ক্রীড়া প্রতিবেদক।।
বিশ্বকাপ
মানেই নতুন উত্তেজনা, নতুন তারকা, নতুন ইতিহাস। তবে ২০২৬ সালের ফিফা
বিশ্বকাপের আগে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে কোনো খেলোয়াড় বা দল নয়, বরং একটি
ফুটবল! বিশ্বের শীর্ষ ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস
এবার ফুটবলপ্রেমীদের সামনে নিয়ে এসেছে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন অফিসিয়াল ম্যাচ
বল ‘ট্রিয়ন্ডা’—যাকে অনেকেই বলছেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মার্ট বল।
ফুটবলের
বিবর্তনের ইতিহাসে এক সময় ছিল চামড়া আর বাতাসে তৈরি সাধারণ গোলকের। এরপর
ধীরে ধীরে বদলেছে এর নকশা, উপাদান ও প্রযুক্তি। কিন্তু ট্রিয়ন্ডা যেন সেই
বিবর্তনকে নিয়ে গেছে এক নতুন উচ্চতায়। কারণ এটি শুধু একটি ফুটবল নয়, বরং
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেন্সর প্রযুক্তি এবং আধুনিক প্রকৌশলের সমন্বয়ে তৈরি
এক অত্যাধুনিক ক্রীড়া উপকরণ।
নামের মধ্যেই তিন দেশের গল্প
২০২৬
বিশ্বকাপের অন্যতম বিশেষত্ব হলো, প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র,
মেক্সিকো ও কানাডা—যৌথভাবে আয়োজন করছে এই মহাযজ্ঞ। সেই আয়োজনের প্রতিফলনই
দেখা যায় বলটির নাম ও নকশায়।
স্প্যানিশ শব্দ ‘ওন্দা’ (Onda), যার
অর্থ তরঙ্গ বা ভাইব, এবং তিন আয়োজক দেশের প্রতীকী শব্দ ‘ট্রাই’ (Tri)
মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ‘ট্রিয়ন্ডা’ নামটি। বলটির গায়ে খোদাই করা হয়েছে কানাডার
ঐতিহ্যবাহী ম্যাপল পাতা, মেক্সিকোর জাতীয় প্রতীক ঈগল এবং যুক্তরাষ্ট্রের
নীল তারা। সোনালি রঙের ব্যবহার বিশ্বকাপ ট্রফির আভিজাত্য ও গৌরবের প্রতীক
হিসেবে বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।
৩২ প্যানেল থেকে মাত্র ৪ প্যানেলে
একসময়
ফুটবল বলতে চোখের সামনে ভেসে উঠত ৩২টি প্যানেলে তৈরি কালো-সাদা বল। সময়ের
সঙ্গে সঙ্গে সেই নকশায় এসেছে পরিবর্তন। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ‘আল রিহলা’
বলে ছিল ২০টি প্যানেল। আর এবার ট্রিয়ন্ডা তৈরি হয়েছে মাত্র ৪টি প্যানেল
দিয়ে।
অ্যাডিডাসের ব্যবহৃত থার্মাল বন্ডিং প্রযুক্তি বলটির
প্যানেলগুলোকে এমনভাবে যুক্ত করেছে, যাতে প্রায় কোনো দৃশ্যমান সেলাই বা
জোড়া থাকে না। ফলে বলটি আরও নিখুঁত গোলক আকৃতি পেয়েছে। বিশেষভাবে ডিজাইন
করা গভীর খাঁজ বা ডিপ সিমস বাতাসে বলের গতিপথকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা
করবে, যা খেলোয়াড়দের নিয়ন্ত্রণ এবং শটের নির্ভুলতা বাড়াতে পারে।
বলের ভেতর লুকিয়ে আছে ‘ডিজিটাল মস্তিষ্ক’
ট্রিয়ন্ডার
সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য হলো এর ভেতরে থাকা কানেক্টেড বল প্রযুক্তি। বলের
একটি অংশে সংযুক্ত করা হয়েছে একটি ক্ষুদ্র মোশন সেন্সর মাইক্রোচিপ, যার ওজন
মাত্র ১৪ গ্রাম।
এই সেন্সর প্রতি সেকেন্ডে শত শত তথ্য সংগ্রহ ও
প্রেরণ করতে সক্ষম। বল কখন, কোথায় এবং কী গতিতে স্পর্শ করা হয়েছে—এসব তথ্য
তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছে যাবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) এবং ম্যাচ
কর্মকর্তাদের কাছে।
ফলে অফসাইড, হ্যান্ডবল কিংবা গোললাইন সংক্রান্ত
বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রযুক্তিগত সহায়তা আরও নিখুঁত হবে। স্টেডিয়ামের
চারপাশে স্থাপিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরার সঙ্গে সমন্বয় করে এই
তথ্যগুলো রিয়েল-টাইম থ্রিডি বিশ্লেষণ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
ম্যাচের আগে বলকেও দিতে হবে চার্জ!
একসময় ম্যাচ শুরুর আগে ফুটবলে শুধু বাতাস ভরা হতো। কিন্তু ট্রিয়ন্ডার ক্ষেত্রে যোগ হয়েছে নতুন এক কাজ—চার্জ দেওয়া।
বলের
ভেতরে থাকা সক্রিয় ইলেকট্রনিক সেন্সর সচল রাখতে ম্যাচের আগে ফুটবলগুলোকে
বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে চার্জ করতে হবে। প্রস্তুতকারকদের তথ্য অনুযায়ী,
একবার পূর্ণ চার্জ দিলে এটি প্রায় ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
অর্থাৎ বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ম্যাচের আগে ফুটবলও স্মার্টফোনের মতো চার্জ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ
প্রযুক্তি
যত উন্নতই হোক, ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর ভারসাম্য। অনেকের
মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে একদিকে চিপ থাকলে কি বলের গতি বা ঘূর্ণন প্রভাবিত
হবে না?
এ বিষয়ে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, বলের নিখুঁত
ভারসাম্য বজায় রাখতে বাকি অংশে সমপরিমাণ ওজনের বিশেষ কাউন্টার-ওয়েট ব্যবহার
করা হয়েছে। ফলে খেলোয়াড়রা মাঠে কোনো ধরনের অতিরিক্ত ভার বা অস্বাভাবিক
আচরণ অনুভব করবেন না। বলের গতিপথ, ঘূর্ণন এবং নিয়ন্ত্রণ থাকবে স্বাভাবিক
ফুটবলের মতোই।
প্রযুক্তির নতুন যুগে ফুটবল
ফুটবলকে দীর্ঘদিন ধরে
‘দ্য বিউটিফুল গেম’ বলা হয়। সেই সুন্দর খেলাটিকে আরও নির্ভুল, দ্রুত এবং
বিতর্কমুক্ত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। গোললাইন প্রযুক্তি,
ভিএআর এবং সেমি-অটোমেটেড অফসাইড সিস্টেমের পর এবার সেই যাত্রায় যুক্ত হলো
বুদ্ধিমান ফুটবল।
অ্যাডিডাস ট্রিয়ন্ডা তাই শুধু একটি ম্যাচ বল নয়; এটি
ভবিষ্যতের ফুটবলের প্রতীক। এখন ফুটবলপ্রেমীদের অপেক্ষা এই প্রযুক্তিনির্ভর
বল কি মাঠে গোলের সংখ্যা বাড়াবে, নাকি গোলরক্ষকদের জন্য তৈরি করবে নতুন
চ্যালেঞ্জ? উত্তর মিলবে বিশ্বকাপের সবুজ ঘাসে, বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের
চোখের সামনে।
