নিজস্ব প্রতিবেদক।।
দেশের
অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিন দিন
প্রাণঘাতি হয়ে উঠছে। রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর
চট্টগ্রামের সংযোগকারী এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন লাখো মানুষ ও বিপুল পরিমাণ
পণ্য পরিবহন হয়। কিন্তু থ্রিহুইলারের অবাধ চলাচল, অনিয়ন্ত্রিত গতি,
ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার এবং অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থার
কারণে প্রতিনিয়ত ঝরছে প্রাণ। বিশেষ করে ঈদযাত্রা কিংবা ছুটি শেষে কর্মস্থলে
ফেরার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ফলে আনন্দের যাত্রা অনেক
পরিবারের জন্য পরিণত হচ্ছে আজীবনের বেদনা ও শোকের স্মৃতিতে।
হাইওয়ে
পুলিশের তথ্য বলছে, গত ১৭ মাসে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার
দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রামের সিটি গেইট পর্যন্ত ২০৬ কিলোমিটার এলাকায় সড়ক
দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫১০ জন। যার অধিকাংশই ঘটেছে মহাসড়কের কুমিল্লার
১০৫ কিলোমিটার অংশে। শুধু চলতি বছরের ঈদুল ফিতরের ছুটিতে ২২ মার্চ রাত থেকে
২৬ মার্চ সন্ধ্যা পর্যন্ত মাত্র চার দিনে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার লেভেল
ক্রসিং ও কালাকচুয়ায় বড় দুই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৭ জন।
তবে সড়ক
নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার দাবি প্রকৃত প্রাণহানির
সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি। আর এই বাস্তবতায় প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায়
সাড়ে চার হাজার মানুষের মৃত্যুকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা বলে স্বীকার করেছেন
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
হাইওয়ে পুলিশের পরিসংখ্যান
অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কুমিল্লা রিজিয়নের আওতায় ৫৯৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৪১ জন
নিহত ও ৬৪৮ জন আহত হন। আর ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই ৩৫৫টি দুর্ঘটনায়
প্রাণ হারিয়েছেন ১৬০ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৭৭ জন।
হাইওয়ে পুলিশের
কর্মকর্তারা বলছেন, এ মহাসড়কের কুমিল্লার অংশে এ শতশত প্রাণহানি ও
দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ একযোগে কাজ করছে। অনিয়ন্ত্রিত গতি,
থ্রিহুইলারের অবাধ চলাচল, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ত্রুটিপূর্ণ ইউটার্ন, সড়কে
হঠাৎ পারাপার, ফুটওভারব্রিজ ব্যবহারে অনীহা, চালকদের অসচেতনতা ও ট্রাফিক
আইন অমান্য করার প্রবণতাসহ ১২ থেকে ১৩টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে
অধিকাংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে অসচেতনতাকেই দায়ী করছে পুলিশ।
হাইওয়ে
পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান বলেন,
দুর্ঘটনা কমাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চালক, যাত্রী ও পথচারীদের মধ্যে
সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। সড়ক ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই
সমাধান সম্ভব নয়।
এদিকে সম্প্রতি কুমিল্লায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৮৬ জনের
পরিবারের মাঝে বিআরটিএ ট্রাস্টি বোর্ডের আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ
অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, দেশে প্রতিবছর
প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন। এটি রাষ্ট্রের
ব্যর্থতা। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আইন বাস্তবায়ন, নজরদারি বৃদ্ধি এবং
সড়ক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে সড়ক মহাসড়কে
ফিটনেসবিহীন বাস ও অদক্ষ চালক পরিহার করতে হবে। যাত্রীর নিরাপত্তায় সড়কে
দুর্ঘটনা রোধে এ বিষয়ে সর্বপ্রথম সচেতন হতে হবে বাস মালিকদের। অনুষ্ঠানে
মন্ত্রী নিহত ৮৬ জনের পরিবারের হাতে ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার অনুদানের চেক এবং
আহত ৩৩ জনকে ৫৯ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
অন্যদিকে যাত্রী ও
চালকদের অভিযোগ, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে থ্রিহুইলারের দৌরাত্ম্য, বেপরোয়া
গতি এবং অনিয়ন্ত্রিত পারাপার দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের মতে,
প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগ
নিশ্চিত করা গেলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে প্রাণহানি অনেকাংশে
কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
আর সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে,
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে
দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। সার্ভিস লেনসহ মহাসড়ককে ১০ লেনে
উন্নীত করা, ঝুঁকিপূর্ণ ইউটার্ন অপসারণ, অবৈধ থ্রিহুইলার নিয়ন্ত্রণ এবং
পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি
ঘটতে পারে।
