কাজই সফলভাবে সম্পন্ন হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বরাদ্দের অর্থ ফেরত যায়। তাই আমরা আশা করব, বর্তমান সরকার বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বছরের তার থেকেই কাজ শুরু করবে। প্রথম বছর থেকেই যদি সরকার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পালনের ব্যাপারে মনোযোগ দিতে পারে, তাহলে জনগণের মনে আশার সঞ্চার হবে। জনগণের আস্থা অর্জনই হোক সরকারের মূল লক্ষ্য।
