
কুমিল্লায় এইচআইভি-এইডসে আক্রান্ত হয়ে তিনজন মারা গেছেন। গত মে মাসে তারা মৃত্যুবরণ করেন। এ নিয়ে চলতি বছর মারা গেছেন সাতজন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হচ্ছে, চলতি বছর যারা আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ যৌনকর্মী এবং ১৮ জন পুরুষ-পুরুষ (সমকামী) যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া তিনজন বিবাহিত সম্পর্কের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছেন এবং দুজন বিদেশে অবস্থানকালে আক্রান্ত হয়েছেন।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচআইভি-এইডস এইচটিসি/এআরটি সেন্টারের কাউন্সেলর কাম অ্যাডমিন মো. আরিফ হাসান এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, কুমিল্লা জেলায় বর্তমানে ৩৮৫ জন এইচআইভি সংক্রমিত রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরে মো. আরিফ হাসান কুমিল্লার কাগজ-কে জানান, গত ২৫ মে ২১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন কবির উদ্দিন (ছদ্মনাম)। ১৩ মে মৃত্যুবরণ করেন ৪৯ বছর বয়সী রহিম উদ্দিন (ছদ্মনাম) এবং ৮ মে মৃত্যুবরণ করেন ৩৫ বছর বয়সী মতিন উদ্দিন (ছদ্মনাম)। তারা তিনজনই কুমিল্লা জেলার বাসিন্দা। কবির উদ্দিন (ছদ্মনাম) ২০২১ সালে এইচআইভি সংক্রমিত হিসেবে শনাক্ত হলেও রহিম উদ্দিন (ছদ্মনাম) ও মতিন উদ্দিনের (ছদ্মনাম) ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে এইচআইভি সংক্রমণ পজিটিভ ধরা পড়ে। এ নিয়ে চলতি বছর কুমিল্লা জেলায় মোট সাতজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে দুইজন, মার্চ মাসে একজন, এপ্রিল মাসে একজন এবং মে মাসে তিনজন মৃত্যুবরণ করেছেন।
এইচআইভি-এইডসে মারা যাওয়া কবির উদ্দিনের (ছদ্মনাম) স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয় কুমেক হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে। তিনি জানান, “আমাদের একটি শিশু সন্তান আছে। কবির উদ্দিন (ছদ্মনাম) কুমিল্লা ইপিজেডের একটি কারখানার শ্রমিক ছিলেন। আগেই তিনি এইচআইভি পজিটিভ হলেও তা জানাননি। তার মৃত্যুর আগে ঢাকার এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমরা এ তথ্য জানতে পারি। পরে আমার স্বামীর মৃত্যুর পর আমিও কুমিল্লা মেডিকেলে পরীক্ষা করিয়ে জানতে পারি, আমিও এইচআইভি পজিটিভ। যদিও আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে এই চিকিৎসা নিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে, তারপরও আমি চিকিৎসা নিতে এসেছি।”
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচটিসি/এআরটি সেন্টারে পরীক্ষার পর কাউন্সেলর মো. আরিফ হাসানকে তিনি জানান, স্বামী তাঁর আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন। মৃত্যুর আগে একটি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় সেটি জানা যায়। সামাজিকতার দোহাই দিয়ে পারিবারিকভাবে বাধা থাকলেও সন্তান এবং নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে চিকিৎসা নিতে এসেছেন তিনি।
কাউন্সেলর আরিফ হাসান জানান, গোপনীয়তা রক্ষা করে চিকিৎসা নিয়ে অনেকেই ভালো আছেন।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচআইভি-এইডস এইচটিসি/এআরটি সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা জেলায় বর্তমানে ৩৮৫ জন এইচআইভি সংক্রমিত রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। কুমেক এআরটি সেন্টারে চলতি বছর ৬৭২ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৩৭ জন পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে চারজন টিবি ও এইচআইভি—উভয় রোগেই আক্রান্ত। যারা আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ যৌনকর্মী, ১৮ জন পুরুষ-পুরুষ (সমকামী) যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে আক্রান্ত, তিনজন বিবাহিত সম্পর্ক থেকে সংক্রমিত হয়েছেন এবং দুজন বিদেশে অবস্থানকালে আক্রান্ত হয়েছেন।
২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কুমেকে ৬ হাজার ৬৪৬টি এইচআইভি পরীক্ষায় ২৭৮ জন আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪০ জন টিবিতেও আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৬১৫ জন রোগী। ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মোট ৪৬ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। চিকিৎসা ছেড়ে দিয়েছেন ১৩ জন।
এআরটি সেন্টারের কাউন্সেলর কাম অ্যাডমিন মো. আরিফ হাসান জানান, সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, আগে বেশির ভাগ সংক্রমণ রক্ত আদান-প্রদানের মাধ্যমে ছড়ালেও এখন যেসব কেস পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো যৌনবাহিত বলেই শনাক্ত হচ্ছে। ২০১৯ সাল থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে জানা গেছে, এ পর্যন্ত যতজন শনাক্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে বেশির ভাগই পুরুষ-পুরুষ যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে আক্রান্ত—সমকামী ৯১ জন, পুরুষ যৌনকর্মী ৪০ জন এবং প্রবাস থেকে ফেরত আসা ৪৯ জন। এইচআইভি সংক্রমিত বিবাহিত সঙ্গীর মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছেন ৪১ জন এবং নারী যৌনকর্মীর মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছেন ২১ জন। তবে এর মধ্যে সাধারণ মানুষের সংখ্যা ৩২ জন।
আরিফ হাসান বলেন, “যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় ওষুধ সরবরাহ করা হয়। নিয়মিত চিকিৎসা নিলে তারা সুস্থ থাকেন এবং সংক্রমণও নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে গত প্রায় দুই বছর ধরে সরকারি সেবার সঙ্গে যুক্ত কাউন্সেলর ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। তারপরও আমরা সেবা দিয়ে যাচ্ছি।”
